Image description

অনেক বছর পর সরাসরি বৈঠকে বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ২১ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস বৈঠক। কিন্তু কোনো সমাধান আসেনি। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ‘ব্যর্থ’ বৈঠক করেই দেশে ফিরে যায় দুই দেশের প্রতিনিধিদল। বৈঠকে কোনো চুক্তি না হওয়ায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় বাড়ছে। ফের যুদ্ধ শুরু হবে কিনা, তা নিয়ে বিশ্ব জুড়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপযুক্ত সময়ে ইরানকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। আবার ইরানের স্পিকারও জানিয়েছেন, ৪০ দিনের যুদ্ধে তাদের অর্জন তারা ধরে রাখবে। বিশ্বনেতারা চুক্তি না হলেও কোনোভাবেই যাতে যুদ্ধবিরতি না ভাঙে, সেই আহ্বান জানিয়েছেন দুই দেশের প্রতি।

একে অন্যকে দায়ী করছে দুই দেশ

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র তার আপত্তির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, কিন্তু মার্কিন শর্ত মানতে রাজি হয়নি ইরান। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, এর ফলে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে ইরান যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আলোচনা। ভ্যান্স বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার ‘রেড লাইন’ বা যেসব শর্তে দেশটি ছাড় দিতে রাজি নয়, তা স্পষ্ট করেছে, কিন্তু ইরান ‘আমাদের শর্তে রাজি হয়নি’।” তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এমন কোনো অবস্থায় পৌঁছাতে পারিনি, যেখানে ইরানিরা আমাদের শর্তগুলো মেনে নেবে।’

ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা ২১ ঘণ্টা ধরে এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু খারাপ খবর হলো, আমরা এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারিনি।’ ব্রিফিংয়ে ভ্যান্সের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও হোয়াইট হাউজের উপদেষ্টা জারেদ কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ উপস্থিত ছিলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং ফিল্ড মার্শাল মুনিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এ আলোচনায় নমনীয় মনোভাব এবং সদিচ্ছা নিয়ে এসেছিল। কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। আর আমি মনে করি, এই ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি ক্ষতিকর।’ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বন্ধ করাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন ভ্যান্স।

যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত চাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত :ইরান

সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এ আলোচনাকে ‘নিবিড়’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু চলমান আলোচনার সাফল্য ‘প্রতিপক্ষের আন্তরিকতা এবং সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে’ বলেও মন্তব্য করেছেন বাঘাই। ওয়াশিংটনকে অতিরিক্ত চাওয়া ও বেআইনি অনুরোধ করা থেকে বিরত থাকতে এবং ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ মেনে নিতেও আহ্বান জানিয়েছেন মুখপাত্র। তিনি জানান, যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইরানে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান।

যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয়

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই এ আলোচনায় অংশ নিয়েছিল ‘যুদ্ধে তারা জয়ী হয়েছে’ এমন দাবি নিয়ে। তাই এত অল্প সময়ে চুক্তিতে পৌঁছানো স্বাভাবিক বিচারেই কঠিন ছিল। আর এখন মনে হচ্ছে, এটি আসলে অসম্ভবই ছিল। গত বুধবার যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তা শুরু হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের ধ্বংসাত্মক হুমকির মধ্য দিয়ে, যেখানে তিনি ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখন তাহলে কী হবে? যুদ্ধবিরতি কি বহাল থাকবে? এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া পোস্টে বলেন, ওয়াশিংটন যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। উপযুক্ত সময়ে ইরানকে শেষ করে দেবে মার্কিন বাহিনী।

বিবিসির সাংবাদিক জো ইনউড বলছেন, পারস্য উপসাগরে কয়েক দিন আগে মোতায়েন করা দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অন্য কোনো পথের কথা ভাবছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ সরাসরি আলোচনা ছিল ঐতিহাসিক, কিন্তু এটি হয়তো কূটনীতির একটি ব্যর্থতা হিসেবেই ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিজ ডুসেট বলছেন, এই আলোচনা সেশন কতক্ষণ ধরে চলেছে, সেটি তাত্পর্যপূর্ণ এবং আশ্চর্যজনক। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে যে কোনো চুক্তি হয়নি, এটা আশ্চর্যজনক নয়। তিনি বিশ্লেষণ করছেন যে, আমেরিকানরা এই ধারণা নিয়ে পাকিস্তানে এসেছিল যে, যুদ্ধে ইরান এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, তাদের সঙ্গে দ্রুত আপোস করা সম্ভব হবে। লিজ ডুসেট মনে করেন, ইরানেরও নিজস্ব সীমা রয়েছে, অর্থাত্ যেসব বিষয়ে তারা ছাড় দিতে পারবে না বা দেবে না। তারা শক্তিশালী অবস্থানে আছে—এমন বিশ্বাস নিয়ে ইসলামাবাদে আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সামরিক সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও দেশটি এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম এবং ইচ্ছুক। লিজ ডুসেটের মতে, ট্রাম্প এখন এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হবেন। হয় পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে পারেন তিনি, অথবা আলোচনায় ফিরে এসে নতুন করে পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করা।

ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে আবার হরমুজ অবরুদ্ধ করে দিতে পারে ইরান। পালটা আমেরিকাও হরমুজ অবরোধ করার হুমকি দিয়েছে। এর ফলে দুই সপ্তাহের যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তা আদৌ টিকবে না বলেই মনে করছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, শান্তি আলোচনা যে পুরোপুরি ভেস্তে গেছে, সে কথা এখনই বলা যাবে না। এই ধরনের আলোচনা সাধারণত একটি বৈঠকে ফলপ্রসূ হয় না। অতীতে বারাক ওবামার প্রশাসনের সঙ্গে যে ইরানের সমঝোতা হয়েছিল, তার জন্য সময় লেগেছিল প্রায় বছর দুয়েক। যদিও তখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির যে ফারাক রয়েছে, সে কথাও বলছেন অনেকে। এরই মধ্যে ইরানের স্পিকার বলেছেন, ‘আমরা এক মুহূর্তের জন্যও থামব না, এই ৪০ দিনের যুদ্ধে যা অর্জন করেছি, তা ধরে রাখতে ও শক্ত করতে আমরা কাজ চালিয়ে যাব।’ এদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, লেবাননের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য অনুমোদন দিলেও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান এখনো শেষ হয়নি। ‘আমরা এখনো তাদের বিরুদ্ধে লড়ছি’ উল্লেখ করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এখনো আরো অনেক কিছু করার আছে।’ ইসরাইল এমন একসময়ে এ বিবৃতি দিয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা পাকিস্তানে একটি শান্তি আলোচনার বৈঠকে ছিলেন।

যুদ্ধবিরতি মেনে চলা আহ্বান

অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে এবং শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। পেনি ওং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদ আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়া শেষ হওয়াটা হতাশাজনক। তিনি বলেন, বর্তমান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা। ওং সতর্ক করে বলেন, সংঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে মানবিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে আরো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এক বিবৃতিতে উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। ইসহাক দার বিবৃতিতে বলেন, (যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান) পক্ষগুলোর জন্য যুদ্ধবিরতির প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা অপরিহার্য।