বাংলাদেশের উন্নয়নে দিন দিন অংশীদারত্ব বাড়ছে চীনের। গত ২৬ বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে দেশটি ছাড় করেছে ৭৩৯ কোটি ডলার বা প্রায় ৮৮ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণের পরিমাণ ৭২৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলার বা ৮৭ হাজার ১৬৩ কোটি ২ লাখ টাকা এবং অনুদান ১০ কোটি ১৩ লাখ ডলার বা ১ হাজার ২১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ ‘ফ্লো অব এক্সটারনাল রিসোর্সেস ইনটু বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মূলত ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত হিসাব ধরে তৈরি করা হয়েছে এ প্রতিবেদন।
এর আগে, ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হয়। সে সময় ২ হাজার কোটি ডলারের বিভিন্ন ঋণ সহায়তা ও বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ইআরডির এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, ওই সফরের সময় প্রায় ২৭টি প্রকল্পের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে ১০-১২টির বাস্তবায়ন শেষ হয়েছে এবং পাঁচটির কাজ এখনো চলছে। অন্যতম মেগা প্রকল্প ‘পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ’-এর বাস্তবায়ন শিগগিরই শেষ হচ্ছে। ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে চীনের ঋণ রয়েছে প্রায় ২৭৬ কোটি ডলার বা ২৫ হাজার কোটি টাকা। চলমান বাকি প্রকল্পগুলোর কাজে নেই কোনো জটিলতা।
চীনের ঋণ অনুমোদনে বড় সমস্যা দীর্ঘ সময় লাগা। সুদের হার ২-৩ শতাংশের মধ্যে থাকলেও ঋণের শর্ত সংশোধনে চাপ দেওয়া হচ্ছে
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, চীনের ঋণ অনুমোদনে দীর্ঘ সময় লাগাটা অন্যতম বড় একটি সমস্যা। তথ্য যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে তারা অনেক সময় নেয়। এতদিন সুদের হার ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে থাকলেও, বর্তমানে প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) ঋণের শর্ত সংশোধনের চাপ দেওয়া হচ্ছে। এটি মেনে নিলে সুদের হার প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাবে এবং অন্যান্য শর্তও হবে কঠিন।
তথ্যমতে, গত ২৬ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন মোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ১ হাজার ২৯ কোটি ১৮ লাখ ডলার বা ১ লাখ ২৩ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ ৯৮০ কোটি ৯৬ লাখ ডলার বা ১ লাখ ১৭ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা এবং অনুদান ৪৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার বা ৫ হাজার ৪৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে চীনের এক্সিম ব্যাংকের ৯ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা ঋণে চলছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কাজ। বিমানবন্দর থেকে ইপিজেড পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়ালসড়কের মোট ব্যয় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ চলতি মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মে মাস পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ৭০ শতাংশ। তাই প্রক্রিয়া চলছে এর মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর।
এ ছাড়া ডিপিডিসির ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের প্রায় ১১ হাজার ৯২৪ কোটি, পিজিসিবির পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক প্রকল্পে প্রায় ১৩ হাজার ৬৯৫ কোটি, রাজশাহী ওয়াসার পানি শোধনাগারে ২ হাজার ৩১৩ কোটি এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের
চারটি জাহাজ ক্রয় প্রকল্পে ২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।
ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বৈদেশিক অর্থায়নে ৭ শতাংশ অবদান নিয়ে চীনের অবস্থান পঞ্চম। এ তালিকায় সর্বোচ্চ ২৯ শতাংশ অর্থায়ন করে শীর্ষে রয়েছে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ। এরপর পর্যায়ক্রমে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২৩, জাপান ১৮ এবং রাশিয়া ১১ শতাংশ অবদান রেখেছে। চীনের পরবর্তী অবস্থানে থাকা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত অবদান ৭ শতাংশ। এ ছাড়া ভারত ২ শতাংশ এবং আইডিবি, ইফাদ ও দক্ষিণ কোরিয়া ১ শতাংশ করে অর্থায়ন করেছে।