স্প্যানিশ সুপার কাপে বার্সেলোনার কাছে হারের পর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়-কোচ দ্বন্দ্বের কিছু ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দেখা যায় মাঠ ছাড়তে সতীর্থদের ইশারা করছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। পাশে দাঁড়িয়ে শিরোপা অনুষ্ঠানে থাকতে অনুনয় করছেন রিয়াল মাদ্রিদের কোচ জাবি আলোনসো। কিন্তু এমবাপে অনড়।
অনেকের চোখে এটি ছিল ক্রীড়াসুলভ আচরণের ঘাটতি, যা জাবি আলোনসোর চরিত্রের সঙ্গে মানানসই নয়। আবার কেউ কেউ দেখেছেন ভিন্ন বার্তা, রিয়াল দলে কোচ নন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন খেলোয়াড়রাই।
ফাইনালে বার্সার সঙ্গে লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি, ভাগ্য নির্ধারণ করেছে একটি ডিফ্লেকশন।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলে রিয়াল মাদ্রিদের বোর্ড বৈঠকে আলোচ্যসূচি ছিল জাবি আলোনসোর বিদায়। ক্লাবের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে’ চুক্তি শেষ হয়েছে।
বোর্ডের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যাগুলো দেওয়া হয়, সেগুলো ছিল অস্পষ্ট। রিয়াল বলেছে, লেভারকুজেনে যে ফুটবল তাকে সফল করেছিল, তা রিয়ালে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। দলের শারীরিক প্রস্তুতি আদর্শ ছিল না।
ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পিএসজির কাছে ৪-০ গোলে হার, লা লিগায় আতলেতিকোর বিপক্ষে ৫–২ গোলের পরাজয়ও সামনে আনা হয়।
তবু বাস্তবতা ভিন্ন কথাও বলে। চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল রয়েছে সেরা আটে। কোপা দেল রের পরের রাউন্ড নিশ্চিত। লা লিগায় মৌসুমের অর্ধেক পথে বার্সেলোনার থেকে মাত্র চার পয়েন্ট পিছিয়ে তারা—এর মধ্যে অক্টোবরের এল ক্লাসিকোতে বার্সাকেই হারিয়েছে।
এখন এমন সম্পর্ক ছিন্নের ঘটনা প্রমাণ করে, ক্লাব সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ কখনোই পুরোপুরি বিশ্বাস রাখেননি তার কোচের ওপর।
আলোনসো ছিলেন প্রস্তাবিত নাম, পছন্দের নয়। লেভারকুজেনেও শুরুতে সবাই তাকে মেনে নেয়নি। তবে ফল এলে দল তার পাশে দাঁড়ায়। মাদ্রিদে তা হয়নি। শুরু থেকেই আলোনসো ছিলেন একা।
রিয়াল মাদ্রিদ দিয়ে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করা ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। ব্যক্তিগত তারকাখচিত সংস্কৃতিকে আধুনিক দলগত প্রেসিং ফুটবলে রূপান্তর করা সহজ নয়। সাধারণত কোচের ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে শুরুতে। কিন্তু রিয়াল শুরু থেকেই সেই কর্তৃত্বে ফাটল ধরায়।
আলোনসো চেয়েছিলেন ক্লাব বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব নিতে। দীর্ঘ মৌসুম শেষে খেলোয়াড়রা তখন ছুটি নিয়ে ভাবছিলেন, কেউ কেউ জানতেন—পরের মৌসুমে তারা থাকছেন না। এ নিয়েও আলোচনা করতে দেওয়া হয়নি।
নতুন সাইনিংরাও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোকে মিডিয়ার একাংশ ‘নতুন লামিনে ইয়ামাল’ হিসেবে তুলে ধরলেও মাঠে তার প্রভাব ছিল নগণ্য।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ফর্মহীনতা আলোনসোর বিদায়ের পথ আরও দৃঢ় করেছে। কোচকে দোষারোপ, এল ক্লাসিকোতে বদলির প্রতিবাদ, পরে সবার কাছে ক্ষমা চাইলেও আলোনসোর কাছে ক্ষমা চাননি ‘মাদ্রিদ বয়’-খ্যাত ভিনি। এমনকি চুক্তি নবায়নও থামিয়ে রাখেন আলোনসোর ভবিষ্যৎ দেখার জন্য।
এদিকে আলোনসোর আমলে প্রায় পুরোটা সময় চোটে বিপর্যস্ত ছিল মাদ্রিদ রক্ষণভাগ। মিডফিল্ডার মার্তিন সুবিমেন্দির জন্য অনুরোধ করেছিলেন আলোনসো। তবে ক্লাব সে অনুরোধ শোনেনি।
দলে অভাব ছিল নেতৃত্বের। কাপ্তান ফেদেরিকো ভালভের্দেও যেন দলের সমষ্টি থেকে বেশি ভাবছিলেন নিজের পজিশন নিয়ে। এমবাপে ব্যস্ত ছিলেন রেকর্ড ছোঁয়ার দৌড়ে। ইনজুরি কাটিয়ে ওঠার চেয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর এক বছরে ৫৯ গোলের রেকর্ডে চোখ ছিল বেশি।
শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের বোঝাতে পারেননি আলোনসো—তার পথই সঠিক। আর সেই বিশ্বাস ছাড়া উচ্চ প্রেসিং, গতি ও পজিশনাল ফুটবল চাপিয়ে দেওয়া অসম্ভব।
আলোনসোর সামনে হয়তো কিছুটা বিশ্রামের সময়। যারা তাকে চেনেন, তারা বলছেন, এই বিদায় অনিচ্ছাকৃত হলেও কিছুটা স্বস্তির। আর ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো আগামী মৌসুমে যে তাকে পেতে চাইবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
রিয়ালের পরবর্তী কোচ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন কাস্তিয়ার কোচ আলভারো আরবেলোয়া। ক্লাবের মানুষ, তবে জাবি আলোনসোর মতো কিংবদন্তিও যদি সংস্কৃতি বদলাতে না পারেন, আরবেলোয়ার সামনে সে চ্যালেঞ্জ প্রায় অসম্ভবই।
তবে কিছু কোচ নির্দিষ্ট ক্লাবের জন্য বেশি মানানসই। আর কিছু ক্লাব কখনোই পুরোপুরি কোচের অধীনে যেতে চায় না। রিয়াল মাদ্রিদ তেমনই এক ক্লাব।