প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে ঘিরে পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে লন্ডন-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)।
দ্বীপটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ঝুঁকছে। উভয় দেশের সামরিক বাহিনী প্রতিদ্বন্দ্বী কমান্ড ও যোগাযোগ কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক অভিযান চালাতে পারে বলেও সতর্ক করেছে প্রতিরক্ষা গবেষণা কেন্দ্রটি।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রয়টার্স জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ার বৃহত্তম বার্ষিক প্রতিরক্ষা সম্মেলনের আগে এক কৌশলগত মূল্যায়নে আইআইএসএস বলেছে, বিশ্ব একটি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল।
আইআইএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক রাষ্ট্র ও কৌশলগত স্বার্থযুক্ত দেশগুলো তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন রাষ্ট্রগুলো দূরপাল্লার প্রচলিত হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করছে; উভয় পক্ষই কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
১৫৬ পৃষ্ঠার ওই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানকে ঘিরে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বড় যুদ্ধ হতে পারে। চীন চাইবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তাইওয়ান থেকে দূরে রাখতে। আর যুক্তরাষ্ট্র চাইবে তাইওয়ানকে শক্তিশালী করে চীনের চাপ মোকাবিলা করতে সাহায্য করতে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশই বড় সামরিক অভিযান চালাতে পারে। এতে পরিস্থিতি খুব দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকিও আছে। কারণ দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো পরিষ্কার নিয়ম বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না, যা যুদ্ধকে সীমার মধ্যে রাখতে সাহায্য করবে।
অর্থাৎ, তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাত শুরু হলে তা ভয়াবহ ও পারমাণবিক যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াতে পারে।
আইআইএসএসেরর সিনিয়র ফেলো ড্যানিয়েল স্যালিসবারি বলেছেন,, সর্বশেষ ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনে পারমাণবিক বিষয়-সংক্রান্ত কোনো আলোচনা হয়নি। পারমাণবিক ক্ষেত্রে এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার সম্পর্ক ‘বেশ জটিল’।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক এই গবেষক আরও বলেন, এই মুহূর্তে আলোচনার সেই সংস্কৃতিটা নেই, তাই সেই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও অনেক কম।
রয়টার্স মন্তব্যের জন্য মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করতে পারেনি।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন বলেছেন, আইআইএসএসের প্রতিবেদনটি প্রকৃত পরিস্থিতির সঙ্গে ‘বেশ অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে মনে হচ্ছে। তাইওয়ান বিষয়টি চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং এতে কোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মাও নিং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ানের সঙ্গে ‘অত্যন্ত সতর্কতার’ সঙ্গে আচরণ করা উচিত।
তবে বেইজিং তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ নিতে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা কখনোই নাকচ করেনি। চীন এও বলেছে যে, তারা ‘শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলন’ পছন্দ করে। যদিও তাইওয়ান সরকার বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
পারমণাবিক অস্ত্রের মজুত
ফেডারেশন অফ আমেরিকান সায়েন্টিস্টস-এর অনুমান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছে এখনও চীনের তুলনায় অনেক বেশি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ার প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ হাজার ৭০০টি এবং চীনের প্রায় ৬২০টি সক্রিয় পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র আছে।
তবে মার্কিন কর্মকর্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশ্লেষকদের মতে, চীন অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে তার পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ও আধুনিক করছে।
ডিসেম্বরে প্রকাশিত পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের সংখ্যা এক হাজারে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ, বর্তমানে পিছিয়ে থাকলেও চীন দ্রুত একটি বড় পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা সম্মেলন
আগামী ২৯ থেকে ৩১ মে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম বার্ষিক প্রতিরক্ষা সম্মেলন। এবার মূল আলোচনার বিষয় হবে তাইওয়ান ইস্যু, ইরানের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সক্রিয় ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে, সেই অনিশ্চয়তা।
শাংরি-লা সংলাপ নামে এই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা প্রধান, কূটনীতিক, বিশ্লেষক ও অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ শনিবার (৩০ মে) সিঙ্গাপুর সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন বলে জানা গেছে। তবে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডং জুন এতে যোগ দেবেন কিনা, তা এখনো নিশ্চিত করেনি।