Image description
১২ বছরের মধ্যে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি

ভারতে রাজনৈতিক টার্গেট হতে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গতকাল আলোচিত ককরোচ জনতা পার্টির সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত ১২ বছরের মধ্যে এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েননি নরেন্দ্র মোদি। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোট সুপ্রিম কোর্ট অভিযান কর্মসূচি ঘোষণা করায় আন্দোলন ছাত্র-জনতার মধ্যে ছড়িয়ে ব্যাপকতা লাভ করবে। এদিকে আন্দোলনের তীব্রতা উপলব্ধি করে গতকাল ছুটির দিন ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়ে কার্যকরী বিচারক আদালত বিশেষ শুনানি দিয়ে ককরোচ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দ্বীপ, সহ আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে জামিন দিয়েছেন। এর পরেই তাঁরা এবং অন্য ছাত্রসংগঠনের নেতারা প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়াতে সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এ সময় প্রেস ক্লাব বাইরে থেকে কয়েক শ পুলিশ ঘিরে রাখে। ককরোচ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক দাদির মৃত্যুতে শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য নিজ গ্রামের বাড়িতে চলে যান। অন্যরা সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন।

এদিকে নরেন্দ্র মোদি সরকারি অনুষ্ঠানের জন্য দিল্লি ছেড়ে চেন্নাই চলে যান। বিষয়টিকে অনেকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। অভিজিৎ কারামুক্ত হওয়ার পরেই এক্স হ্যান্ডেল লিখেছে ‘মোদি দেশের জন্য লজ্জা’। সেই সুরেই সংবাদ সম্মেলনে আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যেভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাচ্ছেন, এরপর আমাদের মোদি-অমিত শাহর বিরুদ্ধেই নামতে হবে।’ আরেক নেতা সৌরভ দাস বিস্ফোরক দাবি করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই জ্ঞানেশ কুমার জানেন ২০২৪ সালে কীভাবে মোদি নির্বাচনে জিতেছিলেন। তাই তাঁকে রক্ষা করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মোদি নিজের বারাণসী কেন্দ্রে গণনায় পিছিয়ে ছিলেন। তারপর তাঁকে জেতানো হয়।’ এখন দেশে কেবল যুব নয়-ছাত্র, সুশীল সমাজ, এমনকি বলিউড অভিনেতা, সঞ্জয় মঞ্জরেকরিবের মতো সাবেক ক্রিকেটাররাও আন্দোলনে সমর্থন করছেন। 

যার পরিপ্রেক্ষিতে ভোট কারচুপির বিষয়টি এখন ভারতের ঘরে ঘরে আলোচ্য বিষয় হয়ে গেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রথম ভোটচুরির অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছিলেন। এটাই এখন ককরোচ পার্টির ইস্যু। সোমবার রাহুল গান্ধী ডাক দিয়েছেন ‘চলো দিল্লি’। ফলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও তীব্র হবে। ককরোচ পার্টির আন্দোলন ঠেকাতে যেভাবে ভারত সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে, তাতে ওই পার্টির নেতা আশুতোষ বলেছেন, ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা থেকেও ভয়ংকরভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হয়েছে। ‘১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করে বিরোধী নেতাদের আটক করেছিলেন। এবার তার চেয়েও ভয়ংকরভাবে আক্রমণ করা হয়েছে।’ এদিকে দিল্লির সমাবেশে কেউ যাতে যোগ দিতে না পারেন, সেজন্য দুই শর বেশি ট্রেন যাত্রা বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ। 

এ ছাড়া শনিবার দিল্লির শিখ সম্প্রদায়ের পবিত্র গুরুদুয়ারে পুলিশ গিয়ে তল্লাশি চালিয়েছে। তাতে শিখ সম্প্রদায়ের ভাবাবেগে আঘাত এসেছে। যে কারণে বিজেপির শরিক অকালি দল এখন ককরোচ পার্টির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবি সমর্থন করছে। মোদির জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিহারের শরিক চী রাগ পশ্বনের লোক জনশক্তি পার্টি দিল্লি পুলিশের আচরণে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও মোদি সরকারের পক্ষে ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন যুব সম্প্রদায় ও গণমাধ্যমের ওপর হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অবশ্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই অভিযোগ স্বীকার করছে না।  এর আগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবির আন্দোলনে পুলিশ যেভাবে ব্যাপক অত্যাচার করেছিল, এবার পুলিশ সেই তুলনায় কিছুটা সংযত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের দুষ্কৃতকারীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রদের তল্লাশি করেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দিল্লির অনেক জায়গা থেকে নিরাপত্তাবেষ্টনী প্রত্যাহার হয়। তাতেও কোনো সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হলে এই আন্দোলন মোদির পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হবে যোগ করেন এক বিশ্লেষক। এদিকে আন্দোলনের ডামাডোলের মধ্যে গতকাল পুলিশ মধ্য দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুনরায় নিরাপত্তাবেষ্টনী বসিয়েছে। 

গতকাল পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি যুব-ছাত্রনেতাকে আাটক করা হয়েছে। খেলার স্টেডিয়ামকে অস্থায়ী জেল ঘোষণা করেছে সরকার। দিল্লিতে ২০ হাজারের বেশি পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ শুনানির পর নিরাপত্তাবেষ্টনী প্রত্যাহারের নির্দেশের পরও অনেক জায়গায় বহাল রাখা রয়েছে। বন্ধ মেট্রোরেল চালু করার নির্দেশ দিয়েছে। এখনো স্বাভাবিক সার্ভিস হয়নি। ঘটনার বিশেষত্ব হলো, পুলিশ বলছে না আটক করা হয়েছে। ককরোচ নেতা এবং সামাজিক গণমাধ্যমকর্মী ধ্রুব রথি অভিযোগ করছেন, তাঁদের জিম্মি করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মোদি সরকার কার্যত দিশাহারা। আলোচনার রাস্তা না খুললে সরকারের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে।