বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দ্বাদশ আসরের পর পর্দা নেমেছে সপ্তাহ খানেক আগে। ছয় দল ও ৩৪ ম্যাচের দীর্ঘ লড়াই শেষে নানা নাটকীয়তা, রোমাঞ্চ আর বিতর্কে পরিপূর্ণ ছিল এবারের আসর। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে ৬১ রানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। সব মিলিয়ে এবারের বিপিএলে ছিল যেমন সাফল্যের গল্প, তেমন কিছু অপূর্ণতাও।
গতবারের আসরে ব্যাটিং-বান্ধব উইকেটে রানবন্যা দেখা গেলেও এবার কোনো দলই ইনিংসে দুইশ’ অতিক্রম করতে পারেনি। তবুও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে নজর কেড়েছেন অনেক ক্রিকেটার, বিশেষ করে দেশি খেলোয়াড়রা। বিদেশি তারকাদের ছাপিয়ে দেশি ক্রিকেটাররাই এবারের লিগে ব্যাট-বল দুই দিকেই উজ্জ্বল ছিলেন। এমনকি সেরা খেলোয়াড়, সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক, সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি, সেরা ফিল্ডার ও সেরা উদীয়মান ক্রিকেটার সবগুলোর পুরস্কারই গেছে স্থানীয়দের হাতে। তাই এবারের বিপিএল যে ভবিষ্যতের জাতীয় দলের জন্য সম্ভাবনাময় এক ঝাঁক ক্রিকেটার তৈরি করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এই আসরে সবচেয়ে আলো ছড়ানো কয়েকজন ক্রিকেটার এখন জাতীয় দলের দুয়ারে কড়া নাড়ছেন। তাদের মধ্যে আছেন অভিজ্ঞতা-সমৃদ্ধ পেসার থেকে শুরু করে নবীন ব্যাটিং প্রতিভা যারা বিপিএলের পারফরম্যান্স দিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সময় খুব বেশি দূরে নয়।
মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ: ইনজুরি কাটিয়ে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন
এনসিএলের টি-টোয়েন্টি চলাকালীন ইনজুরিতে পড়েছিলেন মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ। সেই চোটে তার ঘরোয়া মৌসুম প্রায় শেষ হয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু ফিরে এসে যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা জাতীয় দল নির্বাচকদের ভাবনায় জায়গা করে দিয়েছে তাকে। লাল বলের এনসিএলে রংপুর বিভাগের হয়ে চার ম্যাচে ২৯ উইকেট নিয়ে হয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ও টুর্নামেন্টসেরা।
সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে বিপিএলে চট্টগ্রাম রয়্যালসের হয়ে ৮ ম্যাচে ৯ উইকেট শিকার করেন মুগ্ধ। ইকোনমি ৮.০৫ এবং স্ট্রাইক রেট ১৫.২২ যা টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের জন্য যথেষ্ট প্রভাবশালী। তার সেরা বোলিং ফিগার ৫ রানে ২ উইকেট। ফিটনেস ও গতি দুটিই ফিরে পাওয়া মুগ্ধ স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন, জাতীয় দলের পেস ইউনিটে জায়গা পাওয়ার মতো সক্ষমতা এখনই তার আছে।
হাসান ইসাখিল: মাত্র তিন ম্যাচেই বিপিএলের ঝড়
আফগানিস্তানের তারকা ক্রিকেটার মোহাম্মদ নবীর ছেলে হাসান ইসাখিল এবারের বিপিএলের অন্যতম চমক। নোয়াখালী এক্সপ্রেসের হয়ে প্রথমবার খেলতে এসে টুর্নামেন্টের অর্ধেকটাই কাটিয়েছেন বেঞ্চে। কিন্তু সুযোগ পেয়েই নিজের জাত চিনিয়েছেন। মাত্র তিন ম্যাচে আসরের সেরা দশ রানসংগ্রাহকের একজন হয়ে ওঠা তার প্রতিভার পরিচয়।
অভিষেক ম্যাচে ৬০ বলে ৯২ রান করে বিপিএলের নজর কাড়েন তিনি। সেই ম্যাচে বাবা–ছেলের একসঙ্গে মাঠে নামাও সৃষ্টি করে অনন্য মুহূর্ত। দ্বিতীয় ম্যাচে ২৫ রান করার পর রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচে খেলেন ৭২ বলে ১০৬ রানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। তার ইনিংসে ৪টি চার থাকলেও ছক্কা ছিল ১১টি যা তাকে ক্রিস গেইল, তামিম ইকবাল ও জনসন চার্লসের পর চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে এক ইনিংসে ১১ বা তার বেশি ছক্কা হাঁকানোর কৃতিত্ব এনে দেয়।
তিন ম্যাচে ১১২ গড় ও ১৪৭ স্ট্রাইক রেটে ২২৪ রান করে ইসাখিল যেন ঘোষণা দিয়েই রাখলেন বাবার সঙ্গে জাতীয় দলে একসঙ্গে খেলার স্বপ্ন বাস্তব হতে খুব দেরি নেই।
আব্দুল গাফফার সাকলাইন: নিলামের বিস্ময় থেকে পারফরম্যান্সের নায়ক
নিলামে ১৪ লাখ টাকার ভিত্তিমূল্যের বিপরীতে ৪৪ লাখ টাকায় দলে নেওয়া হয় সাকলাইনকে যা প্রথমে অনেককে অবাক করেছিল। কিন্তু মাঠে নেমে সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন পারফরম্যান্স দিয়ে। রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের হয়ে ৯ ম্যাচে মাত্র ৬.০২ ইকোনমিতে ৯ উইকেট শিকার করেন তিনি। টি-টোয়েন্টিতে এত কম ইকোনমি রেট ধরে রাখা সহজ কাজ নয়।
তার সেরা বোলিং ২৪ রানে ৪ উইকেট। শুধু বলেই নয়, ব্যাট হাতে লোয়ার অর্ডারে ১৮ গড় ও ১৫৮.৮২ স্ট্রাইক রেটে ৫৪ রান করেছেন। সামান্য পরিচর্যা পেলে সাকলাইন জাতীয় দলে পেস-অলরাউন্ডারের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করতে পারেন এমন প্রত্যাশা এখনই তৈরি হয়েছে।
অ্যাডাম রসিংটন: ইনজুরি না হলে গল্পটা আরও বড় হতো
চট্টগ্রাম রয়্যালসের ওপেনার অ্যাডাম রসিংটন বিপিএলে যোগ দিয়েছিলেন কিছুটা দেরিতে। তবুও ব্যাট হাতে ছিলেন দারুণ ছন্দে। ৬ ম্যাচে ৩টি হাফ-সেঞ্চুরিতে করেন ২৫৮ রান, গড় ৬৫ স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৪০। টানা তিন ফিফটি হাঁকিয়ে শীর্ষ রানসংগ্রাহকদের তালিকায়ও এগিয়ে ছিলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আঙুলের ইনজুরিতে মাঝপথে ছিটকে পড়েন। না হলে চট্টগ্রামের শিরোপা দৌড় ভিন্নরকম হতে পারতো। গত মৌসুমে ঢাকার হয়ে ব্যর্থ হলেও এবার নিজের প্রকৃত সামর্থ্যই দেখালেন তিনি। ইংল্যান্ড দলের স্কোয়াডে ফেরার দরজাও এ পারফরম্যান্সে কিছুটা হলেও খুলে গেল।
রিপন মন্ডল: ভবিষ্যতের পেস সেনসেশন
বিপিএল ২০২৬ এর সেরা উদীয়মান ক্রিকেটার নির্বাচিত হয়েছেন রিপন মন্ডল। প্রথম দুই ম্যাচে সুযোগ না পেলেও একাদশে ঢুকেই রাজশাহীর অন্যতম ভরসায় পরিণত হন তিনি। ৮ ম্যাচে ১৭ উইকেট যা এই আসরে দেশি বোলারদের মধ্যে অন্যতম সেরা সাফল্য। ইকোনমি ছিল ৮.৫৩।
ডেথ ওভারে ইয়র্কারের নিখুঁত প্রয়োগ, মধ্য ওভারে ব্রেক থ্রু এনে দেয়া এবং চাপের সময় ঠাণ্ডা মাথায় বোলিং সব মিলিয়ে তিনি এই মৌসুমে রাজশাহীর ‘এক্স–ফ্যাক্টর’ ছিলেন। রংপুরের বিপক্ষে সুপার ওভারে দলকে জেতানোর ম্যাচসেরা পারফরম্যান্সও এসেছে তার হাত ধরে।
এর আগে রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপে বাংলাদেশ ‘এ’ দলে হয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী ছিলেন রিপন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার আনুষ্ঠানিক অভিষেক না হলেও হাংঝুর এশিয়ান গেমসে দেশের হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলেছেন। খুব শিগগিরই জাতীয় দলের হয়ে দেখা যেতে পারে তাকে এ নিয়ে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।