গত এক সপ্তাহের সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই স্বল্প সময়ে মোট ১৩টি উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। এসব উদ্যোগে ক্যাম্পাসজুড়ে ইতিবাচক সাড়া পড়েছে এবং বিভিন্ন মহল থেকে প্রশংসা পাচ্ছেন ডাকসু নেতারা।
ডাকসু সূত্র জানায়, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেই কার্যক্রমগুলো পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব উদ্যোগ চলমান রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।
নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার: নারী শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ডাকসু। এর মধ্যে অন্যতম হলো নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আধুনিক জিমনেশিয়াম নির্মাণ কার্যক্রম, যা শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করবে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কবি সুফিয়া কামাল হলে আত্মরক্ষার কৌশল, শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যসম্মত ও হাইজেনিক খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
ক্যাম্পাসে নিরাপদ চলাচল ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন: শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন বাস রুটে নতুন ট্রিপ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে রাতের সময় যাতায়াত সহজ ও নিরাপদ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে উন্নত আলোকসজ্জা ও ঝাড়বাতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দীর্ঘদিনের আলোর স্বল্পতা নিরসনে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে, যা পাঠ ও গবেষণার পরিবেশ উন্নত করবে।
দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার সুযোগ: শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে ডাকসুর উদ্যোগে ২০০ জন শিক্ষার্থীকে মোটরসাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল যানবাহন ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা আরও সচেতন হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে মাস্টার্স ও ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ বিষয়ক একটি সেমিনার আয়োজন করা হয়। এতে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
গবেষণা, বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য সচেতনতা: গবেষণা ও সৃজনশীল কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে আয়োজন করা হচ্ছে ‘ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ কার্নিভাল’। আয়োজকদের মতে, এই উদ্যোগ বিজ্ঞানমনস্কতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে উৎসাহিত করবে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিগগিরই একটি ‘সায়েন্টিফিক হেলথ সেমিনার’ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে, যেখানে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন।
মানবিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ: মানবিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে শীতে কষ্ট পাওয়া পথের বিড়ালদের জন্য ডাকসুর উদ্যোগে শেল্টার বক্স বিতরণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণিকল্যাণ ও মানবিক চেতনা জাগ্রত করেছে।
সাংস্কৃতিক ও প্রতিবাদী চেতনার ধারাবাহিকতায় সীমান্তে ফেলানি হত্যার ১৫ বছর পূর্তিতে আধিপত্যবাদবিরোধী কবিতা ও গানের আসরের আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গেছে।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও ডাকসুর অঙ্গীকার: ডাকসু নেতারা জানান, নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের সমস্যা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “আমরা প্রতিশ্রুতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি কাজ করবো শিক্ষার্থীদের জন্য। কেন্দ্রীয় মসজিদের স্থলে আন্তর্জাতিক সহায়তায় একটি আধুনিক মাল্টিপারপাস ইসলামিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে নারীদের জন্য অর্ধেক জায়গা থাকবে। নামাজের পাশাপাশি জ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগও থাকবে।”সাদিক কায়েম বলেন আমাদের বন্ধুপ্রতিম যারা আছেন তারা নানাভাবে আমাদের সমালোচনা করছেন, কাজ করতে গিয়ে আমরা সেগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করছি। আমরা আশা রাখছি তাদের সমালোচনা অব্যাহত থাকবে; এবং আমরা মানুষ হিসেবে যে ভুল গুলো হয় সেগুলো শোধরাতে পারবো।
ডাকসুর এই দ্রুত ও সক্রিয় ভূমিকার প্রশংসা করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরাও। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব বলেন, “ডাকসুর কার্যক্রমগুলো চোখে পড়ার মতো। ক্যাম্পাসের নানা সমস্যা নিয়ে তারা কাজ করছে—আশা করি সামনে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনাবাসিক শিক্ষার্থী তামান্না রহমান বলেন, “সন্ধ্যার পর বাস ট্রিপ চালু করা আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। ডাকসুর উদ্যোগে সেটি বাস্তবায়িত হয়েছে।”
এদিকে কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসা শিক্ষার্থীরাও আলোকসজ্জা ও ঝাড়বাতির ব্যবস্থায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।