Image description

ভারতে গত কয়েক বছরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা, হামলা এবং ভয় দেখানোর রাজনীতি নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। কখনো গো-রক্ষার নামে হামলা, কখনো বুলডোজার অভিযান, কখনো আবার ধর্মীয় পরিচয় কেন্দ্র করে নিশানা করা— এমন এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানের বড় অংশ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বিগ্ন। আর বিজেপির জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে বলে মত বিভিন্ন অধিকারকর্মীর।

বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বাংলার বিভিন্ন জেলায় বিজেপির গেরুয়া বাহিনী মুসলমানদের লক্ষ্য করে হামলা, ভাঙচুর ও ভয় দেখানোর অভিযান চালিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাধারণ মুসলমান পরিবার, ছোট ব্যবসায়ী এবং দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ।

রবিবার সেরকমই একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ভারতের নাগরিক অধিকার সংগঠন Association for Protection of Civil Rights (এপিসিআর)। তাদের প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন ৪ থেকে ৭ মে-এর মধ্যে রাজ্যের অন্তত আটটি জেলায় মুসলমানদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সংগঠনের বক্তব্য, হামলাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের ভয় দেখানো এবং সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা।

রিপোর্ট অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার এবং দক্ষিণবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনায়। এ দুই জেলায় সাতটি করে হামলার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া এবং আরও কয়েকটি জেলায় মুসলমানদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও ধর্মীয় স্থানে হামলার অভিযোগ উঠেছে। মোট ৩৪টি পৃথক সহিংসতার ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেছে এপিসিআর।

সংগঠনের দাবি, এই সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে অন্তত দুজনের। নিহতদের মধ্যে একজন মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারান কোচবিহারের গোসানিমারিতে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, একাধিক এলাকায় মসজিদে হামলা চালানো হয়েছে, মুসলমানদের বাড়িতে ভাঙচুর হয়েছে এবং মাংসের দোকান লক্ষ্য করে আক্রমণ করা হয়েছে। হামলার জেরে বহু পরিবার আতঙ্কে ঘরছাড়া হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে বলেও দাবি সংগঠনটির।

এপিসিআরের বক্তব্য, মুসলমানদের জীবিকা নষ্ট করাও ছিল হামলাকারীদের অন্যতম উদ্দেশ্য। অভিযোগ, কিছু এলাকায় গবাদি পশুর হাট জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মাংস ব্যবসায়ী, হোটেল মালিক এবং আমিষ খাবারের সঙ্গে যুক্ত ছোট ব্যবসায়ীদের বিশেষভাবে নিশানা করা হয়েছে। রয়েছে বারাসাতে মুসলিম মালিকানাধীন একটি হোটেলে ভাঙচুরের অভিযোগও। নন্দিনা ও আবুতরা গ্রামের একাধিক মুসলমান পরিবারের বাড়িতে হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে।

কলকাতায়ও রেহাই মেলেনি বলে দাবি সংগঠনটির। রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাস্তার ধারে দোকান করা মুসলিম হকার এবং ছোট ব্যবসায়ীদের ভয় দেখানো হয়েছে। কিছু এলাকায় তথাকথিত ‘বুলডোজার মিছিল’ বের করা হয় বলেও অভিযোগ।

এপিসিআরের দাবি, এ ধরনের মিছিল মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই ব্যবহার করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, অন্তত ৫৪টি স্থাপনায় হামলা বা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং প্রায় ৫০ জন মুসলমান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, রাজনৈতিকভাবেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত কিছু কার্যালয় এবং নেতাদের বাড়িতেও হামলার অভিযোগ উঠেছে।

এপিসিআর জানিয়েছে, মূলধারার বহু সংবাদমাধ্যমে এ ঘটনাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। সে কারণে স্থানীয় সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী এবং আক্রান্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেই তারা তথ্য সংগ্রহ করেছে। সংগঠনের বক্তব্য, দেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রমেই যে বিদ্বেষমূলক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

যদিও বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে মুসলমানদের টার্গেট করে হামলার অভিযোগ নিয়ে এখন পর্যন্ত রাজ্য প্রশাসন বা বিজেপির পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। এপিসিআর আক্রান্ত মুসলিম পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।