রাজধানী ঢাকায় ফুটপাত দখল এখন আর শুধু নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার উদাহরণ নয়, এটি পরিণত হয়েছে ছিনতাই ও অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। ফুটপাত ও সড়ক দখল করে রেখেছে হকার। সড়ক দখল করে ফেলেছে লাখ লাখ ব্যাটারি রিকশা। পক্ষান্তরে দোকান ও অবৈধ স্থাপনার কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। আর এই যানজটকে ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে ছিনতাইকারী চক্র। সম্প্রতি ছিনতাইকারীর আক্রমণে পথচারির জখম ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
ভুক্তভোগিদের মতে, সড়কের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে রাজধানীতে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ব্যাটারি রিকশা এবং ইজিবাইক। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকাগুলোতে দিনের বড় একটি সময় যানবাহন প্রায় স্থবির থাকে। ঠিক তখনই মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারী, পথচারী সেজে থাকা অপরাধী ও সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজধানীর ফার্মগেট, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, মিরপুর-১০, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ি, গুলিস্তান ও সদরঘাট এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাতায়াতকারীরা। এ তালিকায় পরের অবস্থানে আছে মতিঝিল, ধানমন্ডি, গুলশান রমনা, রামপুরা, হাতিরঝিল, হাজারীবাগ ও লালবাগ থানা এলাকা।
গত রোববার বিকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ি-গুলিস্তান ফ্লাইওভাবে ভয়াবহ যানজটে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা গাড়িগুলো আটকা পড়ে গুলিস্তান থেকে পেছনের দিকে রায়েরবাগ পর্যন্ত। শীতের মৌসুম হওয়ায় বেশিরভাগ গাড়ির জানালা ছিল খোলা। এই সুযোগে শনিরআখড়া ও কাজলা স্পটে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এক প্রাইভেট কারের চালকের চিৎকারে লোকাল বাস থেকে যাত্রীরা নেমে ছিনতাইকারীদেরকে ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যায়। ভুক্তভোগী এক চালক জানান, রাত ১০টার পর ফ্লাইভোরে যানজন ক্রমেই বাড়তে থাকে। তখন ছিনতাইকারীরা ধারালো দেশিয় ছুরি গলায় ধরে একটার পর একটা ছিনতাই করে। ভুক্তভোগিদের অভিযোগ পুলিশ মহাসড়কের উপরেই ডিউটি করে, তবে যানজটে আড়ালে পুলিশ ছিনতাইয়ের ঘটনা খুব একটা বুঝতে পারে না।
হামিদুল নামে এক ভুক্তভোগি জানান, তিনি একদিন সন্ধ্যার পর এক বাইকারের পেছনে বসে মতিঝিলের দিকে আসছিলেন, সড়কে যানজট থাকা অবস্থায় তার ফোনে একটা কল আসে। তিনি পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে কথা বলছিলেন। এই সুযোগে একজন ছিনতাইকারী ছোঁ মেরে তার আইফোন সিক্সটিন মোবাইল সেটটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়ের এক সিএনজি স্টেশনের এক কর্মচারি জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত তেজগাঁও সাত রাস্তা মোড়ে যানজটে একাধারা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। অথচ ঘটনাস্থলের আশেপাশে পুলিশ যানজটমুক্ত করার জন্য ব্যস্ত থাকে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পরসিংখ্যান অনুযায়ী রাজধানীতে সক্রিয় ৯ শতাধিক ছিনতাইকারী। তালিকাভুক্ত এসব ছিনতাইকারী ধরা পড়ার পর মামলার অভিযোগের দুর্বলতায় সহজেই জামিনে বেরিয়ে আসে। ফের আগের পেশায় নামে তারা। তবে ভুক্তভোগিদের মতে, পুলিশের পরিসংখ্যান থানার অভিযোগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী করা হয়। বাস্তবে এই সংখ্যা কমপক্ষে দ্বিগুণ বা তারও বেশি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বর্তমানে ছিনতাইয়ের বেশ কিছু ঘটনা ভাইরাল হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে রাস্তায় মোবাইল ফোনে ব্যস্ত এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে থামে একটি অটোরিকশা। মুহূর্তের মধ্যে চাপাতি হাতে নেমে আসে দুজন। তারা ওই ব্যক্তিকে ঘিরে ধরে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। মাত্র ১১ সেকেন্ডে শেষ হয় পুরো ঘটনা। দুপুরের দিকে বসিলা ফিউচার হাউজিংয়ের ৪০ ফুট সড়কে এ ছিনতাইয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সম্প্রতি ধানমন্ডির রাসেল স্কয়ারের সিগন্যালে প্রকাশ্যে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শনিরআখড়ায় যানজটে একটি ছিনতাইয়ের ঘটনাও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। গত কয়েক মাসে ছিনতাইয়ের বিভিন্ন ঘটনা ও চাপাতি হাতে দলবদ্ধ মহড়ার বিভিন্ন চিত্র জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যদিও কোনো ঘটনা ঘটলে পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে; কিন্তু ছিনতাই ঠেকানো যাচ্ছে না কিছুতেই। উল্টো নিত্যনতুন কৌশলে আরও তৎপরতা বাড়িয়েছে ছিনতাইকারী চক্র। সন্ধ্যা হলেই রাজধানীর কয়েকটি এলাকা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
এদিকে ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করে হটস্পটগুলোও নির্ধারণ করেছে ডিএমপি। এমনিতে রাজধানীতে ৩ শতাধিক ছিনতাই স্পট থাকলেও হটস্পট রয়েছে ৪৫টি। গত বছরের শেষের দিকে ডিএমপি সদর দফতরের তালিকা অনুযায়ীÑ৯ শতাধিক ছিনতাইকারীর মধ্যে শাহবাগে সক্রিয় ৫৯ জন, ধানমন্ডিতে ২১ জন, নিউমার্কেটে ৯ জন, হাজারীবাগে ৮৮ জন, রমনা মডেল থানা এলাকায় সক্রিয় ১৮ জন, কলাবাগানে ৩৩ জন, সূত্রাপুরে ৯ জন, বংশালে ২৮ জন, চকবাজারে ৬ জন, কামরাঙ্গীরচরে ৫ জন, লালবাগে ৭ জন, কোতোয়ালি থানা এলাকায় ৩৭ জন, কদমতলীতে ৩২ জন, শ্যামপুর মডেল থানা এলাকায় ১৯ জন, অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা ও রাজধানীতে প্রবেশের অন্যতম পথ যাত্রাবাড়ীতে ৩২ জন, গেন্ডারিয়ায় ২২ জন, ওয়ারীতে ১৭ জন, ডেমরায় সক্রিয় ৩ জন।
ছিনতাইয়ের ঘটনায় ও মামলার পরিসংখ্যানে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকায় সক্রিয় ৬০ জন ছিনতাইকারী। এর মধ্যে তেজগাঁও থানা এলাকায় ১৪ জন, শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় ১৯ জন, মোহাম্মদপুরে ৫২ জন, আদাবরে ১১ জন, হাতিরঝিলে সক্রিয় ৪৮ জন ছিনতাইকারী। মিরপুর মডেল থানা এলাকায় সক্রিয় ২৬ জন, পল্লবীতে ১১ জন, শাহআলী থানা এলাকায় ২২ জন, রূপনগরে ১৫ জন, ভাসানটেকে ১৫ জন এবং দারুসসালামে ৬ জন। ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা ঘিরে সক্রিয় ৭৭ ছিনতাইকারী। উত্তরখানে সক্রিয় ২জন , দক্ষিণখানে ৫ জন, উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় ১৬ জন এবং উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় সক্রিয় ১৪৫ জন। এদের প্রায় সবাই টঙ্গির বিভিন্ন বস্তির বাসিন্দা এবং একাধিক ছিনতাই ও ডাকাতি মামলার আসামি।
ডিএমপির তালিকা অনুযায়ী, তেজগাঁও থানা এলাকার ছিনতাইয়ের হটস্পটের মধ্যে অন্যতম সোনারগাঁও ক্রসিংয়ের সামনের এলাকা। এখানে চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের মধ্যে অন্যতম মো. শরীফ। আরেকজন মো. সাব্বির। মোহাম্মদপুর থানা এলাকার তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের মধ্যে রয়েছে মো. আরমান ও মো. গনি, চাঁদ, মো. বাবলা ওরফে শাকিল, মাসুদ পারভেজ, রাফসান হোসেন আকাশ, ইমতিয়াজ, আহম্মেদ হোসেন, মো. তাজ উদ্দিন, মো. রাজু, মোহাম্মদপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন, চাঁদ উদ্যান এলাকার মো. পারভেজ, হাজারীবাগের বৌবাজারের বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন দুলু, রায়ের বাজারের রাসেল হাওলাদার, কাটাসুরের মো. শাকিল, আগারগাঁওয়ের মো. আলামিন।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী কারওয়ান বাজারে সক্রিয় ছিনতাইকারীদের মধ্যে আছে সালমান শরীফ, মো. জমি আহম্মেদ, ইমন ইসলাম মাসুদ। তেজগাঁও রেলস্টেশনের হাফিজ উদ্দিন ও মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের আশপাশের এলাকার মো. সোহেল, সাইফুল ইসলাম মিশু ও সজীব খান। যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় Ñআসলাম মিয়া, পিচ্চি জনি, নাটাই সোহেল, রাসেল, মিলন, শাহীন, সাইফুল ইসলাম, আতিকুর রহমান সুমন, রুবেল ওরফে সোলেমান, সাইফুল, উজ্জ্বল, আব্দুর রউফ, মো. সুজন, মো. সাগর, সজল, জুয়েল, কৌশিক সরদার, শাহীন আলম ও মহিউদ্দিন। মিরপুরের শাহআলী থানা এলাকায় ছিনতাইকারীদের মধ্যে অন্যতম তানভীর, পল্লবীর নয়ন ও শুভ, সাভারের সুজন শেখ ও ফারুক হোসেন। গাবতলী এলাকার সজীব, জাফর, লিমন; পল্লবী এলাকায় ফয়সাল, হাবিবুর রহমান, আক্তার, শান্ত, নাদিম। গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, বাবুবাজার ব্রিজ, নয়াবাজার, তাঁতীবাজার এলাকায় সক্রিয় শাওন, কেরানীগঞ্জের ফারুক প্রমুখ।
ভুক্তভোগিদের অভিযোগ, নগরীতে পুলিশের উপস্থিতি কোথাও কোথাও থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক এলাকায় যানজট নিরসন, ফুটপাত দখল উচ্ছেদ বা ছিনতাই প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ পুলিশ ইচ্ছা করলেও সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একাধিক ভুক্তভোগী বলেছেন, ছিনতাইয়ের পর থানায় গিয়ে অভিযোগ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্রুত কোনো ফল পাওয়া যায় না। ছিনতাই নিয়ে পুলিশের যে তালিকা সেটাও কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত টহল ও অভিযান চলছে। তবে জনবল সংকট, অতিরিক্ত যানবাহন ও নগরীর চাপ পরিস্থিতি সামাল দেওয়াকে কঠিন করে তুলছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমেই নগরীর যানজট কমাতে ব্যাটারি রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে। যেখানে যানজট দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং জনচলাচল বিশৃঙ্খল, সেখানে অপরাধ স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। ফুটপাত দখল আসলে ছিনতাইয়ের অবকাঠামো তৈরি করে দিচ্ছে। তারা বলছেন, ফুটপাত উদ্ধার অভিযান শুধু কয়েকদিনের জন্য করলে হবে না। স্থায়ী নজরদারি ও বিকল্প ব্যবস্থাপনা ছাড়া সমস্যার সমাধান অসম্ভব।