বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে ঘিরে গত কয়েক দিনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ‘কারখানা বন্ধ’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একের পর এক খবর প্রকাশিত হয়েছে— গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিবিএল গ্রুপসহ একাধিক পোশাক কারখানা নাকি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন এবং দেশের অন্যতম প্রধান রফতানি খাত বড় সংকটের মুখে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আসলেই কি কারখানা বন্ধ হচ্ছে, নাকি বাস্তব পরিস্থিতিকে ঘিরে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে?
গ্যাস সংকট থেকেই আলোচনার শুরু
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ার অনেক কারখানায় দিনের দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদনের সময়সূচি পরিবর্তন করছেন, রাতের শিফটে কাজ বাড়াচ্ছেন কিংবা কিছু ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে সীমিত আকারে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বাস্তব সংকটের মধ্যেই ডিবিএল গ্রুপের সব পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার খবর প্রকাশিত হলে বিষয়টি দ্রুত জাতীয় আলোচনায় চলে আসে।
ডিবিএলকে ঘিরে উদ্বেগ কেন?
ডিবিএল গ্রুপ দেশের অন্যতম বড় রফতানিমুখী শিল্পগোষ্ঠী। প্রতিষ্ঠানটির মাসিক রফতানির পরিমাণ প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে শিল্প-সংশ্লিষ্টদের ধারণা। গ্রুপটিতে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন।
তাই এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের সব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ এটি সত্য হলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো শিল্পখাতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত।
বিজিএমইএ: 'কারখানা বন্ধ' নয়, উৎপাদন সীমিত
এই পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে জানায়, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিবিএলসহ একাধিক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে— এমন খবর ভুল, ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর।
সংগঠনটির দাবি, গ্যাস সংকট সত্ত্বেও তাদের সদস্যভুক্ত অধিকাংশ কারখানা এখনও ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রেখে কাজ করছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন কমেছে, তবে শিল্প পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।
বিজিএমইএর মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়া এমন সংবাদ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দেয় এবং বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন তৈরি করে।
বিকেএমইএ: এটি ছিল ছুটি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার ভাষ্য, গ্যাস বা বিদ্যুতের সংকটের কারণে ওই দিন কোনও সদস্য কারখানা বন্ধ করা হয়নি।
তিনি জানান, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি সদস্য কারখানা সামনে থাকা ৫ আগস্টের সরকারি ছুটি এবং সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে তিন থেকে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে।
এছাড়া শ্রমিকদের অনুরোধে কয়েকটি কারখানা অতিরিক্ত ছুটি দিয়ে পরে সাধারণ ডিউটির মাধ্যমে সেই সময় সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতি হবে না, আবার উৎপাদন পরিকল্পনাও বজায় রাখা সম্ভব হবে।
মোহাম্মদ হাতেমের মতে, এই ছুটিকে অনেকেই ভুলভাবে ‘কারখানা বন্ধ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘‘এই সময়ের মধ্যে যদি ডাইং ইউনিটগুলো সীমিত পরিসরে চালু রাখা যায়, তাহলে গ্যাসের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিছু ফ্যাব্রিক প্রস্তুত করা সম্ভব হবে, যা পরবর্তী উৎপাদনের জন্য সহায়ক হবে।’’
তাহলে বিভ্রান্তি তৈরি হলো কেন?
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত কারণ হলো ‘সাময়িক উৎপাদন বিরতি, ‘ছুটি সমন্বয়’ এবং ‘স্থায়ী কারখানা বন্ধ’—এই তিনটি ভিন্ন বিষয় অনেক ক্ষেত্রে একসঙ্গে মিশে গেছে
একদিকে গ্যাস সংকটের কারণে কিছু কারখানায় উৎপাদন কমানো হয়েছে। অন্যদিকে সামনে টানা ছুটি থাকায় কিছু কারখানা উৎপাদন পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করেছে। আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে আর্থিক সংকটে কিছু প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধও হয়েছে।
এই ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাকে এক সূত্রে গেঁথে পুরো পোশাক খাতে ব্যাপক কারখানা বন্ধের চিত্র তুলে ধরা হলে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক
বাস্তব সংকট কিন্তু অস্বীকার করা যাচ্ছে না
কারখানা বন্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও শিল্পের প্রকৃত সংকট নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতি শিল্পকে আরও চাপে ফেলেছে।
রফতানিতেও চাপের ইঙ্গিত
এদিকে নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই রপ্তানির পরিসংখ্যানও সেই চাপের ইঙ্গিত দিয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে দেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কম।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। তবে সংগঠনটির মতে, গত বছরের জুলাই ছিল ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ রফতানির মাস। তাই উচ্চ ভিত্তির কারণে সামান্য নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিকে বড় সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞ যা বলছেন
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘শুধু এক মাসের রফতানি প্রবৃদ্ধি বা কারখানা বন্ধের খবর দেখে পুরো শিল্পের অবস্থা মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।’’
তিনি বলেন, ‘‘গত বছরের জুলাই ছিল অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ রফতানির মাস। সেই উচ্চ ভিত্তির বিপরীতে এবার সামান্য নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি পরিসংখ্যানগতভাবেই স্বাভাবিক। ইতিবাচক বিষয় হলো, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও রফতানি প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও ক্রেতাদের আস্থার প্রতিফলন।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘তবে শিল্পের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন জ্বালানি নিরাপত্তা। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সময়মতো পণ্য সরবরাহ কঠিন হচ্ছে এবং উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।’’
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বিশ্ববাজারে এখন প্রতিযোগিতা শুধু কম দামে পণ্য বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সময়মতো সরবরাহ, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন এবং নির্ভরযোগ্য সাপ্লাই চেইনই এখন বড় শক্তি। তাই গ্যাস ও বিদ্যুতের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আগামী মাসগুলোতে রফতানি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।
মূল প্রশ্ন এখন জ্বালানি, গুজব নয়
বিশ্লেষকদের মতে, কারখানা বন্ধ নিয়ে আলোচনার মূল কারণ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের খবর নয়; বরং দেশের শিল্পাঞ্চলে চলমান জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বাস্তবতা এবং রফতানির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব।
তাদের মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়া 'কারখানা বন্ধ' শিরোনাম আন্তর্জাতিক বাজারে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। আবার বাস্তব সংকট আড়াল করাও সমাধান নয়। বরং সরকারের দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, শিল্পমালিকদের স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল প্রতিবেদনের সমন্বয়েই বিভ্রান্তি দূর হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতের প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অটুট রাখাও সম্ভব হবে।