গত ১৮ জুন স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে আরও একটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের অপরিশোধিত, পরিশোধিত ও অন্যান্য পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের অবাধ বিক্রির অনুমতি দেবে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগকারী শাখা, অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) গতকাল সোমবার এ সংক্রান্ত একটি অনুমোদন জারি করে।
লন্ডনভিত্তিক গণমাধ্যম আরগুস অনলাইনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির ১৪ দফার মধ্যে তেহরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ ছিল। সে অনুযায়ী, আলোচনা এগিয়ে নিতে ও চুক্তির শর্ত পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানির ওপর থেকে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করল। বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সুবিধা নিতে পারবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। বাংলাদেশ ইরান থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলকৃত গ্যাস বা এলএনজি কিনতে পারবে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় এর জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। লেবাননে ইসরাইলের হামলার জেরে ইরান হরমুজ বন্ধ করে দেয়। এ হামলা বন্ধ হলে হয়তো হরমুজ আবার খুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা ক্রেতাদের ডলারের মাধ্যমে ইরানের তেল কেনা অনুমোদন দিচ্ছেন। মালপত্র পরিবহণে ইরানের পরিষেবা এবং বিমার জন্যও মার্কিন ডলার ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হলো।
ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলে বৈশ্বিক বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ওয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের প্রতি ব্যারেল ৮০ ডলারের বেশি বিক্রি হলেও গতকাল সোমবার রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তা কমে ৭৭ দশমিক ৮৬ ডলার হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তি হওয়ার আগে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারের ১০০ ডলার কাছাকাছি ওঠানামা করছিল।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সুইজ্যারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপের মধ্যেই এ অগ্রগতির খবর পাওয়া গেল। লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত হামলার মধ্যে এ আলোচনা চলছে। ইরান বারবার লেবাননে হামলা বন্ধ করতে ইসরাইলকে চাপ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, গত রোববার সুইজারল্যান্ডে প্রথম দফা সরাসরি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। দুই মাসের অন্তর্বর্তী চুক্তি চলাকালে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে চায় দুই পক্ষ। এ লক্ষ্যে প্রথম দফা আলোচনার পর গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি জানায়।
নিষেধাজ্ঞা মওকুফের এ মেয়াদটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির অবস্থা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন করার জন্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ‘সমঝোতা স্মারক’-এ নির্ধারিত ৬০ দিনের মেয়াদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তিটি ৬০ দিনের মেয়াদের পরও চলতে পারে। আলোচনার জন্য বাড়তে পারে এর মেয়াদ। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টিও দীর্ঘায়িত হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতি হলে নির্ধারিত সময়সীমার আগেই এটি বাতিল হতে পারে।
ওএফএসির অনুমোদনে ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পণ্য বিক্রি, পরিবহণ ও খালাসের সঙ্গে সম্পর্কিত সব লেনদেনের বিশদ বিবরণ দেওয়া আছে। এটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ট্যাংকারগুলোতে ইরানি তেল পাঠানোর অনুমতি দেয়। এটি ইরানি বিক্রেতাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় না। তবে ক্রেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ মওকুফ করে।
এ অনুমোদন ইরানি তেল পরিবহণের জন্য বিভিন্ন পরিষেবা প্রদানের অনুমতি দেয়, যার মধ্যে রয়েছে ‘জাহাজ ব্যবস্থাপনা, নাবিক নিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ, পাইলটিং, নিবন্ধন, পতাকা উত্তোলন, বিমা, শ্রেণিবিন্যাস এবং উদ্ধার’। ওএফএসি লাইসেন্সটি এমনকি পরবর্তীকালে অন্যত্র পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি তেল আমদানিরও অনুমতি দেয়।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি বলছে, যুদ্ধের আগে বেশির ভাগ ইরানি অপরিশোধিত তেল চীনের স্বাধীন শোধনাগার শিল্পের এক ক্ষুদ্র গ্রাহক গোষ্ঠীর কাছে যেত। এ ছাড় কার্যকর থাকায় চীনের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সংস্থা এবং ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের ক্রেতারা ইরানি অপরিশোধিত তেল কিনতে উৎসাহিত হতে পারে।
সুইজ্যারল্যান্ডে আলোচনা : সুইজারল্যান্ডে আলোচনা চলাকালে আচানক ওয়াকআউট করতে চেয়েছিল ইরান। তবে শেষ পর্যন্ত তারা তা করেনি; আলোচনা এগিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতারের প্রতিনিধিরাও দুই পক্ষের এ সরাসরি সংলাপ চলাকালে উপস্থিত ছিলেন। পরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-উভয় দেশের প্রতিনিধিরাই আলোচনায় ‘বড় অগ্রগতি’র কথা স্বীকার করেন।
দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, সংলাপ চলাচালে ইরানকে হুমকি দিয়ে সামাজিকমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর জেরে ইরানের আলোচকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওয়াকআউট করতে চান। মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছার জন্য সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রথম দফা শান্তি আলোচনায় ‘আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি’ হয়েছে।
রয়টার্স জানায়, যদিও লেবানন এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা এখনো রয়ে গেছে। তবে দুপক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে একটি স্থায়ী চুক্তি করার রূপরেখায় রাজি হয়েছে বলে সোমবার জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। তাছাড়া, লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরাইল এবং ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ শক্তি হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই বন্ধের একটি প্রক্রিয়ার বিষয়ে দুপক্ষ একমত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতে সহায়তার জন্য একটি যোগাযোগ লাইনও চালু করেছে।
গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওই সমঝোতা স্মারকের শর্তের আলোকে সুইজারল্যান্ডে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। এই আলোচনা সোমবার প্রথম কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত চলেছে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, ‘আলোচনা খুবই ইতিবাচক এবং গঠনমূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে।’ প্রথম দফার এই আলোচনা ‘সফলভাবেই শেষ হয়েছে’ বলেও জানান তিনি। আলজাজিরা জানিয়েছে, ইরানের প্রতিনিধিরা নিজ দেশে ফিরেছেন।
আলোচনা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আমাদের ইরানের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রূপান্তর করতে নতুন অধ্যায় শুরুর জন্য বলেছেন। লেবাননে বৈরিতা শেষ করার বিষয়েও ‘অগ্রগতি হয়েছে’ বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তার দেশ তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির জন্য ছাড়, জব্দকৃত কিছু সম্পদের অবমুক্তি এবং ইরানের জন্য একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালু করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।