কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি ময়লা প্লাস্টিকের ব্যাগে জমানো নথিপত্রগুলো বারবার ঘেঁটে দেখছেন অন্তু শেখ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর থেকেই আতঙ্কে আছেন ৪০ বছর বয়সী এই রেলওয়ে নির্মাণশ্রমিক। তার ভয়, কেবল ভোটাধিকার হারানোই তার একমাত্র সমস্যা নয়।
গত এপ্রিল ও মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা থেকে রাজ্যের প্রায় ৯০ লাখ বাসিন্দার নাম বাদ দেওয়া হয়।
অন্তু শেখ তাদেরই একজন। ১০ কোটির বেশি মানুষের এই রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রাজ্যে এবারই প্রথম ক্ষমতায় এসেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। মৃত, একই ব্যক্তির একাধিক নাম বা সন্দেহভাজন ভোটার শনাক্ত করতে পুরো ভারতে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) কার্যক্রম চালায় দেশটির নির্বাচন কমিশন।
এই বিতর্কিত কার্যক্রমের ফলেই বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে এসআইআর কার্যক্রমের পক্ষে সাফাই গেয়েছে মোদি সরকার। তারা একে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘অবৈধ’ বাংলাদেশি অভিবাসীদের চিহ্নিত করার মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করছে।
তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন চিত্র পেয়েছেন। তারা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের মতো যেসব জেলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারেন, সেখানেই নাম কাটার হার বেশি।
অন্তু শেখ নিজেও মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা। তিনি এখন আশঙ্কা করছেন যে ভোটাধিকার হারানো কেবল তার এই সংকটের শুরু মাত্র। সামনে হয়তো আরও বড় কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরপরই বিজেপি সরকার ঘোষণা করেছে যে, যাদের নাম ভোটার তালিকায় নেই, তারা সরকারি রেশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবে না।
গত ৪ জুন রাজ্যের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তর এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধনীর সময় যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের রেশন কার্ড ‘নিষ্ক্রিয়’ করে দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯ কোটি মানুষ এই সরকারি রেশন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
সরকার অবশ্য পরে জানিয়েছে, প্রায় ২৩ লাখ মানুষ বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাদের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আবেদন করেছেন। এই আপিলের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা সরকারি সুবিধাগুলো পেতে থাকবেন।
অন্তু শেখ এই ২৩ লাখ মানুষেরই একজন। তার মামলাটি বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। তবে রেশন সুবিধা সচল রাখতে কর্তৃপক্ষ তাকে আরও কিছু নথিপত্র জমা দিতে বলেছে। পেশায় দিনমজুর অন্তু শেখ রেলওয়ের নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করেন। কাজের প্রয়োজনে ঠিকাদারের নির্দেশে তাকে বিভিন্ন রাজ্যে যেতে হয়।
এবার তাঁকে পাশের রাজ্য আসামে যেতে হবে। অন্তু শেখ বলেন, ‘কাগজপত্র আর শুনানির অপেক্ষায় আমি অনির্দিষ্টকাল এখানে বসে থাকতে পারি না। কাজে না গেলে আমার কোনো আয় হবে না।’ অবিবাহিত অন্তু শেখ মুর্শিদাবাদে তাঁর বোনের সঙ্গে থাকেন। ১ জুন তিনি রেশন পেলেও সামনের দিনগুলো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
একই দুশ্চিন্তায় আছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাকিনা বানু। ৪০ বছর বয়সী সাকিনা আল জাজিরাকে জানান, তিনিও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলেন।
কিন্তু কোনো শুনানি ছাড়াই তাঁর আবেদনটি খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। সাকিনা বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও কোনো শুনানি ছাড়াই আমার আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এখন আমাদের খাবার ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া বন্ধ করা হচ্ছে।’
সাকিনার তিন সন্তান রয়েছে। বিপত্তি কেবল খাবার নিয়ে নয়। সাকিনার মতো নারীরা সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা প্রকল্প থেকেও বাদ পড়তে যাচ্ছেন। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ২০২১ সালে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প চালু করেছিল। এর আওতায় প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ নারীকে মাসে ১ হাজার ৪০০ রুপি করে দেওয়া হতো।
এখন এই প্রকল্পের সুবিধাও ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে অনেক নারী এই আর্থিক সহায়তা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের নাম বদলে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ রেখেছে। এই প্রকল্পে ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ৩ হাজার রুপি করা হয়েছে।
তবে সরকার একটি নতুন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এসআইআর বা ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম কাটা গেছে, তারা এই ভাতার জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। সরকার ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের তথ্য যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছে।
‘ধীরে ধীরে তারা সব কেড়ে নেবে’
সাকিনা বানুর স্বামী স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। কয়েক বছর আগে তার হার্টে একটি যন্ত্র (ডিফিব্রিলেটর) বসানো হয়েছে। তখন সরকারি সহায়তায় চিকিৎসার জন্য প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ রুপি খরচ হয়েছিল। সাকিনা আলজাজিরাকে বলেন, ‘সেই চিকিৎসা তার জীবন বাঁচিয়েছিল।’
তবে হার্টের সমস্যার কারণে সাকিনার স্বামী এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। সাকিনা বলেন, ‘আমরা সরকারি রেশন ও আর্থিক সহায়তার ওপরই নির্ভরশীল ছিলাম। এখন কী করব বুঝতে পারছি না। আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বাসিন্দা ইমতিয়াজ আহমেদ এবং তার ভাই মুন্সি সিদ্দিক আহমেদ; উভয়েই সরকারি স্কুলের শিক্ষক। কয়েক দশক ধরে তারা নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
অথচ রহস্যজনকভাবে ভোটার তালিকা থেকে তাদের দুজনের নামই বাদ দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল কোনো কারণ না দেখিয়েই তাদের আপিল খারিজ করে দিয়েছে। এখন কর্তৃপক্ষ তাদের রেশন কার্ডের নথিপত্র জমা দিতে বলেছে। একই সঙ্গে মঙ্গলবারের মধ্যে ১৩ পাতার একটি বিশাল ফরমে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইমতিয়াজ আশঙ্কা করছেন, সব নথিপত্র জমা দিলেও হয়তো তারা সরকারি সুবিধা আর পাবেন না। তিনি বলেন, ‘আগে আমাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এখন রেশন কার্ড কাড়ছে। এভাবে ধীরে ধীরে তারা আমাদের সব কেড়ে নেবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, মুসলিম হওয়ার কারণেই তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে এবং তারা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন।
বিপজ্জনক নজির
ভোটার তালিকার সঙ্গে সরকারি প্রকল্পের এই সম্পর্ক স্থাপন করায় আইনজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এর ফলে গুরুতর সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। গত সপ্তাহে ‘পশ্চিমবঙ্গ খেতমজুর সমিতি’ এই আদেশের বিরুদ্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।
তারা বলছে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ৩৫ থেকে ৬০ লাখ মানুষের রেশন কার্ড বাতিল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে না শুনে তাদের কলকাতা হাইকোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী সঞ্জয় হেগড়ে আল জাজিরাকে বলেন, ভোটার তালিকার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে দেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
আইনজীবীদের মতে, সরকারি সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে ভোটার তালিকায় নাম থাকাকে শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়া গুরুতর সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারে। ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র আইনের চোখে সবাইকে সমান অধিকার দিতে বাধ্য।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী সঞ্জয় হেগড়ে আলজাজিরাকে বলেন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সঙ্গে ভোটার তালিকার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ১৮ বছরের কম বয়সীরা তো ভোটার নয়। তাহলে কি রাষ্ট্র তাদের সরকারি সুবিধা দেবে না?
তিনি সতর্ক করে বলেন, এর মাধ্যমে এমন এক বিপজ্জনক নজির তৈরি হচ্ছে, যেখানে মনে হতে পারে সরকার কেবল ভোটারদের জন্যই দায়ী। এতে বিরোধী মতাবলম্বী ভোটার বা সম্প্রদায়কে হুমকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এ বিষয়ে আলজাজিরা পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের বক্তব্য জানতে চাইলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
কলকাতাভিত্তিক আইনজীবী আসিফ রেজা ভোটার তালিকায় নাম পুনর্বহালের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীদের পক্ষে লড়ছেন। তিনি বলেন, অনেক আবেদনকারী এখন বিচার প্রক্রিয়ার ওপরই আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। কারণ আবেদনগুলো ঠিকমতো মূল্যায়ন না করেই খারিজ করে দেওয়া হচ্ছে।
আসিফ রেজা আরও বলেন, শুনানির গতি খুবই ধীর। প্রতিদিন মাত্র ৫-৬টি মামলার শুনানি হয়। অথচ একেকটি জেলায় যখন ২ থেকে ৩ লাখ ভোটারের নাম কাটা গেছে, তখন সব মামলার শুনানি শেষ হতে কয়েক শতাব্দী লেগে যাবে। ততোদিনে আবেদনকারীদের বংশধরেরা হয়তো ভোটাধিকারের লড়াই চালাবে।
প্রখ্যাত জনকল্যাণ অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ এই ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমকে (এসআইআর) ‘অনির্ভরযোগ্য ও স্বৈরাচারী’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, এই প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ মানুষকে অন্যায়ভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের রেশন থেকেও বঞ্চিত করা হবে ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’ দেওয়ার মতো।
তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ একে ‘অমানবিক ও স্তম্ভিত করার মতো ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে মানুষের খাবার ও সামাজিক সুরক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। এটি কেবল মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘনই নয়, একজন নাগরিকের সাংবিধানিক রক্ষাকবচকেও কেড়ে নেওয়া।
মুর্শিদাবাদের ৩৩ বছর বয়সী আব্দুল বারী ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন। নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও কোনো যাচাই ছাড়াই তার নাম কেন কাটা গেল, তা নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ।
আব্দুল বারী প্রশ্ন করেন, ‘ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেই কি কেউ নাগরিকত্ব হারান? ভোট দিতে পারছি না বলে কি আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে?’
আলজাজিরা