ভারতে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না বাংলাদেশ। কারণ, বাংলাদেশ দল, সমর্থক, সাংবাদিকসহ যারাই ভারতে যাবেন, তাদের জন্য সেখানে রয়েছে ভয়াবহ নিরাপত্তা শঙ্কা। নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) ই-মেইল করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তারা নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে ভেন্যু বদলের অনুরোধ করেছিল আইসিসিকে।
পরবর্তীতে আইসিসি একটি ই-মেইল বার্তার মাধ্যমে বিসিবি’র কাছে জানতে চায়, আসলে কী ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে ভারতে। জবাবে বিসিবি দ্বিতীয় ই-মেইলে তথ্যসহ জানিয়ে দেয় যে, তারা কী কারণে নিরাপদ বোধ করছে না। অবশেষে আইসিসিও বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছে যে, ভারতে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলা নিরাপদ নয়। বিশ্ব ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা জানিয়েছে, তিনটি কারণে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা নিরাপদ নয়।
এমনটিই জানিয়েছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। গতকাল তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে আইসিসি নিরাপত্তা বিভাগের একটি চিঠি থেকে এসব বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘চিঠিতে বলা হয়েছে, তিনটি জিনিস হলে বাংলাদেশ টিমের নিরাপত্তা আশঙ্কা বাড়বে। প্রথমত, বাংলাদেশ দলে যদি মোস্তাফিজুর রহমানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সমর্থকরা যদি জাতীয় দলের জার্সি পরে ঘোরাফেরা করেন। আর তৃতীয়ত, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, তত দলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।’ তবে এর সঙ্গে ভেন্যু পরিবর্তন হবে না- এমন কোনো বিষয় নেই বলেই জানিয়েছে বিসিবি’র একটি সূত্র। তাদের দাবি, আইসিসি যেহেতু নিরাপত্তার বিষয়টি বুঝতে পেরেছে, তারা এখন হয়তো টাইগারদের বিশ্বকাপ ভেন্যু পরিবর্তন করে দিবে। ধারণা করা হচ্ছে শ্রীলঙ্কাতেই হতে যাচ্ছে টাইগারদের বিশ্বকাপ।
গতকাল একটি সংবাদ চাউর হয় যে ভারতেই টাইগারদের খেলতে হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। কেবল কলকাতা থেকে ম্যাচগুলো সরিয়ে নেয়া হবে চেন্নাই ও কেরালায়। এও গুঞ্জন ছিল একটি ম্যাচ চেন্নাইয়ে আর গ্রুপ পর্বের বাকি তিন ম্যাচ হবে শ্রীলঙ্কায়। তবে এখন ধারণা করা হচ্ছে ভারতের বাইরেই বাংলাদেশের ম্যাচগুলো আইসিসিকে আয়োজন করতে হবে। বাংলাদেশের দাবির পক্ষেই আলোচনা করেছে আইসিসি’র নিরাপত্তা বিভাগ।
বিসিবি’র একটি সূত্রের দাবি আইসিসি’র নিরাপত্তা বিভাগের চিঠির সঙ্গে ভেন্যু বদল নিয়ে কোনো চিঠি আসেনি এখনো। সূত্রটি জানায়, ‘নিরাপত্তা বিভাগের যে চিঠির কথা বলা হচ্ছে তার সঙ্গে ভেন্যু বদলের চিঠির কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা এখনো আইসিসি থেকে কোনো ধরনের চিঠি পাইনি। চিঠি পেলে আমরা বলতে পারবো আসলে ভেন্যু বদল হচ্ছে কিনা।’
আইসিসি’র নিরাপত্তা বিভাগ থেকে পাঠানো সাম্প্রতিক চিঠিতে যে ধরনের অদ্ভুত ও অযৌক্তিক শঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বাফুফে ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইসিসি’র এই চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আনেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে জানান যে, বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এমন কিছু শর্ত ও শঙ্কার কথা জানিয়েছে যা বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে দলের সেরা বোলারকে স্কোয়াডে রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা নজিরবিহীন। আইসিসি’র এমন বক্তব্যকে উপদেষ্টা সরাসরি ‘উদ্ভট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, আইসিসি যদি আশা করে বাংলাদেশ তাদের সেরা বোলারকে বাদ দিয়ে দল গঠন করবে কিংবা সমর্থকরা নিজেদের দেশের জার্সি গায়ে দিয়ে মাঠে যেতে পারবে না, তবে সেটি হবে অবাস্তব প্রত্যাশা। ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থার এমন আচরণে প্রশ্ন উঠেছে, তারা কি আসলেই গ্লোবাল অর্গানাইজেশন হিসেবে কাজ করছে, নাকি নির্দিষ্ট কোনো দেশের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
ভারতে গত কয়েক মাস ধরে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে সেখানে বাংলাদেশের খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন ক্রীড়া উপদেষ্টা। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৬ মাস ধরে চলা অব্যাহত নেতিবাচক ক্যাম্পেইন ও বাংলাদেশ-বিদ্বেষী পরিবেশের কারণে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়েছে। এই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা ন্যাশনাল অথরিটির নতি স্বীকার করাটা প্রমাণ করে যে, সেখানে খেলার মতো কোনো সুস্থ পরিবেশ নেই। আসিফ নজরুল সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ক্রিকেটের ওপর কারও একচেটিয়া আধিপত্য বা মনোপলি থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশ এই প্রশ্নে কোনো প্রকার নতি স্বীকার করবে না। প্রয়োজনে টুর্নামেন্ট শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়োজন করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। উপদেষ্টার বক্তব্যে এটি পরিষ্কার যে, ভারতের মাটিতে খেলার পরিবেশ নেই এবং আইসিসি’র চিঠিতেই তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন অপেক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক ভেন্যু পরিবর্তনের ঘোষণার। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে আইসিসি যে কারণগুলো দেখিয়েছে, তা মূলত ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের জন্য বৈরী পরিবেশের স্বীকৃতি।