Image description
 

ইসরায়েল অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরের হেবরনে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদ ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান তিন ধর্মেরই অন্যতম পবিত্র স্থান। দীর্ঘ চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি ফিলিস্তিনিদের তত্ত্বাবধানে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল এই স্থাপনাটির ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইসরায়েল এই মসজিদের ফিলিস্তিনি পরিচালকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এছাড়া মসজিদের একটি অংশের পরিকল্পনা সংক্রান্ত অধিকার দখল করে নেয়, যা দীর্ঘদিনের বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিপন্থী।

 

২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের পবিত্র স্থানগুলোর ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও প্রবেশে কড়াকড়ি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল–আকসা মসজিদ ও নাবলুসের হজরত ইউসুফের (আ.) কবরস্থান রয়েছে।

 

জানুয়ারিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হেবরনসহ অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামে অভিযান শুরু করে। এসব অভিযানে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানো হয়।

 
 

 

ইব্রাহিমি মসজিদের ইতিহাস

 

ইব্রাহিমি মসজিদ একটি মধ্যযুগীয় ধর্মীয় স্থাপনা। এটি একটি গুহা–ব্যবস্থার ওপর নির্মিত, যেখানে দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো একটি সমাধি কমপ্লেক্স রয়েছে। মসজিদটি পশ্চিম তীরের পুরোনো হেবরন শহরে অবস্থিত। এ অঞ্চলটি ১৯৬৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করে ইসরায়েল নিজেদের দখলে রেখেছে।

 

এই স্থাপনাটিকে হজরত ইব্রাহিমের (আ.) সমাধিস্থল হিসেবে মনে করা হয়– যিনি ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম তিন ধর্মেরই আদি পিতৃপুরুষ হিসেবে বিবেচিত। এই স্থাপনাটিকে তার পরিবার, বিশেষ করে তার পুত্র হজরত ইসহাক (আ.) ও নাতি হজরত ইয়াকুবের (আ.) সমাধিস্থল বলে বিশ্বাস করা হয়।

 

ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তালমুদ ও বাইবেলের ওল্ড স্টেটমেন্টে এই স্থানকে ‘মাখপেলার গুহা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। আধুনিক খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের কাছে এটি পিতৃপুরুষদের গুহা (ক্যাভ অব প্যাট্রিয়ার্ক) আর মুসলমানদের কাছে এটি ইব্রাহিমি মসজিদ হিসেবে পরিচিত।

 

বর্তমান স্থাপনার বেশিরভাগ অংশ ১২শ শতকে নির্মিত একটি রোমানীয় খ্রিষ্টান গির্জা। ক্রুসেডারদের হাতে ধ্বংস হওয়া মসজিদের মূল কাঠামোর উপর গির্জা নির্মাণ করা হয়েছিল।

 

১২শ শতকের শেষ দিকে মুসলিম আইয়ুবি শাসনামলে স্থানটি আবার মসজিদে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী— মামলুক (১২৫০–১৫১৭) ও উসমানীয় (১৫১৬–১৯১৭) শাসনামলে এখানে কেবল মুসলমানদের প্রবেশাধিকার ছিল।

 

১৯২১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ইহুদি অভিবাসীরা এই স্থান ও আল–আকসা মসজিদের কিছু অংশে প্রবেশের দাবি জানাতে শুরু করে। এতে ফিলিস্তিনিরা প্রতিবাদ শুরু করেন। ফলে পরবর্তী সময়ে হেবরনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে।

 

১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিমতীর জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময়ে ইহুদিদের ওই অঞ্চলে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ফলে তারা ইব্রাহিমি মসজিদেও যেতে পারত না।

 

২০১৭ সালে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো ইব্রাহিমি মসজিদ ও পুরোনো হেবরন শহরকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অন্তর্গত ও ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘোষণার ফলে দুই দেশই ইউনেস্কো থেকে সরে দাঁড়ায়।

 

ইসরায়েলি দখলদারিত্ব কীভাবে ইব্রাহিমি মসজিদকে প্রভাবিত করেছে?

 

১৯৬৭ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইসরায়েল পশ্চিমতীর দখল করলে ইহুদিদের জন্য মসজিদে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পায়। ইহুদিরা সেখানে একটি সিনাগগ স্থাপন করে।

 

১৯৬০–এর দশকের শেষ দিক থেকে ইসরায়েল সরকার হেবরনের পুরোনো শহরের উপকণ্ঠে দখল করা ফিলিস্তিনিদের জমিতে ‘কিরিয়াত আরবা’ নামে একটি ইহুদি বসতি গড়ে তোলে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৭ হাজার অবৈধ বসতি স্থাপনকারী বসবাস করে, যা হেবরনের প্রায় ২ লাখ ফিলিস্তিনির পাশে একটি আলাদা ও সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

 

১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ‘কিরিয়াত আরবা’র বাসিন্দা ইহুদি বসতি স্থাপনকারী বারুখ গোল্ডস্টেইন রমজান মাসে ইব্রাহিমি মসজিদে নামাজরত শত শত মুসলমানের ওপর গুলি চালায়। এতে ২৯ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১২৫ জন আহত হন। পরে ফিলিস্তিনিদের হাতে গোল্ডস্টেইন নিহত হন।

 

এই হামলার পর বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে আরও বহু ফিলিস্তিনি নিহত হন। এই মসজিদের প্রধান প্রবেশপথ আল–শুহাদা স্ট্রিট আজও ফিলিস্তিনিদের জন্য বন্ধ রয়েছে।

 

গোল্ডস্টেইনের হামলার আগেই ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলো তাকে ‘বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আইজেক রবিনকে সতর্ক করেছিল। গোল্ডস্টেইন ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে মসজিদের মেঝেতে অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছিল।

 

রবিন এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করলেও ইসরায়েলের কট্টরপন্থীদের একাংশ গোল্ডস্টেইনকে ‘সম্মানিত’ ব্যক্তি হিসেবে মর্যাদা দেয়। কিরিয়াত আরবায় তার সমাধি কট্টরপন্থী জায়নিস্টদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়। ২০২৩ সালে কট্টরপন্থী নেতা ও ইসরায়েলের বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির গোল্ডস্টেইনের ছবির সামনে রেখে ভাষণ দেন।

 

এই ঘটনার পর ১৯৯৪ সালে একটি ইসরায়েলি কমিশনের সুপারিশে মসজিদের নামাজের অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ করা হয়। এর দুই–তৃতীয়াংশ ইহুদিদের ও এক–তৃতীয়াংশ মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত করা হয়।

 

নিয়ম অনুযায়ী, ইহুদিদের ১০টি ধর্মীয় উৎসবে মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি মুসলিমদের ১০টি ধর্মীয় দিনে ইহুদিদের প্রবেশও নিষিদ্ধ করা হয়।

 

১৯৯৭ সালের হেবরন প্রোটোকল অনুযায়ী, শহরটিকে এইচ১ ও এইচ২ এই দুই প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়। মসজিদটি এইচ২–এ অবস্থিত, যার মাধ্যমে মসজিদ এলাকা ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। তবে মসজিদের ব্যবস্থাপনা এতদিন ইসলামিক ওয়াকফ (ধর্মীয় ট্রাস্ট) ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ–নিয়ন্ত্রিত হেবরন পৌরসভার হাতেই রাখা হয়।

 

গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় কী ঘটেছে?

 

২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইব্রাহিমি মসজিদসহ পশ্চিম তীরের বেশ কয়েকটি পবিত্র স্থানে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এই সময়ে বসতি স্থাপনকারী ইহুদিদের হামলা পরিমাণও বেড়েছে। ইসরায়েল এই মসজিদে আজান নিষিদ্ধ করে। ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসহ নামাজ আদায়ে নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।

 

ইসরায়েল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হেবরনের নির্বাচিত ফিলিস্তিনি মেয়র ইয়াসির আবু স্নেইনাকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, স্থানীয় কিছু শেখ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইসরায়েল স্বীকৃত একটি ‘হেবরন আমিরাত’ গঠনের পরিকল্পনা করছিলেন।

 

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর ইসরায়েল পরিচালিত সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একতরফাভাবে মসজিদের কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণের নিয়ন্ত্রণ হেবরন পৌরসভার কাছ থেকে কেড়ে নেয়। এর ফলে সেখানে ছাদ নির্মাণের ক্ষমতা পায় ইসরায়েল। যার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি ।

 

এছাড়া মসজিদের পরিচালক শেখ মু’তাজ আবু স্নেইনা ও তত্ত্বাবধায়ক হাম্মাম আবু মুরখিয়াকে ১৫ দিনের জন্য মসজিদে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

 

ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বারবার নামাজে বিঘ্ন ঘটাতে মসজিদে প্রবেশ করেছে। এমনকি কেউ কেউ সেখানে বিয়ের অনুষ্ঠান ও সঙ্গীত উৎসবেরও আয়োজন করে।

 

এসব কর্মকাণ্ডে উপস্থিত ছিলেন কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ ও ইতামার বেন গাভির। বেন গাভির নিজেই কিরিয়াত আরবার বাসিন্দা।

 

অতীতে ইসরায়েলি নেতাদের মুসলিম পবিত্র স্থানে অবৈধ যাতায়াতের বিষয়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ২০০০ সালে ইসরায়েলি কট্টরপন্থী নেতা এরিয়েল শ্যারনের আল–আকসায় অবৈধ প্রবেশের পরই দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয়।

 

ফিলিস্তিনিরা কী বলছে?

 

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) বলেছে, ডিসেম্বরে মসজিদের একতরফা দখলকে ইসরায়েলের ‘ইহুদিকরণ প্রকল্প’-এর অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করে।

 

এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানায়, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও প্রস্তাবনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ইব্রাহিমি মসজিদের আইনগত ও ঐতিহাসিক মর্যাদার ওপর গুরুতর আগ্রাসন।

 

হামাসও এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ইসরায়েল সরকার মসজিদের পরিচয় এবং হেবরনের আরব ও ইসলামী চরিত্র মুছে দিতে চায়।

 

ইসরায়েল কী বলছে?

 

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে বিতর্কিতভাবে মসজিদে গিয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

 

তবে ইসরায়েলি সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দাবি করেছে, এই পদক্ষেপের পরেও মসজিদে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় থাকবে এবং নামাজের ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হবে না।

 

হেবরন পৌরসভার ইসরায়েলি নেতা এয়াল গেলম্যান বলেন, এটি পূর্বপুরুষদের সমাধিস্থলে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রাচীনকালের মতো পুরো মাখপেলার গুহা এলাকায় ইহুদি নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আমরা কাজ করছি।

 

সামনে কী হতে পারে?

 

জুলাইয়ে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর কাতার, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলো ইসরায়েলের পদক্ষেপের নিন্দা জানায়। তবে ডিসেম্বরে পরিকল্পনা–সংক্রান্ত অধিকার চূড়ান্তভাবে দখলের সময় তারা আর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

 

হেবরন পৌরসভার পক্ষে ফিলিস্তিনি আইনজীবীরা ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন। তারা ইউনেস্কোর রায় উদ্ধৃত করে বলেছেন, এই মসজিদে ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং তাদের চলমান নির্মাণকাজের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই।

 

আইনজীবীরা ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজকে বলেছেন, মসজিদ–সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত ‘কোনো বৈধ কর্তৃত্ব ছাড়াই নেওয়া হয়েছে’ এবং এটি ‘স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক ও বেআইনি আগ্রাসন’।