Image description

দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল)। অভিজ্ঞ কিংবা জাতীয় দলের স্বপ্ন দেখা তরুণ ক্রিকেটার—এই লিগকেই নিজেদের প্রমাণের বড় মঞ্চে হিসেবে দেখেন সবাই। পাশাপাশি প্রায় দুই শতাধিক ক্রিকেটারের জন্য এই লিগই বাৎসরিক আয়ের প্রধান উৎস। তবে চলতি বছরে এই লিগ আয়োজন নিয়ে এখনও শঙ্কা কাটেনি।

বিসিবি নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, ক্লাবগুলোর বয়কট এবং সংগঠনগত অচলাবস্থার কারণে লিগ শুরুর কোনো স্পষ্ট বার্তাও নেই। ফলে, নিজেদের রুটিরুজি নিয়ে বড় সংকটে শতাধিক ক্রিকেটার। যদিও এর পেছনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকেই (বিসিবি) দায়ী করছেন বিভিন্ন ক্লাবসহ একটি পক্ষ। অন্যদিকে বিসিবির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি পক্ষের ‘নগ্ন’ পরিকল্পনায় মাঠে গড়াচ্ছে না এই লিগ। 

ঘটনা যাই হোক না কেন, খেসারৎ কিন্তু ক্রিকেটারদের দিতে হচ্ছে। তারা বলছেন, এভাবে আর চলা যাচ্ছে না। আর নীরব ভূমিকায় সিসিডিএম-ও।ডিপিএলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, বিপুলসংখ্যক ক্রিকেটারের মিলনমেলা এটি। দেশের অন্য কোনো ঘরোয়া টুর্নামেন্টে এত বেশি ক্রিকেটারের অংশগ্রহণ দেখা যায় না। জাতীয় দলের কিংবা জাতীয় দলের রাডারে থাকা অনেক ক্রিকেটারের উত্থানের পেছনে অন্যতম অবদান এই লিগেরই।

তানজিদ হাসান তামিম, পারভেজ হোসেন ইমন, তাওহীদ হৃদয়, কিংবা রাকিবুল হাসানের মতো ক্রিকেটাররা অনূর্ধ্ব-১৯ দলে আলো ছড়ালেও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলার মধ্য দিয়েই তাদের প্রকৃত বিকাশ ঘটেছে। তবে চরম সত্য হলো, বিপিএল কিংবা জাতীয় লিগে খেলার সুযোগ জোটে না সবার ভাগ্যে। তাই বহু ক্রিকেটারের জন্য অলিখিতভাবেই ঢাকা প্রিমিয়ার লিগই একমাত্র বড় মঞ্চ। সে কারণে অনেক ক্রিকেটারের কাছে এই টুর্নামেন্টই জীবিকার একমাত্র ভরসা।

ক্লাবগুলোর বয়কট এবং সংগঠনগত অচলাবস্থার কারণে লিগ শুরুর কোনো স্পষ্ট বার্তাও নেই। ফলে, নিজেদের রুটিরুজি নিয়ে বড় সংকটে শতাধিক ক্রিকেটার। যদিও এর পেছনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকেই (বিসিবি) দায়ী করছেন বিভিন্ন ক্লাবসহ একটি পক্ষ। অন্যদিকে বিসিবির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি পক্ষের ‘নগ্ন’ পরিকল্পনায় মাঠে গড়াচ্ছে না এই লিগ। 

সাধারণত বছরের এই সময় অর্থাৎ মার্চ থেকে এপ্রিল, কখনো-বা মে মাস পর্যন্ত গড়ায় এই লিগ। এর আগে, দলবদলের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের ক্লাব বেছে নেন ক্রিকেটাররা। পুরো মৌসুম খেলার পর ক্লাবগুলো থেকে চুক্তি অনুযায়ী পারিশ্রমিকও পেয়ে থাকেন। অনেকবার পুরো পেমেন্ট না পেলেও গড় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পেমেন্ট টুর্নামেন্ট চলাকালেই পেয়ে যান ক্রিকেটাররা, যা দিয়ে বছরজুড়ে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করেন। 

সহজ হিসেব, এই লিগই ক্রিকেটারদের কাছে যেন ‘আয়ের একমাত্র সমাধান’। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসেও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন নিয়ে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা নেই। যদিও নিয়ম অনুসারে, গেল ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি দলবদল হওয়ার কথা ছিল। আর মার্চের শুরুতেই অর্থাৎ রোজার মধ্যেই লিগ মাঠে গড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই ঘটেনি।

এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ক্রিকেটাররা। জাতীয় দলের রাডারে ২৫ থেকে ৩০ জন ক্রিকেটার আছেন, বাৎসরিক চুক্তি অনুযায়ী দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্তা সংস্থাটি থেকে বেতন পান তারা। জাতীয় দলের ম্যাচ ফি, বোনাস ও অন্যান্য আয় মিলিয়ে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। 

এ ছাড়া জাতীয় ক্রিকেট লিগ এবং বিপিএল মিলিয়ে মোটামুটি ভালো পারিশ্রমিক পান আরও ৩০ থেকে ৪০ জন। কিন্তু আরও অন্তত দেড় শতাধিক ক্রিকেটার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের দিকেই তাকিয়ে থাকেন। ফলে লিগ না হলে কার্যত আয়বিহীন হয়ে পড়বেন, এই আশঙ্কায় এখন চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন তারা।

এদিকে লিগ আয়োজক সংস্থা ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিসও (সিসিডিএম) কার্যত নিশ্চুপ। কারণ, সিদ্ধান্তের ক্ষমতা তাদের হাতে নেই বললেই চলে। মূল সমস্যার সূত্রপাত বিসিবির সাম্প্রতিক নির্বাচন ঘিরে। নির্বাচনে অস্বচ্ছতা, সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া এবং সরকারি হস্তক্ষেপ এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ ক্লাব। 

এর ফলে ভোট দেননি ক্লাব প্রতিনিধিরা এবং পরিচালনা পর্ষদেও জায়গা পাননি। ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রায় সব স্তরেই ওই বয়কটের প্রভাব পড়ে। এরইমধ্যে তৃতীয় বিভাগ লিগ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। নিজেদের অর্থায়নে কোনোভাবে বিসিবি দ্বিতীয় ও প্রথম বিভাগ লিগ সীমিত দল নিয়ে আয়োজন করলেও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে তারা। কারণ, রাজধানীর অধিকাংশ ক্লাবই বর্তমান বোর্ডের অধীনে লিগ খেলতে রাজি নয়।

জানা গেছে, ১২ দলের মধ্যে সর্বোচ্চ দুই বা তিনটি ক্লাব ছাড়া বাকিরা সবাই বর্তমান বোর্ডের অধীনে খেলতে অনাগ্রহী। সিসিডিএম ক্লাবগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করলেও কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি। সহজ কর বললে, মোহামেডান, আবাহনীসহ বড় ক্লাবগুলোও নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি।

এই সংকটের প্রেক্ষাপটে ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিয়েটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) কী পদক্ষেপ নেয়, সেটি দেখারও অপেক্ষা তরুণ ক্রিকেটাররা। যদিও লিগ হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন।

তার ভাষ্যমতে, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেট যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে, এখানে শুধু প্লেয়াররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকদিন ধরেই ক্লাব এবং বিসিবির মধ্যে যে সমস্যাটা লেগে আছে, এই সমস্যায় একমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত ক্রিকেটাররা। কারণ, মাঠে খেলা নেই। এই সময় সবার কিন্তু প্রিমিয়ার লিগে ব্যস্ত থাকার কথা। বা অন্য যে লিগগুলো, সেইগুলোয় ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু এখন একমাত্র আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছাড়া আমাদের কোন ঘরোয়া খেলা নেই।’

এদিকে মাঝে ‘অদম্য টুর্নামেন্ট’ নামে তিন দলের একটি সংক্ষিপ্ত টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিল বিসিবি। সেখানে প্রায় ৪৫ জন ক্রিকেটার কিছু পারিশ্রমিক পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেটি প্রিমিয়ার লিগে খেলে পাওয়া সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় অনেক কম। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ওই টুর্নামেন্টে যারা সুযোগ পাননি, তারাই আসলে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের মূল অংশ। 

সেই শতাধিক ক্রিকেটারের ভাগ্যে কোনো আয়ই জোটেনি। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, যে লিগ থেকে শতাধিক ক্রিকেটারের সারা বছরের সংসার চলে, সেই ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন নিয়ে আদৌ কি বিসিবির কোনো আন্তরিকতা আছে? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে বোর্ডের পক্ষ থেকে তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

নিজেদের মধ্যে নিজেদের খেলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মিঠুন বললেন, ‘কোনও প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট হচ্ছে না। নিজেদের মধ্যে খেলা আর কতো? প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাই, আমাদের তো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক টুর্নামেন্ট খেলতে হবে। আপনারা জানেন, প্লেয়ারদের কাছে ঢাকা লিগের গুরুত্বপূর্ণটা কতটুকু।’ অন্যদিকে দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে প্রতিনিয়তই নানান প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন এক সময়ের জাতীয় দলের এই নিয়মিত মুখ। তবে কোনো কিছুরই সদুত্তর দিতে পারছেন না তিনি। 

তার ভাষ্যমতে, ‘এখন ন্যাশনাল টিমের প্লেয়ার থেকে শুরু করে থার্ড ডিভিশনের প্লেয়াররা পর্যন্ত সবার একটাই প্রশ্ন, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের কি অবস্থা। ঢাকা লিগ না হলে প্লেয়াররা কি করবে, এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমার পক্ষ থেকে যতটুকু চেষ্টা করার ততটুকু করে যাচ্ছি। যে যে জায়গায় যোগাযোগ করার দরকার, যাদের সঙ্গে কথা বললে এটা কাজ হতে পারে, আমার দিক থেকে আমার কাজগুলো করে যাচ্ছি, বাকিটা আল্লার ইচ্ছা।’

এদিকে লিগ আয়োজনে ব্যর্থতা, ‘অবৈধ নির্বাচনের’ মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখাসহ নানান নেতিবাচক শিরোনামের কারণে বিসিবির ব্যর্থতাকে লজ্জা হিসেবেই দেখছেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের পরিচালক ও ডাইরেক্টর ইন-চার্জ অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। এ সময়ে জমানো সঞ্চয় ভেঙে খরচ করায় দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্তা সংস্থাটির সমালোচনাও করেন তিনি।

তার ভাষ্য, ‘যারা এখন ক্রিকেট বোর্ডে আছে, তাদের আসলে লজ্জা নেই। তাদের সঙ্গে কথা বলতে, তাদের সম্পর্কে কথা বলতে লজ্জা হওয়া উচিত। তারা অবগত, তারা কি অবস্থায় এসেছে। এখানে তারা কি করছে আপনারা জানেন কি না, জানি না। ক্রিকেট বোর্ডের কোনো ইনকাম নেই। কিন্তু এখন এফডিআর ভেঙে খাচ্ছে তারা, সব কাজকর্ম চালাচ্ছে। আমি মনে করি, তাদের যদি লজ্জা থাকে, ক্রিকেট বোর্ড থেকে পদত্যাগ করে, দেশে ক্রিকেটটাকে যেন আমরা বাঁচাতে পারি, সেক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা রাখা উচিত।’

অন্যদিকে লিগ আয়োজন নিয়ে বিসিবির সিসিডিএম বিভাগের সূত্র বলছে, লিগ আয়োজনে তারা প্রস্তুত। কিন্তু পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে নয়। আর প্রথম বিভাগ বা দ্বিতীয় বিভাগের মতো করে প্রিমিয়ার লিগ আয়োজিত হতে পারে না। একইসঙ্গে এ নিয়ে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের যথাযথ দিকনির্দেশনা না পাওয়ার অভিযোগও করছে সেই সূত্র। 

সব মিলিয়ে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট এখন অনিশ্চয়তার মুখে। আর সেই অনিশ্চয়তার বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করছেন, দেশের শতাধিক পেশাদার ক্রিকেটার। তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, দিনশেষে ভালো কিছুরই প্রত্যাশায় দেশের ক্রিকেটাঙ্গন।