Image description

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে এবার সামনে এসেছে নতুন দুটি উদ্বেগজনক বিষয়, ইরানে ‘কালো বৃষ্টি’ ও লেবাননে সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন নিয়ে নতুন প্রশ্ন।

ইরানে ‘কালো বৃষ্টি’ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, ইরানের কিছু এলাকায় তেল স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর আকাশ থেকে পড়া ‘কালো বৃষ্টি’ মানব স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে তেলমিশ্রিত কালো বৃষ্টির একাধিক প্রতিবেদন তারা পেয়েছে। হামলার পর তেহরানের একটি তেল শোধনাগারে আগুন লাগার ঘটনায় সোমবার আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।

তেহরানের রাস্তার পাশে ‘আগুনের নদী’। ছবি: রয়টার্স

জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডব্লিউএইচওর মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার বলেন, ‘কালো বৃষ্টি ও এর সঙ্গে আসা অম্লীয় বৃষ্টি (অ্যাসিড রেইন) নিঃসন্দেহে জনসাধারণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষেত্রে।’

তিনি জানান, তেল সংরক্ষণাগার ও পরিশোধনাগারে হামলার ফলে বাতাসে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন, সালফার অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন যৌগ ছড়িয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব ধোঁয়া বা কণার সংস্পর্শে এলে মাথাব্যথা, চোখ ও ত্বকে জ্বালা, এমনকি শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকলে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ইরান সরকার নাগরিকদের ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে, ডব্লিউএইচওও বিষয়টি সমর্থন করেছে।

 

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের ইয়োহমোর শহরের আবাসিক এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে।

সংস্থাটির লেবানন গবেষক রামজি কাইস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সাদা ফসফরাসের অগ্নিসংযোগকারী প্রভাব মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে বা এমন গুরুতর দগ্ধের সৃষ্টি করতে পারে, যা সারাজীবনের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, তারা ইয়োহমোরের আবাসিক এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহারের প্রমাণ হিসেবে আটটি ছবি যাচাই করেছে। এসব ছবিতে আগুন লাগার ঘটনায় সিভিল ডিফেন্স কর্মীদের কাজ করতে দেখা যায়।

তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লেবাননে সাদা ফসফরাসযুক্ত গোলা ব্যবহারের বিষয়ে তারা অবগত নয় এবং এ অভিযোগ তারা নিশ্চিত করতে পারেনি।

সাদা ফসফরাস মূলত একটি অগ্নিসংযোগকারী রাসায়নিক, যা সামরিক ক্ষেত্রে ধোঁয়ার আড়াল তৈরি, লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা বা আলোকসজ্জার জন্য ব্যবহার করা হয়।

তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আকাশ থেকে বিস্ফোরিত (এয়ারবার্স্ট) সাদা ফসফরাস ব্যবহারকে বেআইনি মনে করা হয়।

এই অস্ত্রটি কনভেনশন অন সার্টেন কনভেনশনাল ওয়েপনসের তৃতীয় প্রোটোকল অনুযায়ী অগ্নিসংযোগকারী অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত। ওই প্রোটোকল অনুযায়ী বেসামরিক মানুষের মধ্যে অবস্থিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে এমন অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ। যদিও ইসরায়েল এই প্রোটোকলে সই করেনি।

যুদ্ধের পরিবেশগত প্রভাব

পর্যবেক্ষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধ শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ছে।

ইরানে তেল স্থাপনায় হামলার ফলে সৃষ্ট দূষণ বা লেবাননে সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগ, দুটিই দেখিয়ে দিচ্ছে যে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সাধারণ মানুষের জীবনেও এসব সংঘাতের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।