ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আর মাত্র ১১ দিন। ভোটের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, সারা দেশে ততই বাড়ছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারের উত্তাপ। বাড়ছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও। গত ২২ জানুয়ারি প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলেও তাদের আচরণবিধি লঙ্ঘন চলছে তফসিল ঘোষণার পর থেকেই। নতুন নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী সব ধরনের প্রচারপত্র সাদা-কালো রঙে সীমাবদ্ধতা থাকার কথা থাকলেও তা উপেক্ষা করে রঙিন ব্যানার-পোস্টার ও লিফলেটে ছেয়ে যাচ্ছে শহর থেকে গ্রাম। সরকারি স্থাপনা, বিদ্যুতের খুঁটি, এমনকি ধর্মীয় উপাসনালয়ও বাদ পড়ছে না। আইন ভাঙার এই প্রকাশ্য প্রতিযোগিতার মাঝেই প্রশ্ন উঠছেÑ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কী আদৌ আচরণবিধি কার্যকরে কঠোর ভূমিকা রাখতে পারছে? মাঠপর্যায়ে প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান রয়েছে কিনা বা প্রার্থীদের থেকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতে সহযোগিতামূলক ব্যবহার পাচ্ছে কি-না? এসব প্রশ্নের তালিকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হচ্ছেÑ আগের নির্বাচনের ইতিহাসের তুলনায় এবার সংঘর্ষ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা কম ঘটছে।
প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনে ইসির কড়া নির্দেশনা রয়েছে। যদি আচরণবিধি প্রতিপালনে প্রার্থীদের সহযোগিতা না পায় তবে রিটার্নিং অফিসার শাস্তি বা জরিমানার ব্যবস্থা করতে পারেন। ইসির তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৭৬টি নির্বাচনী এলাকায় আচরণবিধি ভাঙার ঘটনা ঘটেছে ১৯২টি। এসব ঘটনায় ১১৯টি মামলা করা হয়েছে এবং মোট জরিমানা করা হয়েছে ১২ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। তবে এই শাস্তি অনিয়মের তুলনায় যথেষ্ট কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অনিয়মের সংখ্যা আরো বেশি। কিন্তু সব ঘটনায় সমানভাবে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না, ফলে অনেক প্রার্থীই শাস্তির ভয় না পেয়ে নিয়ম ভাঙছেন।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ব্যানার-ফেস্টুনে শুধু সাদা-কালো রঙ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১২ ও ১৩ আসনসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, প্রার্থীদের রঙিন ব্যানার ও ফেস্টুন ঝুলছে বিদ্যুতের খুঁটি, দেয়াল, মেট্রোরেলের পিলার ও সরকারি ভবনের গেইটে। কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর বাঁশের তোরণ তৈরি করে দলীয় প্রতীক ও প্রার্থীর ছবি টাঙানো হয়েছে, যা সরাসরি আচরণবিধির লঙ্ঘন। প্রার্থীদের কেউ কেউ স্বীকার করছেন, পোস্টার ছাড়া নির্বাচনী প্রচার চালানো কঠিন। আবার অনেকেই দায় চাপাচ্ছেন প্রতিপক্ষের ওপরÑ এক পক্ষ লাগালে অন্য পক্ষও বাধ্য হয়ে নামছে একই পথে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালা, ২০২৫-এর ১৫(খ) ধারায় ধর্মীয় উপাসনালয়ে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচার স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। অথচ বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ, মন্দির ও উপাসনালয়কেন্দ্রিক প্রচারের অভিযোগ উঠছে। কখনো ধর্মীয় জমায়েতের আড়ালে ভোটের আহ্বান, কখনো লিফলেট বিতরণÑ সব মিলিয়ে ভোটের নিরপেক্ষ পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ধর্ম ও রাজনীতির এই মিশ্রণ নির্বাচনের মাঠকে আরো সংবেদনশীল করে তুলছে, যা সহিংসতা ও বিভাজনের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রার্থীদের প্রচারণা শুরুর পর দেশজুড়ে তোলপাড় করেছে শেরপুর-৩ আসনে বিএনপি-জামায়াতের দিনভর সংঘর্ষ। নির্বাচনী পরিবেশের অবনতির একটি বড় উদাহরণ শেরপুরের ঝিনাইগাতীর ঘটনা। সেখানে নির্বাচনী প্রচারকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর নির্বাচন কমিশন ইউএনও ও সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে প্রত্যাহার করে। ইসি সচিব জানিয়েছেন, জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বিশ্লেষকদের প্রশ্নÑ এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা কি সব ক্ষেত্রেই নেয়া হচ্ছে?
ভোটের জন্য প্রস্তুত করা দেশের মোট ভোটকেন্দ্রের প্রায় অর্ধেকই এবার গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইসি ও পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের জন্য এবার মোট ৪২ হাজার ৭৬৬টি ভোটকেন্দ্র ও দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৬টি কেন্দ্র সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ, যা মোট কেন্দ্রের প্রায় ৪১ শতাংশ। আবার নিরাপত্তা বিশ্লেষণে প্রায় ২৫ হাজার কেন্দ্রকে (৫৯ শতাংশ) নিরাপত্তা-সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে ভোটের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, শঙ্কাও তত গভীর হচ্ছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র, অতীতে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার নজির রয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বেশি। ভোটের মাঠে এত সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র এবারের নির্বাচনকে আরো চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে। অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা, চলমান রাজনৈতিক উত্তাপ, প্রচার পর্বে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ এবং ভোটের দিনের শেষ ভাগে সহিংসতার আশঙ্কাÑ সব মিলিয়ে ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে। এই নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা-বিষয়ক সমন্বয় সেলের প্রধান ইসি মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খলার কোনো সুযোগ দেয়া হবে না, পরিস্থিতি বুঝে কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ভোটের দিন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা বা ব্যালট ছিনতাইয়ের সুযোগ দেয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার ভাষায়, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য, আর সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো হবে না।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে মুন্সীগঞ্জ ও চট্টগ্রাম মহানগরীর অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। ঢাকা বিভাগের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র সবচেয়ে বেশি, মুন্সীগঞ্জ জেলায় ২৭২টি। এরপর রয়েছে কিশোরগঞ্জে ২৪৩টি, নরসিংদীতে ২৩৭টি, মাদারীপুরে ২২৪টি ও গোপালগঞ্জে ১৯০টি। আর ঢাকার বাইরে অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যায় শীর্ষে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৩১২টি। এ ছাড়া সিলেট মহানগরে ৯৫টি, রাজশাহী মহানগরে ৮৭টি, খুলনা মহানগরে ৭৯টি এবং রংপুর মহানগরে ৪৭টি কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
সারা দেশে ভোটের মাঠের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে এবার ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রায় ৫০ সদস্যের একটি সমন্বয় সেল কাজ করছে, যেখানে ইসি, পুলিশ, র্যাব, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা যুক্ত। তারা একযোগে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করছেন। সমন্বয় সেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে দুজন এবং সাধারণ কেন্দ্রে একজন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি মোবাইল টহল, স্ট্রাইকিং ফোর্স, কন্ট্রোল রুম, বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও সিসিটিভির মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু থাকবে। ভোটের আগের দিন, ভোটের দিন এবং ভোট-পরবর্তী এই তিন ধাপে আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে পোস্টারের ব্যবহার ঠেকাতে ইসি সারা দেশের প্রিন্টিং প্রেসগুলোকে পোস্টার না ছাপানোর নির্দেশ দিয়েছে। এ জন্য সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। ইসির উদ্দেশ্য প্রচার সামগ্রী তৈরির উৎসেই লাগাম টানা। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় আগের মজুত পোস্টার ও গোপন মুদ্রণের মাধ্যমে নিয়ম ভাঙা চলছে। ফলে কাগজে-কলমে কঠোরতা থাকলেও মাঠে তার প্রভাব সীমিত।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের এসব ঘটনা সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই পরিস্থিতির মূল কারণ পেশিশক্তির রাজনীতি। তার ভাষায়, যেখানে ক্ষমতা প্রদর্শনই মুখ্য হয়ে ওঠে, সেখানে আইন মানার প্রবণতা কমে যায়। নির্বাচন কমিশনের শিথিলতাও এই অনিয়মকে উৎসাহিত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী আচরণবিধি শুধু নিয়মের বই নয়, এটি গণতন্ত্রের ন্যূনতম শালীনতার পরীক্ষা। ভোটের আগে যারা নিয়ম মানছেন না, তারা নির্বাচিত হলে কতটা আইনের শাসন নিশ্চিত করবেনÑ এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ভোটারদের মনে। নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে শুধু নির্দেশনা নয়, প্রয়োজন সমান ও দৃশ্যমান প্রয়োগ। অন্যথায় রঙিন ব্যানার-পোস্টারের নিচেই চাপা পড়ে যাবে ভোটের আস্থা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আমি বলব না শতভাগ আচরণবিধি মানা হচ্ছে। তবে অনিয়ম চোখে পড়লেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার পরিবেশ ভালো।