৯ মাস ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) রাজধানীর যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার (মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার) থেকে আদায় করা টোলের টাকার ভাগ দিচ্ছে না ওরিয়ন গ্রুপ। কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে যানবাহন না চলার অজুহাত দেখিয়ে গেল বছরের মে মাস থেকে প্রায় ২৮০ দিন ধরে (চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) সিটি করপোরেশনকে কোনো টাকা দেয়নি তারা।
এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়, এর আগে একই কারণ দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ বছরেরও বেশি সময় সরকারকে রাজস্ব দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এবার কম যানবাহন চলাচলের কথা বলে টোলের ভাগ বন্ধ রাখার পাশাপাশি আরও দুই হাজার ৩৪ দিনের জন্য (৫ বছর ছয় মাস ২৮ দিন) চু্ক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও জানিয়েছে ওরিয়ন।
বকেয়া শোধ না করে মেয়াদ বাড়ানোর তোড়জোড়
দেশের প্রথম টোলভিত্তিক পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প হিসেবে নির্মাণ করা হয় যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার। ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর দেশের দীর্ঘতম এই ফ্লাইওভারে যান চলাচল শুরু হয়। সেদিন থেকেই চলছে টোল আদায়। শুরু থেকেই ফ্লাইওভারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করছে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ফ্লাইওভার চালুর পর গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ হাজার ১৫৭ দিনের (১১ বছর ৪ মাস ১৯ দিন) মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৭৬৫ দিনের (৪ বছর ১০ মাস চার দিন) টোলের ভাগ সিটি করপোরেশনকে দিয়েছে ওরিয়ন। ইক্যুয়িটি বেনিফিট শেয়ার হিসেবে এ টাকা পরিশোধ করলেও বাকি ২ হাজার ৩৯২ দিনের (৬ বছর ৬ মাস ২০ দিন) টোলের টাকার কোনো ভাগ সিটি করপোরেশনকে দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। করপোরেশনের পক্ষ থেকে পাওনা টাকার জন্য লিখিত ও মৌখিকভাবে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তাদের (ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড) লিখিত ও মৌখিকভাবে করপোরেশনের বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কোনো সাড়া নেই।’
বকেয়া পরিশোধ না করলেও গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ডিএসসিসির প্রশাসকের কাছে ২ হাজার ৩৪ দিনের (পাঁচ বছর ৬ মাস ২৮ দিন) জন্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবাইদুল করিম। চুক্তি অনুযায়ী দৈনিক ৪৩ হাজার ২৮৩টির চেয়েও কম গাড়ি চলাচল করে উল্লেখ করে ওই আবেদনে তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দুই হাজার ৩৪ দিন চুক্তির চেয়েও কম গাড়ি চলাচল করেছে। এতে ওরিয়নের রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে।
যানবাহন চলাচল কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে ওই আবেদনে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিখেছেন, চুক্তিলঙ্ঘন করে ডিএসসিসি দয়াগঞ্জ-পোস্তগোলা লিংক রোড ও ঢাকা সিটি বাইপাস নির্মাণ করেছে এবং এই দুটি সড়কে ফ্লাইওভারের সমান্তরাল সুবিধা থাকার কারণে ফ্লাইওভারে যানচলাচল কম হয়েছে।
এছাড়াও গুলিস্তানে অননুমোদিত জুতার বাজার, অনিয়ন্ত্রিত বাস পার্কিং এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও প্রস্থান পয়েন্টে অ-মোটরচালিত যানবাহনের (রিকশা) অব্যাহত উপস্থিতির কারণেও ফ্লাইওভারে যানবাহন কম ওঠে। এছাড়াও ফ্লাইওভারে নিম্ন-শ্রেণির যানবাহন (দুই চাকার) টোল রাজস্বে ন্যূনতম অবদান রাখে, কিন্তু উচ্চ টোল যানবাহনগুলো (বাস, ট্রাক, ট্রেলার) সে তুলনায় কম যাতায়াত করে।
চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে কিছু সুপারিশ দিয়েছে- এসব কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা হবে।
বারবার একই অজুহাত : ১১ বছরে ডিএসসিসির আয় মাত্র ৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা
চুক্তির দোহাই দিয়ে ওরিয়ন বারবার রাজস্ব পরিশোধ বন্ধ করলেও ডিএসসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করপোরেশনের চুক্তির মধ্যেই শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। সে সুযোগই বারবার কাজে লাগাচ্ছে ওরিয়ন।
এ ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ফ্লাইওভার দিয়ে কতটি বাস, ট্রাক ও অন্যান্য বাস গেলে করপোরেশন রাজস্ব পাবে এটি সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তির সময় সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। এ কারণে বছর শেষে দেখা যায় ফ্লাইওভারে যানবাহন চলাচল কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে হচ্ছে না। আমি মনে করি, সে সময়ের চুক্তিটিই ভালোভাবে হয়নি, এটি ছিল অসম চুক্তি। আবার চুক্তি অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর মূল্যস্ফীতি অনুযায়ী টোলের টাকা সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছিল কিন্তু সেটি নিয়মিত করা হয়নি। ২০২০ সালের একটি জরিপে ৯৪ হাজার গাড়ি চলাচলের কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি একটি জরিপে চলাচলকৃত গাড়ির সংখ্যা সন্তোষজনক ছিল।
সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সালে ফ্লাইওভার চালুর পর ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত কোনো টাকা দেয়নি ওরিয়ন। ২০২০ সালের জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস নিজেই বিষয়টি নিয়ে ওরিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের ফ্লাইওভার দিয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক গাড়ি চলে না। তাই চুক্তি মোতাবেক সেই পরিমাণ গাড়ির বেশি না চললে তারা লভ্যাংশ দেবে না।
পরে সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় ফ্লাইওভারের প্রতিটি সংযোগে টোলপ্লাজা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন মেয়র তাপস। এর অংশ হিসেবে ফ্লাইওভারের সাতটি টোলপ্লাজায় করোনাকালীন সময়ে ওই বছরের গাড়ি চলাচল নিয়ে একটি জরিপ করেন। জরিপে ফ্লাইওভার দিয়ে প্রতিদিন ৯৪ হাজার ৩৫৩টি গাড়ি চলাচলের রিপোর্ট প্রদান করা হয়। জরিপের রিপোর্টে করোনাকালীন সেই সময়ে ফ্লাইওভার দিয়ে তুলনামূলক কম গাড়ি চলছে উল্লেখ করা বলা হয়, করোনার পর গাড়ি চলাচলের সংখ্যা আরও বাড়বে ।
এদিকে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাব বলছে, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারে প্রতি ঘণ্টায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলে ৮ থেকে ১০ হাজার। এক দিনে গাড়ি চলে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার। বছরে গাড়ি চলে ৭০ কোটি ৮০ হাজার। সে হিসেবে টোল আদায় হওয়ার কথা বছরে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আর ওরিয়ন হিসাব দিচ্ছে বছরে ১৪০ কোটি থেকে ১৭৮ কোটি টাকার। এ ছাড়া ফ্লাইওভারের নির্মাণ নকশা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নিচের রাস্তা বন্ধ করে পায়ার ও ডিভাইডার করা হয়েছে যাতে গাড়ি কম চলতে পারে।
মেয়র তাপসের সমীক্ষার পর প্রতি মাসে লভ্যাংশ দিতে রাজি হলেও শেষ পর্যন্ত কথা রাখেনি ওরিয়ন। ডিএসসির রাজস্ব বিভাগের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ইক্যুইটি শেয়ার বেনিফিট হিসেবে সিটি করপোরেশনকে সবমিলিয়ে ৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে ওরিয়ন। এরপর থেকে ফের লভ্যাংশ দেওয়া বন্ধ রেখেছে তারা।
অসম চুক্তির সুযোগ নেয় ওরিয়ন, পদে পদে অনিয়ম
চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন পাওয়ার পর গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারে গাড়ি চলাচলের প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। গত ১১ নভেম্বর কমিটির পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন করপোরেশনে জমা দেওয়া হয়। ১২ নভেম্বর সেটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পাঠানো হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে।
ওই প্রতিবেদনের একটি কপি পেয়েছে এশিয়া পোস্ট। তাতে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০০৫ সালের ২১ জুন বেলহাসা–একম জেভি ও এসোসিয়েটস লিমিটেডের সঙ্গে ডিএসসিসির যাত্রাবাড়ী–গুলিস্তান ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রথম চুক্তি হয়। ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি বেলহাসা–একম জেভি ও এসোসিয়েটস লিমিটেডের পরিবর্তে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে করপোরেশনে লিপিবদ্ধ হয়। চুক্তির সিডিউল–সি অনুযায়ী টোল আদায়ের শুরুর দিন থেকে ২০৩৭ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দৈনিক ৪৩ হাজার ২৮৩টি গাড়ি চলাচল করলে ২৪ বছর সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান মালিকানা ভোগ করবে। সে অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১ মে থেকে আরও ৪১৮৩ দিন চুক্তির মেয়াদ আছে।
প্রতিবেদন দাখিলের পূর্ববর্তী ৪১৫৭ দিনে ফ্লাইওভারে চলাচলকৃত গাড়ি ও রাজস্ব জমাদানের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের যানবাহন চলাচলের ঘাটতি দেখানোর কারণে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ডিএসসিসিকে ২৩৯২ দিনের কোনো ইক্যুইটি বেনিফিট শেয়ার প্রদান করেনি। পরবর্তীতে ১৭৬৫ দিনের শেয়ার প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে তথ্য ভিত্তিক জবাবদিহিতায় আনার সুপারিশ করে কমিটি।
এছাড়া টোল আদায়ের স্লিপ প্রস্তুত এবং বিকাশে টোল পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে ওরিয়ন সিটি করপোরেশনের মতামত নেয়নি বলে জানতে পেরেছে কমিটি। তাই ওই দুই পদ্ধতিতে আদায়কৃত টোলের লভ্যাংশ ডিএসসিসি পেয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেনি কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, টোল প্লাজার স্লিপের মাধ্যমে মাসিক রিপোর্টে টোলপ্লাজার নাম, কাউন্টার নাম্বারের বিপরীতে সিরিয়াল নম্বর ও গাড়ির ধরন উল্লেখ না থাকায় গাড়ির সংখ্যা টোল আদায়ের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এক্ষেত্রে বিকাশ পেমেন্টের টাকার শেয়ার নিশ্চিতকরণ, আদায়কৃত টোল দৈনিক ব্যাংকে বিবরণী ও অনলাইন পেমেন্ট হিসেব নেওয়া এবং টোল আদায়ে কম্পিউটার সিস্টেম ক্রস চেকিংয়ের জন্য আইটি বিশেষজ্ঞের দ্বারা পরীক্ষার সুপারিশ করে কমিটি।
কমিটির প্রতিবেদনে এমন আরও বহু অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে করপোরেশনে লভ্যাংশের টাকা না দিলে পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফার হার অনুযায়ী দুই শতাংশ হারে অপরিশোধিত টাকার ওপর মুনাফা পরিশোধ করতে হবে। তবে ওরিয়ন ২০১৩ সাল থেকে এই অপরিশোধিত টাকার ওপর মুনাফা পরিশোধ করেনি।
কমিটির পক্ষ থেকে দ্রুত এই বকেয়া মুনাফা আদায়ের তাগিদ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী ফ্লাইওভারে ৬৫ হাজার ৫৮১টির ওপর যানবাহন চলাচল করলে নিট আয়ের ৪০ শতাংশ করপোরেশন প্রাপ্য হবে। তবে চুক্তির সিডিউল–সি মতে ৫ শতাংশ শেয়ারের অর্থ থেকে ৪০ শতাংশ নিট মুনাফাপ্রাপ্তি হবে বহুগুণ বেশি। সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, ইক্যুইটি শেয়ার ৪০ শতাংশ নিট মুনাফার বিষয়টি অনুপস্থিত। কমিটি চুক্তির এই অংশটি স্পষ্টকরণের মতামত দিয়েছে করপোরেশনকে।
তদন্ত কমিটি আরও উল্লেখ করে, ২০০৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী যানবাহনের শ্রেণি ১১টি এবং চুক্তির সিডিউল–সি অনুযায়ী যানবাহনের শ্রেণি ৮টি ধরা হয়েছিল। তবে ২০১৩ সালে কোন শর্তবলে যানবাহনের শ্রেণি বৃদ্ধি করা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। সিডিউল–সি অনুযায়ী জিপ, মাইক্রোবাস ও পিকআপ এক শ্রেণির হলেও টোলের হার করা হয়েছে ৩০, ৩৫ ও ৫৫ টাকা। ট্রাক ও ট্রেইলার একই শ্রেণির হলেও পরবর্তীতে পৃথক শ্রেণি করে টোলের হার ৭৩, ১১০ ও ১১৫ টাকা করা হয়েছে। চুক্তিতে যানবাহনের শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। বিষয়টি স্পষ্টীকরণের সুপারিশ করেছে কমিটি।
এছাড়া টোল আদায়ের স্লিপের স্বচ্ছতা, টোল আদায় লেনে কম্পিউটার সিস্টেম ও বুথের লেনের জন্য এআই ক্যামেরা সংযুক্ত করা, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও সিস্টেম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সিস্টেম সিকিউরিটি সংরক্ষণের প্রতিষ্ঠান পৃথক করতে সুপারিশ করে। এর সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানসম্মত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট ফার্ম দ্বারা যানবাহন সংখ্যা, ধরন ও সমগ্র রাজস্ব আদায়ের অডিট করতে করপোরেশনকে সুপারিশ করা হয়েছে।
চূড়ান্ত সুপারিশে ডিএসসিসিকে ফ্লাইওভারে চলাচলরত যানবাহনের ধরন ও সংখ্যা নির্ণয়ে ডিজিটাল আইটি সিস্টেম স্থাপন করা ও সময়ে সময়ে ম্যানুয়ালি যানবাহন গণনা করতে বলেছে কমিটি।
কমিটির আহ্বায়ক ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মোবাশ্বের হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, সে সময় যারা করপোরেশনের দায়িত্বে ছিলেন তারা জেনে বা না বুঝেই একটি অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। ফ্লাইওভারের টোল আদায়ের মনিটরিং সিটি করপোরেশনের আয়ত্তে রাখার কথা থাকলেও সেটি সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়েছে। তারাই মনিটরিং করে করপোরেশনকে রিপোর্ট করবেন, কিন্তু এটি কখনোই হয়নি। তারা তথ্যই দেয়নি ডিএসসিসিকে। আবার যেটি দিয়েছে সেটি চলাচলকৃত গাড়ির চেয়েও কম। তিন বছর পর পর টোল আদায়ের মূল্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে সমন্বয় করার কথা থাকলেও সেটি হয়নি।
মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশে ৫ নির্দেশনা মন্ত্রণালয়ের
ওরিয়নের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন বিবেচনার স্বার্থে কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ডিএসসিকে পাঁচটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে-
- চুক্তির অনুচ্ছেদ ৯ অনুযায়ী ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সঠিক সংখ্যা ও ধরন পরীক্ষা-নিরীক্ষার লক্ষ্যে নিরপেক্ষ অডিটর (দেশের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের স্বনামধন্য ফার্ম) নিয়োগ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
- চুক্তির ১৮.২ ধারা অনুযায়ী ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড কর্তৃক যানবাহন চলাচলের ধরন ও সংখ্যা নির্ধারণে ব্যবহৃত হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের ডেটাবেস, ড্যাশবোর্ড এবং রিপোর্টিং অ্যাক্সেস করপোরেশনকে প্রদানসহ দৈনিক/মাসিক যানবাহন চলাচল গণনা শিটে উভয়পক্ষের স্বাক্ষর গ্রহণ।
- সব ধরনের যানবাহনের লাইভ ডাটা ডিএসসিসি কর্তৃক এক্সেস থাকা অটোমেশন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
- চুক্তির ধারা ১৮.২ অনুযায়ী ২০২৬ সাল থেকে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে প্রতিদিন/প্রতি সপ্তাহ/প্রতি মাসে ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ও ধরন মনিটরিং নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১টি মনিটরিং সেল গঠন করা এবং ওই মনিটরিং সেল কর্তৃক করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দৈনিক/সাপ্তাহিক/মাসিক প্রতিবেদন দাখিলের ব্যবস্থা গ্রহণ।
- ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলকারী যানবাহন গণনাকল্পে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং যানবাহন চলাচলের সংখ্যা ও ধরন নির্ণয়ে করপোরেশন কর্তৃক সময়ে সময়ে ম্যানুয়ালি জরিপ কার্য পরিচালনা করা এবং চুক্তি অনুযায়ী ফ্লাইওভার পরিচালনা ও রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি যথাযথ তদন্তপূর্বক সুষ্ঠু সমাধান নিশ্চিত করা।
বক্তব্য মেলেনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড গ্রুপের বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবাইদুল করিমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। যাত্রাবাড়ী–গুলিস্তান ফ্লাইওভারে ওরিয়নের হটলাইন নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়ার পরও কেউ রিসিভ করেননি।
ওরিয়নের পক্ষে ডিএসসির সঙ্গে যোগাযোগ সমন্বয়কারী কর্মকর্তা জাকারিয়া ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে খালেদ মাসুদ নামে ওরিয়ন গ্রুপের এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে ফোন করে, অফিসে গিয়ে তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পরামর্শ দেন। তবে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের লভ্যাংশ নিয়ে ডিনএসসির সঙ্গে জটিলতার ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।