Image description

সারা দেশের হামের উদ্বেগজনক প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে টিকার সংকটের বিষয়টি সামনে আসে। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও টিকা বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।

 

সমালোচকদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়-পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে সময়মত টিকা সংগ্রহ করা যায়নি। ফলে টিকা না পাওয়ায় শত শত শিশু হামের শিকার হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে।

 

তবে সাবেক বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনেনি। গোপন টেন্ডারের চেয়ে আন্তর্জাতিকভাকবে ওপেন টেন্ডার করতে গিয়ে কিছুটা সময় বিলম্ব হয়েছে।

 

শুক্রবার (১ মে) সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ফেসবুকে নিজের আইডিতে এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।

 

পোস্টে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, “‘অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন করা হয়েছে’ শিরোনামে আজ Science-এর উল্লেখ করে Daily Star যে সংবাদটি প্রচারিত হয়েছে, সেটার দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। প্রথমেই বলা দরকার যে Science-এ আমার বক্তব্য খণ্ডিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে, যদিও আমি লিখিতভাবে খণ্ডিত অংশ প্রকাশের ফলে অস্পষ্টতার কারণে ভুল-বোঝাবুঝির সম্ভাবনার কথা বলেছিলাম।”

 

‘প্রথমেই স্পষ্ট করা দরকার যে ইপিআইয়ের নিয়মিত কর্মসূচির হামের টিকা সম্পূর্ণ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ক্রয় করা হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার যে সরকার ইপিআইয়ের ৪টি টিকার সম্পূর্ণ অর্থ এবং অন্য টিকাগুলোর ক্ষেত্রে GAVI এর পাশাপাশি আংশিক মূল্য (Cofinancing) পরিশোধ করে থাকে। শুধু নতুন টিকা শুরু করা এবং ক্যাম্পেইনের টিকা GAVI সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে। অর্থাৎ হামের টিকাসহ ৪টি টিকা সরকারের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে হয় বিধায় এসব ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়ের নিয়মাবলি অনুসরণ করাই বাঞ্চনীয় ও যৌক্তিক।’

 

‘অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ক্রয় করার ক্ষেত্রে Public Procurement Act of 2006 অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা আছে এবং তদনুযায়ী এ ধরনের ক্রয়ের ক্ষেত্রে Direct Procurement Method (DTM) অথবা Open Tender Method (OTM) অনুসরণ করার নিয়ম আছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ইপিআইয়ের জন্য টিকা ক্রয়ের অনুমতির অনুরোধ উপস্থাপনের প্রেক্ষিতে “অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি” Public Procurement Act of 2006 এর (৬৮(১) উল্লেখ করে রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন বা জনস্বার্থে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত Direct Procurement Method (DTM) টিকা ক্রয়ের অনুমোদন দেয়।’

 

সাবেক এই বিশেষ সহকারী আরও বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থ বছরে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া শুরুর আগে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির পূর্ববর্তী বছরের অনুমোদনের সময়কালীন পর্যবেক্ষণ এবং আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসরণের উল্লেখ থাকায় অনুরোধ প্রেরণের আগে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। যেহেতু EPI একটি নিয়মিত জাতীয় কর্মসূচি—এটি প্রতি বছর জরুরি ধারা ব্যবহার করে চালানো ঠিক নয় বিবেচনায় টিকার আন্তর্জাতিক বাজার অনানুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করে রাষ্ট্রীয় অর্থ সংস্থানের প্রাথমিক সম্ভাবনা দেখা যায়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন যাবত চলমান একটি কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় টিকা ক্রয়ে পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে সরকারের নিজস্ব সামর্থ্য অর্জন করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।’

 

‘এমতাবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে টিকা ক্রয়ের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে টিকা ক্রয়ের নিজস্ব সামর্থ্য অর্জন প্রয়োজনীয় বলেই সরকারের কাছে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু যেহেতু অন্তবর্তীকালীন সরকারের হাতে যথেষ্ট সময় ছিল না, সে কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্তত সরকারি বরাদ্দের অর্ধেক অর্থাৎ ৪১৯ কোটি টাকা Direct Procurement Method (DTM)-এ ক্রয়ের সুপারিশ অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় “অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি”র নিকট টিকা ক্রয়ের চলমান প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ Direct Procurement Method (DTM) এর মাধ্যমে ক্রয়ের অনুমতির জন্য অনুরোধ করে এবং কমিটি সে অনুযায়ী অনুমতিও দান করে। এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য যে সরকারের রাজস্বখাতের বরাদ্দকৃত টাকার বাইরেও Asian Development Bank (ADB) থেকে কোভিড টিকার জন্য ঋণের অর্থ Repurpose করার অনুমতির মাধ্যমে প্রাপ্ত ৬০৯ কোটি টাকার ক্ষেত্রেও Direct Procurement Method (DTM) এর অনুসরন করে UNICEF এর মাধ্যমে ক্রয়ের জন্য ক্রয়কারীকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমতি দান করা হয়।’

 

স্বচ্ছ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘অতএব অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকা ক্রয় পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি এবং কোনো পরিবর্তিত পদ্ধতিতে ইপিআইয়ের কোনো টিকা ক্রয় করা হয়নি। সরকারের টিকা ক্রয়প্রক্রিয়া পরিবর্তন বা বন্ধ করা সম্পর্কে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়। তবে আমাদের উদ্বেগ ছিল—এই বিশেষ নিয়ম দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বা পক্ষপাতের ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে EPI-এর টিকা কেনা নিয়মিত ক্রয়ের জন্য উপযুক্ত, আইনসিদ্ধ ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে করা উচিত। আবারেও স্পষ্ট উল্লেখ করতে চাই যে EPI-এর কোনো টিকাই এখন পর্যন্ত ওপেন টেন্ডার পদ্ধতিতে (OTM) কেনা হয়নি। শুধু প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে রাষ্ট্রীয় অর্থের স্বচ্ছ ও যথাযথ ব্যবহারের ন্যায্য পদ্ধতি হিসেবে Open Tender Method (OTM) অথবা Long Term Agreement (LTA) পদ্ধতি অনুসরণ করাই এ ধরনের নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়ের জন্য পরবর্তীতে উপযুক্ত হবে বলে অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে অভ্যন্তরীণ পরামর্শ আকারে উল্লেখ করা হয়েছে, কোন টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরুও করা হয়নি।’

 

অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘অন্তবর্তীকালীন সরকারের শিশুদের টিকা সংগ্রহে দৃঢ় অঙ্গীকারের নিদর্শন হচ্ছে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে টিকা ক্রয়ের জন্য পূর্বতন অর্থ বছরের তুলনায় প্রায় ১০০০ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ করেছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে গত মার্চ ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত GAVI এর সাথে Decision Letter এর অধীনেই বর্তমানে চলমান হাম ক্যাম্পেইনের টিকা দেশে এসেছে।’

 

অন্তবর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরকালে দুটো নতুন টিকার ক্যাম্পেইন সফলভাবে পরিচালনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।