Image description

মানুষের সঙ্গে মানুষের ভার্চুয়াল যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর কেবল মতবিনিময়ের জায়গা নয়-ক্রমেই তা বিভাজন, বিদ্বেষ ও সহিংসতা ছড়ানোর উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। এর নেপথ্যে কাজ করছে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ‘অ্যালগরিদম’। ব্যবহারকারীর পছন্দ, আগ্রহ ও আচরণ বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্ট সামনে এনে এই প্রযুক্তি ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণকে প্রভাবিত করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালগরিদমনির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জ্ঞানের জানালা খুলে দিচ্ছে না, বরং তৈরি করছে দেওয়াল। মানুষ জানছে কম, কিন্তু বিশ্বাস করছে বেশি। গুজব, উসকানি ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করছে, যা মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও কার্যকর উদ্যোগ স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, ভিউ ও এনগেজমেন্টের ব্যবসায়িক চিন্তায় ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম নিরপেক্ষ কোনো প্রযুক্তি নয়। এটি ব্যবহারকারীর আবেগ, রাগ, ভয় ও ঘৃণাকে ট্রিগার করে এমন কনটেন্টই বেশি ছড়িয়ে দেয়। ব্যবহারকারী যে মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, সেই মতের পোস্ট, ভিডিও ও বিশ্লেষণ তার সামনে পাঠায়। ফলে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায় ভিন্নমত। বিতর্কের জায়গা দখল করে নেয় বিদ্বেষ, আর ভিন্নমতের মানুষ রূপ নেয় ‘শত্রুতে’।

এই বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর মতবিনিময়ের ক্ষেত্র না থেকে একেকটি ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। সংঘবদ্ধ চক্র এই পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে গুজব ও উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে দিচ্ছে, যার প্রভাবে যুবসমাজ জড়িয়ে পড়ছে মব সৃষ্টি, গণপিটুনি ও নানা সহিংস অপরাধে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, ডিজিটাল লিটারেসি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে অ্যালগরিদম জনমতকে ভুল পথে চালিত করে বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন রহমান বলেন, ‘ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা এক্সে স্ক্রল করলেই একের পর এক পছন্দসই কনটেন্ট সামনে আসতে থাকে। দিনে যদি ২০টি কনটেন্ট দেখি, তার মধ্যে ১৮টিই আমার নিজের মতের পক্ষে। এতে ভিন্নমত শোনার মানসিক প্রস্তুতিটাই নষ্ট হয়ে যায়।’

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবহারকারীকে কনটেন্ট বাছাই করতে হয় না, অ্যালগরিদমই তার হয়ে সেই কাজটি করে দেয়। এভাবেই তৈরি হয় ‘ইকো চেম্বার’, যেখানে মানুষ কেবল নিজের মতের প্রতিধ্বনিই শুনতে থাকে। ভিন্ন তথ্য ও যুক্তির জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে।

গত দুই সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ৩০ জন তরুণ-তরুণীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়-প্রতিদিন তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত সময় ব্যয় করেন, কী ধরনের কনটেন্ট নিয়মিত দেখেন, কোন ধরনের কনটেন্ট তাদের বেশি আকর্ষণ করে, ভিন্নমতের কনটেন্ট তাদের চোখে পড়ে কি না এবং ভিন্নমতের ভার্চুয়াল বন্ধুদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন। পাশাপাশি অনলাইনে কমেন্ট বা চ্যাটিংয়ে তর্ক-বিতর্কে জড়ান কি না এবং পরিবারের সদস্যদের সামাজিক মাধ্যমের আইডিতে লাইক, কমেন্ট করেন কি না-এসব বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়।

তাদের ২০ জন জানিয়েছেন-দিনে গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা সামাজিক মাধ্যমে সময় দেন। বাকিরা সময় দেন এক থেকে আড়াই ঘণ্টা। ওই ৩০ জনের মধ্যে ২৪ জন স্বীকার করেছেন, ভিন্নমতের কনটেন্ট খুব কমই সামনে আসে। ২২ জন জানিয়েছেন, অনলাইনে তর্ক-বিতর্কে তারা আগের চেয়ে বেশি রাগান্বিত হন। ২০ জন জানিয়েছেন, উত্তেজক ও নেতিবাচক কনটেন্ট বেশি আকর্ষণ করে। ১৫ জন ভিন্নমতের মানুষকে ব্লক করেন এবং ২৩ জন জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্যদেরও সামাজিক মাধ্যমে এড়িয়ে যান।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব ও উসকানিমূলক পোস্ট থেকেই বহু সহিংস ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। ভাইরাল হওয়া পোস্ট বা ভিডিও দেখে উত্তেজিত জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গুজব ছড়িয়ে মব সৃষ্টি, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উসকানিতে হামলা, অনলাইন হুমকি থেকে খুন, সাইবার বুলিং থেকে আত্মহত্যা-এসব অপরাধের পেছনে সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা এখন স্পষ্ট। উসকানিমূলক রাজনৈতিক কনটেন্ট তুলনামূলক বেশি রিচ পায়, যেখানে ভিন্নমতকে ‘শত্রু’ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্টের পর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর অনেক ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো পোস্ট বা ভিডিও থেকে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অ্যালগরিদমভিত্তিক এমন কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা ধাপে ধাপে মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। বারবার সহিংস ভিডিও দেখার ফলে তৈরি হয় একধরনের ডিসেনসিটাইজেশন-অর্থাৎ অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাওয়া। তখন সহিংসতা আর অস্বাভাবিক মনে হয় না; বরং অপরাধকে ‘হিরোইজম’ হিসাবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো নেতিবাচক কনটেন্ট ‘ক্রিমিওজেনিক’ (অপরাধীকরণের উপাদান) হিসাবে কাজ করছে। ব্যবহারকারীর আগ্রহ অনুযায়ী একই ধরনের কনটেন্ট বারবার সামনে আসায় গুজব, উসকানিমূলক ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সমাজে অপরাধপ্রবণ মানসিকতা তৈরি হয়। তিনি বলেন, এ ধরনের কনটেন্ট মানুষকে অবচেতনভাবে অপরাধের প্রতি আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একধরনের অনানুষ্ঠানিক অপরাধ-শিক্ষার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে, যেখানে পর্নোগ্রাফি, মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত কনটেন্ট মোটিভেশনাল ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে। ড. ওমর ফারুকের মতে, সময়মতো সোশ্যাল মিডিয়া ও এআই পলিসির লাগাম টানা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নেতিবাচক ও আক্রমণাত্মক কনটেন্ট দীর্ঘদিন দেখলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এটি এক ধরনের নীরব মানসিক সংকট তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অতিরিক্ত ব্যবহার ও আসক্তি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, যা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সামাজিক দক্ষতা হ্রাস করে। অনেকেই নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং একাকিত্বে ভোগে। ব্যবহারকারীদের মধ্যে হতাশা ও বিষণ্নতা তৈরি হয়। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার হওয়া উচিত সংযত, যুক্তিনির্ভর ও ইতিবাচক।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম একজন আড়ি পাতা বন্ধুর মতো। সে জানে আপনি কী পছন্দ করেন; কিন্তু ভালো-মন্দ বোঝে না। রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখানে অনেকটা ‘অস্ত্রহীন পাহারাদারের’ মতো, যারা এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার গতিবিধি বুঝলেও থামানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা কৌশল এখনো রপ্ত করতে পারেনি। রাষ্ট্র কেবল বড় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার পরই সাময়িকভাবে তৎপর হয়ে ওঠে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কোনো সতর্কতা বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ দেখি না। তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে এই জটিল বিষয়গুলো বুঝে ওঠার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান ও শক্তির অভাব রয়েছে। এই সুযোগে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অর্থ খরচ করে গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পথ তৈরি হয়েছে। এখনই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করলে জনমতকে ভুল পথে চালিত করে বড় ধরনের সামাজিক বা বৈপ্লবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।

সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ার্নেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ যুগান্তরকে বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী প্রোগ্রামিং ও কনটেন্ট মডারেশন সিস্টেম পরিচালনা করে। এসব প্ল্যাটফর্ম সারা বিশ্বের মানুষ ব্যবহার করায় এখানে কোনো অঞ্চলভিত্তিক আলাদা নীতির প্রয়োগ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার পলিসি লেভেলে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সামাজিক আচরণ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ ভিন্ন। সেই বাস্তবতায় দেশ বা অঞ্চলভিত্তিক সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এভাবে অঞ্চলভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরও দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।

ডিএমপির গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, অ্যালগরিদম সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবসায়িক পলিসির অংশ। এটি নিয়ন্ত্রণে কারও সরাসরি হাত নেই। তবে কনটেন্ট সম্পর্কে মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে এবং সত্য-মিথ্যা যাচাই করে বিশ্বাস করতে হবে।