আলফাজ আনাম
পচিঁশ বছর পর জাতীয় সংসদের সাংবাদিক গ্যালারি থেকে এক নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা দেখলাম। ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকার গঠনের পর সাংবাদিক গ্যালারি থেকে সংসদের প্রথম দিনের কার্যক্রম দেখেছিলাম। সে সময়ের সংসদ সদস্যদের বেশির ভাগ এবারের সংসদে নেই। অনেককে শেখ হাসিনা ফাঁসি কাষ্টে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে।
অধিবেশন শুরু হওয়ার ঘন্টা খানেক আগেই গিয়েছি সংসদ ভবনে। তখনও অনেক সংসদ সদস্য আসেনি। এবারের সংসদে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সংখ্যক তরুন নির্বাচিত হয়েছে। সবাই ছিলেন উচ্ছসিত। অনেককে দেখা গেছে ভেতরে ছবি তুলতে। গুম হওয়া আরমান , হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাজিব মোমেন ও মাওলানা সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদীকে এক সাথে ছবি তুলতে দেখা গেছে।
সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও বিরোধী দলের হুইপ সংসদ নেতারা সাথে কথা বলতে দেখো গেলো। সৌহাদ্যপূর্ন আন্তরিক পরিবেশ।
সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দারুন বক্তব্য রেখেছেন। তার বক্তব্যে জুলাইয়ের প্রতিধ্বনি ছিলো। ফ্যাসিবাদি ও তাবেদার সরকার চলবে না এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার ভাষণে শব্দ চয়ন ছিলো মার্জিত কিন্তু বেশ শক্ত। তিনি স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসাবে ভালো লোক বাছাই করেছেন। আজকের বক্তব্য থেকে তা স্পষ্ট।
বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান নতুন স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। তিনি সাধারনত লিখিত বক্তব্য দেন না। স্বাভাবিক ভাবে ভালো বলেন। আজকেও ভালো বলেছেন। তিনি সংসদ পরিচালনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার বক্তব্যর মধ্যে আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে। যদিও মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন স্পিকার হওয়ায় সবাই চমকে গেছেন। তিনি ওয়ান ইলেভেনের সময় বিএনপি ভাঙ্গার অন্যতম কারগির ছিলেন। তারেক রহমান তাকে অতি গুরত্বপূর্ন একটি পদে বসালেন। জানিনা এর রহস্য কি? তবে স্পিকারের পদে সমাসীন হয়ে তিনি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সহ দলীয় পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। খুবই ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম ফাঁসির কক্ষ থেকে সংসদে এসেছেন। জুলাইয়ের কারনে তিনি এ জায়গায় এসেছেন তা তুলে ধরেছেন। সত্যিই তার সংসদে আসাটা অলৌকিক ঘটনার মতো। কারন তার নেতা ও রাজনৈতিক সহকর্মী সবাই মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন। সংসদে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামটিও উচ্চারিত হওয়া উচিত ছিলো। তার মতো তুখোড় পার্লামেনেটরিয়ানের অভাব সংসদ অনুভব করবে। আজহারুল ইসলাম বক্তব্যর শুরুতে তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করে আবেগময় বক্তব্য রেখেছেন। বেগম খালেদা জিয়া যে দলের নয় দেশনেত্রী ছিলেন তা যেনো সংসদে উঠে এসেছে।
বিরোধী দলের হুইপ নাহিদ ইসলাম জুলাই অভ্যুন্থানের হৃদয় ছোয়া বক্তব্য রেখেছেন। তার বক্তব্যর সময়ে জুলাই- আগস্টের রক্তস্নাত দিনগুলো স্মৃতি যেনো ফিরে এসেছিলো। নাহিদ – হাসনাতরা গনঅভ্যুন্থানের স্পিরিট সংসদকে সব সময় মনে করিয়ে দেবেন তা প্রথম দিনে বোঝা গেলো।
শেষে প্রেসিডেন্ট চুপ্পুর সংসদ ভবন থেকে অপমানজনক প্রস্থানের মধ্যদিয়ে দিয়ে শেষ হলো অধিবেশন। হাসিনার দু:শাসনের দিনলিপি পাঠ করলেন চুপ্পু । তার ফ্যাসিস্ট ও দুর্নীতিবাজ শাসনের বিবরন দিলেন। অপরদিকে সংসদের ভেতরে বিরোধী দলের সদস্যরা কিলার, গেট আউট চুপ্পু শ্লোগানের মধ্যে বক্তব্য শুরু করতে হলো। এরপর ওয়াক আউট। চুপ্পুর জীবনে এর চেয়ে আর লজ্জাজনক দিন হয়তো আসবে না। যদিও তার লজ্জা থাকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে।
শোক প্রস্তাবে শহীদ ওসমান হাদির নাম ছিলো না। তবে বিরোধী দলের একাধিক সদস্য সে প্রস্তাব তুলেছেন। তা গৃহীত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো বিএনপি ও ছাত্রদল সব সময় শহীদ ওয়াসিমের কথা সামনে আনে। সংসদে ছাপানো শোক প্রস্তাবে আবু সাইদ , মুগদ্ধ ও আনাসের নাম থাকলেও ওয়াসিমের নাম ছিলো না। আমার দেশ পুন:প্রকাশের দিন জুলাই শহীদদের স্মরনে একটি স্টোরি লিখেছিলাম। সেখানে র্যানডম ছবি বাছাই করতে গিয়ে ওয়াসিমের ছবি বাদ গিয়েছিলো। এ নিয়ে বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টরা আমার দেশ এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রপাগান্ডা চালিয়েছিলো। এখন সংসদে ছাপানো শোক প্রস্তাবে ওয়াসিমের নাম নাই। এটা হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়। এতে শহীদ ওয়াসিমের মর্যাদা কমেছে তাও নয়।
যা হোক আজকের অধিবেশন প্রেসিডেন্ট চপ্পুর কথায় বলতে হয়, নাইস অ্যান্ড অ্যাট্ক্টটিভ ছিলো। সংসদ অধিবেশনের সময় সাংবাদিক গ্যালারিতে তীব্র আলোর মধ্যে আমার ছবিটি তুলেছেন পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন জামিল। ছবিটি মোটেও নাইস অ্যান্ড অ্যাট্ক্টটিভ হয়নি। তারপরও আজকের দিনের স্মৃতির জন্য রেখে দিলাম।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ।