বিজেপি সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেও তাদের জয় নিশ্চিত এমনটা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে যা নিশ্চিত, তা হলো ক্ষমতায় থাকা একটি ফ্যাসিবাদী দল প্রচলিত সাংবিধানিক ঐক্যমত্যের তোয়াক্কা নাও করতে পারে। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন শুধুমাত্র তৃণমূল কংগ্রেস এবং ভারতীয় জনতা পার্টির মধ্যে একটি সাধারণ লড়াই ছিল না। এই নির্বাচন এক ভিন্ন গুণগত বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে একটি রাজ্যের নির্বাচিত শাসক দলকে একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ভারত রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং বিচারবিভাগের একাংশের কার্যকলাপের সম্মিলিত চাপে এই নির্বাচন সম্ভবত জরুরি অবস্থার পর ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপমূলক নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এই হস্তক্ষেপের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’। এর মাধ্যমে তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ৬০ লাখেরও বেশি মানুষকে অনুপস্থিত বা মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ২৭ লাখ মানুষের ভাগ্য ঝুলে ছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ের ওপর। যাদের নাম নিয়ে বিচার চলছিল, তাদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশই মুসলিম এবং একটি বড় অংশ তফশিলি জাতিভুক্ত মতুয়া সম্প্রদায়ের হিন্দু। এছাড়া দরিদ্র শ্রেণির মহিলারাও এর শিকার হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন একে ভোটার তালিকা ‘শুদ্ধিকরণ’ বললেও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কোনো পরিসংখ্যানগত ভিত্তি ছাড়াই বিশেষ আচরণ করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে যেখানে মাত্র ৪ জন পর্যবেক্ষক ছিলেন, সেখানে বাংলায় নিয়োগ করা হয়েছে ৩০ জনকে। দেশের মোট পুলিশ অফিসার বদলির ৯৫ শতাংশই ঘটেছে এই একটি রাজ্যে। একে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। এর একমাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে রাজনৈতিক। এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণাকেই উল্টে দেওয়া হয়েছে। ভোটারের যোগ্যতা প্রমাণের দায়ভার ভোটারের ওপরেই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। নন্দীগ্রাম বা ভবানীপুরের মতো এলাকায় দেখা গেছে, নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কেই নিশানা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের এক বিজেপি নেতা যখন প্রকাশ্যেই এক কোটি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলেন, তখন বোঝা যায় যে নির্বাচন কমিশন মূলত বিজেপি-আরএসএসের সেই রাজনৈতিক কর্মসূচিকেই প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দিয়েছে।
প্রতিনিধিত্বমূলক আইন বা আরপিএ-তে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বলে কোনো শব্দের উল্লেখ নেই। আইনের ধারা অনুযায়ী বিশেষ সংশোধন কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রের জন্য হতে পারে, সমগ্র রাজ্যের জন্য নয়। নির্বাচন কমিশন ভোটারদের নাগরিকত্ব পরীক্ষার যে মহড়া চালিয়েছে, তার কোনো আইনি এখতিয়ার তাদের নেই। কমিশন মূলত ভোটার তালিকা রক্ষণাবেক্ষণের নামে একটি অঘোষিত এনআরসি পরিচালনা করেছে। তালিকায় নাম কাটার ক্ষেত্রে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিনির্ভর অসঙ্গতির মতো এক ধোঁয়াশাপূর্ণ অজুহাত ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র কোনো আধিকারিকের মর্জিতে তার নাম বাতিল করা হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, যখন লাখ লাখ নাম কাটা হচ্ছিল, তখন ঠিক ভোটের আগে কোনো জনতাত্ত্বিক তথ্য ছাড়াই নিঃশব্দে ৭ লাখ নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায়।
ট্রাইব্যুনালে আপিল করার প্রক্রিয়াটি ছিল স্রেফ একটি প্রহসন। কয়েক দিনের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের শুনানি করা অসম্ভব ছিল। ফলে ২৭ লাখেরো বেশি মানুষ কোনো শুনানি ছাড়াই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেছেন। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন ভোটের আগে তৃণমূলের প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মী ও জনপ্রতিনিধিকে নিবর্তনমূলক গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়। কলকাতা হাইকোর্ট এই নির্দেশের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও আদর্শ আচরণবিধির সময়ে কমিশনের ওপর কোনো বিচারবিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ কার্যত থাকে না। বিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে ইডি-সিবিআই এবং আয়কর দপ্তরের অতিসক্রিয়তাকেও ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
এই নির্বাচনে প্রায় ২ দশমিক ৪ লাখ কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছিল, যা ২০২১ সালের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি। জওয়ানদের এই বিশাল সমাবেশ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে টহল দেওয়ার ঘটনা কার্যত পশ্চিমবঙ্গকে এক সামরিক আবহে পরিণত করেছিল। এমনকি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী আরও ৬০ দিন রাজ্যে অবস্থান করবে। এই ঘোষণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ভোটের পর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অধীনে চলে যায়। এটি আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা। বিজেপি এই নির্বাচনে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুটিকে তাদের প্রচারের মূল ভিত্তি করেছিল। ২০২৫ সালের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে ‘জনতাত্ত্বিক মিশনের’ কথা বলেছিলেন, তার প্রয়োগ এই নির্বাচনে দেখা গেছে। যখন কোনো শাসক দল রাষ্ট্রের সমস্ত যন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বৈষম্যের রাজনীতিকে প্রশাসনিক রূপ দেয়, তখন তাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ‘অনুপ্রবেশকারী’ নামক এক কাল্পনিক শত্রুর ভয় দেখিয়ে আসলে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি বাঙালিকে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের দায়ের নিচে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও এই ত্রুটিপূর্ণ সংশোধন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করেছে। দেশের শীর্ষ আদালত যখন সাংবিধানিক প্রতিবাদকে নিছক ‘হৈচৈ’ বলে উপেক্ষা করে, তখন বোঝা যায় বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট কতটা গভীর।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন হয়তো সারা দেশের জন্য একটি মহড়া। পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপি যে পরিকাঠামো (ভোটের তালিকা নিয়ে কারচুপি, স্থায়ী আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতি, বিরোধী নেতাদের দমনে কেন্দ্রীয় সংস্থার ব্যবহার) তৈরি করছে, তা আসলে নির্বাচিত সরকারকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার একটি বৃহৎ চক্রান্ত। এই লড়াই শুধুমাত্র একটি ভোটের লড়াই নয়। এটি একটি রাজ্যের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, বাংলার মানুষের এই প্রতিরোধ নিকট ভবিষ্যতে শেষ হওয়ার নয়।