২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার জন্য মস্কো ও কিয়েভ সফর করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই দূত। তারা হলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। মার্কিন কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার তারা সফর এ শুরু করবেন।
শনিবার মস্কোর ক্রেমলিনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এর পর রোববার কিয়েভে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করবেন। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে সফর নিয়ে আলোচনা করেন উইটকফ ও কুশনার।
যুদ্ধ বন্ধে পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, আমি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারকে পাঠিয়েছি। তারা দুজনই দক্ষ আলোচক। তাদের পাঠিয়েছি কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায় কিনা সে চেষ্টা করতে।
অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব জেলেনস্কির
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূতদের মস্কো ও কিয়েভ সফরকে সামনে রেখে রাশিয়ার সাথে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ট্রাম্পের দূত জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফ যথাক্রমে শনিবার মস্কো এবং রোববার কিয়েভ সফর করার কথা রয়েছে।
শান্তি আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি ও দূতদের নিরাপদ যাতায়াতের স্বার্থে এই কূটনৈতিক সফরের সময় উভয় পক্ষকে বিমান হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এক বার্তায় ট্রাম্পের দূতদের এই সফরের কথা নিশ্চিত করে জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনীয় কূটনীতিকরা মার্কিন প্রতিনিধিদের সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন এবং তাদের নিরাপদ গমনাগমন নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট আকাশসীমা স্বাভাবিক রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই বৈঠক ও লজিস্টিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে কোনো বিমান হামলা চালানো হবে না। একইভাবে রাশিয়াকেও বিমান হামলা বন্ধ রেখে নীরবতা পালনের মাধ্যমে এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
সাড়ে চার বছর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইউক্রেন ‘বাস্তব বিকল্প’ চায় উল্লেখ করে জেলেনস্কি বলেন, তার দেশ রাশিয়াকে নিয়ে নয়, বরং ট্রাম্পের দূতদের নিয়ে ভাবছে। মস্কো তাদের কী জবাব দেয় ও দূতেরা কী প্রস্তাব নিয়ে আসেন, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে কিয়েভ। তবে জেলেনস্কির প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় এখনও কোনো বার্তা দেয়নি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তার সরকার।
জেলেনস্কির এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি এমন এক দিনে এলো, যেদিন ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তরে ভরদুপুরে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দাবি, মূলত গোয়েন্দা প্রধানের কার্যালয়কে লক্ষ্য করেই ওই হামলাটি চালানো হয়েছিল। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর রাশিয়ার দিনের বেলার বিমান হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিয়েভে হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ওদেসা অঞ্চলে রাশিয়ার রাতভর বিমান হামলায় একজন নিহত এবং এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন। এছাড়া নিপ্রো শহরে পৃথক এক হামলায় পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। সংঘাতের এমন তীব্রতার মধ্যেই যুদ্ধবিরতি ও দীর্ঘস্থায়ী নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ইউক্রেনের রাজধানীতে ট্রাম্পের শীর্ষ দূতদের এই প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে দেওয়া মার্কিন আর্থিক সহায়তার অর্থ ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছ থেকে ফেরত চাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অবস্থানের কথা জানান। গত বৃহস্পতিবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ইউক্রেন ও ন্যাটোকে বিনা শর্তে শত শত কোটি ডলার দেওয়া হয়েছিল, যা চাওয়া হলেই ইউরোপ পরিশোধ করত। কিছুটা দেরিতে হলেও আমরা এখন সেই অর্থ ফেরত চাইব। তবে ইউরোপের কোন কোন দেশের কাছে এই অর্থ চাওয়া হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ইউক্রেনে ডব্লিউএইচওর গুদামে হামলা
ইউক্রেনের কিয়েভ ওব্লাস্টে চালানো বিমান হামলায় ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএইচও) একটি গুদাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো প্রাণহানি না হলেও এই হামলায় জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর মজুত ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গোয়েন্দা সংস্থার অন্তর্কলহে ক্ষুব্ধ জেলেনস্কি
সম্প্রতি ইউক্রেনের দুই প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে হওয়া গোলাগুলির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে গত বুধবার হওয়া অভ্যন্তরীণ কলহের বিষয়ে জেলেনস্কি বলেন, এ ঘটনার জন্য উভয় সংস্থাকেই জবাবদিহি করতে হবে। তারা যে আচরণ করেছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরখাস্তের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। গত বুধবার প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়ে ইউক্রেনের দুই প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
বাল্টিক সাগরে রুশ নজরদারির তথ্য
পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেসামরিক জাহাজগুলো বাল্টিক সাগর অঞ্চলের জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ও সমুদ্র তলদেশের কেবলের ওপর গোপনে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে পোল্যান্ড। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে মস্কো।