ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে ১৬০০ মেগাওয়াটের চুক্তি প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে বিদ্যুৎ খাত পর্যালোচনাবিষয়ক বিশেষ কমিটি। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশেই বসানোর প্রস্তাব ছিল। কিন্তু কোনো ধরনের সরকারি প্রক্রিয়া না মেনে ভারতের ঝাড়খণ্ডে বসানো হয়। শুধু তাই নয়, সাবেক বিদ্যুৎ সচিব আহমেদ কায়কাউস কারও পরামর্শ না শুনে আদানিকে প্রতি ইউনিট ১ টাকা ২০ পয়সা ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়িয়ে দেন। চুক্তিতে সব ধরনের ব্যবসায়িক ঝুঁকি চাপানো হয়েছে পিডিবির ঘাড়ে। এতে পিডিবিকে এমন এক চোরাবালিতে ফেলা হয়েছে যেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত দুরূহ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, আদানির এ চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী। চুক্তি অনুযায়ী এটি বাতিল করার উপায় নেই। কারণ এতে তারা আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে আরও বেশি লাভবান হবে। এখন উচিত হবে তাদের সঙ্গে বসে চুক্তির ধারাগুলো সংশোধন করা।
পর্যালোচনা কমিটির একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, আদানির চুক্তি এক প্রকার দাসত্বের চুক্তির মতো। এতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মান-মর্যাদাকে হেয় করে আদানির স্বার্থ দেখা হয়েছে। আদানি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে কমপক্ষে ৮০ হাজার কোটি টাকা লাভ করবে। এতে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চুক্তির সঙ্গে জড়িত পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যন খালেদ মাহমুদসহ আট শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে গত ৮ জানুয়ারি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর খান যুগান্তরকে বলেছেন, আদানির অনেক শর্ত নিয়ে আপত্তি আছে। সেগুলোর ব্যাপারে পর্যালোচনা করতে গত মাসে তাদের একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পর্যালোচনা কমিটি বিদ্যুৎ খাত নিয়ে কাজ করছে। তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট পেলে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, আদানির মতো ভারতের বিভিন্ন কোম্পানি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে গড়ে ৯ টাকায়। সেখানে কীভাবে আদানি ১৪-১৫ টাকায় বিক্রি করে।
সব ঝুঁকি বাংলাদেশের, লাভ আদানির : বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংক্রান্ত চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিদ্যুৎ খাত পর্যালোচনাবিষয়ক বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিনা দরপত্রে দেওয়া আদানির এ প্রকল্প অনুমোদনে চরম অনিয়ম হয়েছে। পর্যালোচনা কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, আগে সিদ্ধান্ত হয়েছিল আদানির কেন্দ্রটি বাংলাদেশে হবে। কিন্তু কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত হলো এটি ভারতের ঝাড়খণ্ডে হবে। কীভাবে এ সিদ্ধান্ত হলো তা কেউ জানেন না। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে পিডিবি একজন বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু ওই পরামর্শকের রিপোর্ট আমলে নেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট আরেকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আহমেদ কায়কাউস একদিন সিদ্ধান্ত দিলেন ক্যাপাসিটি চার্জ প্রতি ইউনিটে এক টাকার বেশি বাড়বে। আদানি প্রতি ইউনিটে ক্যাপাসিটি চার্জ পায় ৩ দশমিক ৯ সেন্ট, যা স্থানীয় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে অনেক বেশি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সরকারের পর্যালোচনা কমিটির সদস্য সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যুৎ খাত নিয়ে রিপোর্ট এখনো চূড়ান্ত হয়নি। হলে কমিটির আহ্বায়ক এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাবেন।
পর্যালোচনা কমিটি প্রাথমিকভাবে এ চুক্তির ক্ষতি বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ঝাড়খণ্ডে আদানি ১৬০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র বসাতে বিনিয়োগ করেছে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে ৯০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের জন্য খরচ হয়েছে আরও ৫০ কোটি ডলার। এ বিনিয়োগ উসুল করতে কোম্পানিকে প্রতিবছর ৪৫০ মিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এ হিসাবে আদানির বিনিয়োগ সাড়ে চার বছরে আদায় হয়ে যায়।
কমিটির আরেক সদস্য জানিয়েছেন, ২৫ বছরে আদানি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ দিয়ে ৬ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার বা কমপক্ষে ৮০ হাজার কোটি টাকা লাভ করবে। এর বাইরে কয়লা থেকেও তার লাভ আছে। চুক্তি অনুযায়ী আদানির উৎপাদন ক্ষমতার কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ বিদ্যুৎ না নিলেও তাকে প্রতিমাসে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দিতে হবে।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ২৫ বছরের এ চুক্তি একটি দীর্ঘ চুক্তি। এত দীর্ঘদিনের জন্য এত বেশি চার্জ দিয়ে চুক্তি করা দেশের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। দরকার না হলেও আদানিকে বসিয়ে বসিয়ে ডলার দিতে হবে। শুধু তাই নয়, নিয়মিত বিল দিতে না পারলে প্রতিমাসে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে সারচার্জ বা জরিমানা দিতে হবে পিডিবিকে, যা অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় অনেক বেশি। পিডিবির সঙ্গে আদানির পিপিএতে (বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি) বলা আছে, ভারতে কোনো সমস্যা বা কিছু হলে অথবা ভারত যদি আদানিকে এ কেন্দ্রের জন্য ট্যাক্স বা কর ধার্য করে বাংলাদেশকে তা পরিশোধ করতে হবে। এ বিনিয়োগের সব ঝুঁকি বাংলাদেশের। আদানির কোনো ব্যবসায়িক ঝুঁকি নেই। এমনকি ভারতে কোনো দুর্যোগ বা রাজনৈতিক ঘটনায় কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশকে তাদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। তবে কোনো বিষয় নিয়ে বিরোধ হলে তার মীমাংসার জন্য সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে বাংলাদেশকে।
ভারতের অন্য কোম্পানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম কত : আদানি ছাড়া ভারতের অন্য কোম্পানির কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে আরও ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। এর মধ্যে এনভিভিএন থেকে প্রতি ইউনিট ৮ দশমিক ০৭৯ টাকা, পিটিসি ইনডিয়া থেকে ৯ দশমিক ২৮৮ টাকা, সেমক্রপ ইনডিয়া থেকে ১০ দশমিক ৪২৭ টাকায় বিদ্যুৎ কিনছে পিডিবি। সেখানে আদানির বিদ্যুতের দাম পড়ছে ১৪ দশমিক ৮৬ টাকা। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এনভিভিএনকে ১০ হাজার ৭২ কোটি, সেমক্রপকে ৯ হাজার ৫৮৫ কোটি এবং পিটিসিকে ৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা বিল দিয়েছে পিডিবি। এ সময়ে আদানি বিল পেয়েছে ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, ভারতের অন্যান্য কোম্পানি এত সস্তায় বিদ্যুৎ দিতে পারলে আদানি কেন দিতে পারবে না? কিসের ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে চুক্তি হলো।
কয়লার ইনডেক্স সবই ভিন্ন : এদিকে দেশে ৮টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। এর কোনোটির সঙ্গে কোনোটির ডিজাইনের মিল নেই। এমনকি কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে একেক কোম্পানি একেকটি কয়লার ইনডেক্স (আন্তর্জাতিক বাজারের) ব্যবহার করে। এতে কয়লার দাম ও আমদানি নিয়ে কারসাজি এবং অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বিসিপিসিএল পায়রা ১২৪৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নিউক্যাসেল ইনডেক্স, বিআইএফসিএল ১২৩৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্র আইসিআই-২, এসএস পাওয়ার ১২২৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্র আইসিআই-৩ এবং বরিশাল পাওয়ার এইচবিএ-১ ইনডেক্সের ভিত্তিতে কয়লা আমদানি করে। আর আদানি করে নিউক্যাসেল ও এইচবিএ-২ ইনডেক্সের গড় ভিত্তিতে। এতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পায়রা ১২৪৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্রের কয়লার মূল্য পিডিবি দিয়েছে গড়ে প্রতিটন ৭৬ দশমিক ১৬ ডলার, বাংলাদেশ-ভারত ১২৩৪ মেগাওয়াটের মৈত্রী কেন্দ্রের কয়লার দাম প্রতিটন ৭৩ দশমিক ৮৪ ডলার, এস আলম গ্রুপের ১২২৪ মেগাওয়াটের এসএস পাওয়ারের কেন্দ্রের কয়লার দাম ৭১ দশমিক ৪৯ ডলার, বরিশাল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের কয়লার দাম প্রতিটন ৭৫ দশমিক ৩৮ ডলার। সেখানে আদানির কয়লার দাম পিডিবিকে দিতে হয়েছে প্রতিটন ৭৬ দশমিক ৯১ ডলার। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কম দামে কয়লার মূল্য দিতে হয়েছে বাঁশখালী এসএস পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রকে।