চট্টগ্রামে পুলিশি পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলির ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে ‘বড় সাজ্জাদ’ বাহিনীর তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযানে থানা থেকে লুট হওয়া একটি রিভলভার ও একটি পিস্তলসহ মোট তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার কর হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাত সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ও অতিরিক্ত দায়িত্ব (প্রশাসন ও অর্থ) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। এর আগে, সোমবার দিবাগত রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমন অন্যতম, যিনি ২০০০ সালের চাঞ্চল্যকর আট খুনের (এইট মার্ডার) মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। গ্রেপ্তার হওয়া অন্য দুজন হলেন মনির ও সায়েম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলিবর্ষণ করেন একদল অস্ত্রধারী।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর দাবি, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করে আসছেন। প্রথমে ১০ কোটি টাকা, পরে ৫ কোটি টাকা দাবি করেন সাজ্জাদ। চাঁদা না দেওয়ায় গত ২ জানুয়ারিও তাঁর বাসায় গুলি করা হয়েছিল। এরপরও চাঁদা না পেয়ে ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা দেন সাজ্জাদ। এতে লেখা হয়, ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’।
ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চারজন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর বাসার কাছে আসেন। এরপর বাসাটি লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকেন। সিসিটিভি বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানায়, চার সন্ত্রাসীর মধ্যে একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন সাব মেশিনগান (এসএমজি), একজন চায়নিজ রাইফেল এবং অন্যজন শটগান থেকে গুলি ছোড়েন।
মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, গ্রেপ্তার তিনজনই ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলির ঘটনায় জড়িত ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘চকবাজার থানা পুলিশ প্রথমে রিমনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিদেশি রিভলভার ও ৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়, যা নগরের পাহাড়তলী থানা থেকে লুণ্ঠিত হয়েছিল। রিমনের তথ্যের সূত্র ধরে পাঁচলাইশ থানায় অভিযান চালিয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকা থেকে মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
‘পরে মনিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া একটি ব্রাজিলিয়ান টরাস ৯ এমএম পিস্তল ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সায়েমকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর সায়েমের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী খুলশী থানা এলাকা থেকে একটি এসএমজি, দুটি ম্যাগাজিন ও ৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এগুলো সায়েম পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে ক্রয় করেছে বলে স্বীকার করেছে’, বলেন ওয়াহিদুল হক।
পুলিশের তথ্যমতে, গ্রেপ্তাররা দুবাইয়ে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের নির্দেশে নগরীতে খুনের পরিকল্পনা, চাঁদাবাজি এবং বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। রিমনকে সাজ্জাদের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ। রিমনের কাছ থেকে একটি ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে দেখা যায় নতুন সদস্যদের পবিত্র কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে সাজ্জাদ বাহিনীর প্রতি অনুগত থাকার শপথ করানো হচ্ছে। এই শপথের ভিডিও সাজ্জাদের কাছে পাঠিয়ে সদস্যপদ নিশ্চিত করা হতো।
শপথের ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, কোরআনের ওপর হাত রেখে বললাম, ‘আমার জীবন আজ থেকে সাজ্জাদ ভাইয়ের হাতে তুলে দিলাম। সাজ্জাদ ভাইয়ের জন্য যদি জীবন দিতে হয়, দিব। মরব কিন্তু কখনো সাজ্জাদ ভাইয়ের সঙ্গে বেঈমানি করব না...।’
ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘এই শপথের ভিডিওটি দুবাইয়ে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের কাছে পাঠিয়ে সদস্যপদ নিশ্চিত করা হতো এবং এই রিক্রুটের ক্ষেত্রে একজন পুরোনো বিশ্বস্ত সদস্যকে জামিনদার থাকতে হতো। নিরাপত্তার স্বার্থে শপথকারীর ছবি ব্লার করে রাখা হয়।’
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, তিনজনের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত এই অস্ত্রগুলো সম্প্রতি নগরের চন্দনপুরা এলাকার ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্যালিস্টিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি আরও নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় হত্যা, ডাকাতি ও অস্ত্র আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তার এবং বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।’
এছাড়াও মাহে রমজানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ অভিযানে গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ টিম কোতোয়ালী থানায় অভিযান পরিচালনা করে। এতে পেশাদার ছিনতাইকারী মারুফ হোসেন তুষার, বাবু এবং মেহেদী হাসানকে আটক করে। এর মধ্যে সিএমপির বিভিন্ন থানায় বাবুর বিরুদ্ধে ছয়টি, মারুফের বিরুদ্ধে দুটি এবং মেহেদীর বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে।