Image description

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা রেখে অতীতের বিতর্কিত ভাবমূর্তি কাটিয়ে উঠতে চায় পুলিশ । কিন্তু ভোটের দিন স্বাধীন ও চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করা যাবে কি না, তা নিয়ে বাহিনীর ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ভীতি-শঙ্কা । পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক ও অন্যান্য চাপের কারণে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন বাধাগ্রস্ত হতে পারে । সে কারণে নির্বাচনের দিন আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চায় পুলিশ । 

পুলিশ সূত্র জানায় , স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত সপ্তাহে আইনশৃঙ্খলা - সংক্রান্ত সভায় হয় । সেই সভায় নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা ও সহযোগিতা চান পুলিশ মহাপরিদর্শক ( আইপিজি ) বাহারুল আলম ।

বৈঠকে তিনি বলেন , রাজনৈতিক দল ও সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা না পেলে ভোটের দিন চাপমুক্তভাবে কাজ করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হবে না । এতে ভবিষ্যতে পুলিশের অস্তিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা আরও সংকটে পড়তে পারে । জানতে চাইলে আইজিপি বাহারুল আলম গতকাল সোমবার আজকের ভয় ও চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে চায় পুলিশ । এ জন্য ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোটদান নিশ্চিত করা এবং সার্বিক আইন- শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের কাছে সবুজ সংকেত চাওয়া হয়েছে ।

বাহারুল আলম , আইজিপি পত্রিকাকে বলেন , সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত । ভয় ও চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে চায় পুলিশ । এ জন্য ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোটদান নিশ্চিত করা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের কাছে সবুজসংকেত চাওয়া হয়েছে ।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায় , বাহিনীর ধারণা , আসন্ন নির্বাচনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল জয়ের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে পারে । এতে কেউ কেউ সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে । এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইনভঙ্গকারীদের গ্রেপ্তার করতে গেলে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে । তখন সরকার যদি পুলিশকে পিছু হটার নির্দেশ দেয় , তাহলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে । সঙ্গে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নির্বাচন বানচালের চাপ তো থাকবেই ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের এক পুলিশ সুপার বলেন , বড় সমস্যা হলো – ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কিছু মানুষ পুলিশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে মানতে চাইছে না । তারা মনে করে , অন্যায় করলেও এই পুলিশের কিছু বলার অধিকার নেই ।

ওই শ্রেণির লোককে আইনের ভেতরে রাখতে গেলেই তারা পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে । পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন , ‘নির্বাচনের দিন কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের সর্বোচ্চ ক্ষমতা যদি না থাকে , তাহলে পুলিশের মাঠে থাকা না থাকা সমান । আমরা আইনের ভেতরে থেকে দেশের পক্ষে কাজ করার নিশ্চয়তা চাই ।”

সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে আটকের পর আদালতে নেওয়া নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিও পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় । থানায় অবস্থানকালে শতাধিক নেতা - কর্মী সদর মডেল থানার সামনে অবস্থান নিয়ে রাতেই আদালত বসিয়ে জামিন শুনানির দাবি জানান । পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন , এসব ঘটনায় চাপ সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই পুলিশের দায়িত্ব । সেটা তারা করতে পেরেছে । পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে , এ ধরনের ছোট ছোট ঘটনায় ছাড় দিলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা বড় মব তৈরির সাহস পায় । সে কারণে নির্বাচনের আগে কাউকে আইনের বাইরে কোনো রাজনৈতিক বা সরকারি ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই । এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রেঞ্জ ও জেলাপর্যায়ে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে ।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায় , আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৬৬ টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে । এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৮ হাজার ৭৭০ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ১৬ হাজার ৬৭৫ টি । একই সঙ্গে সাধারণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৭ হাজারের বেশি । সূত্রটি জানায় , সারা দেশের মধ্যে ঢাকা বিভাগ ও ঢাকা মহানগরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি । আর জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র রয়েছে চট্টগ্রামে । এসব কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন , স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সমন্বিতভাবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েছে । যেকোনো ধরনের গোলযোগ এড়াতে এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে । পাশাপাশি নজরদারিও জোরদার করা হবে । পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর জন্য বডি ক্যামেরা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে , যা জেলা পুলিশ নিজেদের অর্থায়নে সংগ্রহ করা শুরু করেছে ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে , নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১৩ জন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন । এর মধ্যে থাকবেন ৩ জন অস্ত্রধারী , ৬ জন অস্ত্রবিহীন পুরুষ ও ৪ জন অস্ত্রবিহীন নারী সদস্য । এ ছাড়া নির্বাচনের আগে দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । ইতিমধ্যে ১ লাখ ৩৩ হাজার সদস্যের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে । মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন , পুলিশকে যদি আইন আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে নির্বাচনের মাঠে দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়া হয় , তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নেওয়া সব আয়োজনই ব্যর্থ হয়ে যাবে ।

কেন্দ্র ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন , ‘ভোটাররা নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন — এটিই পুলিশের দায়িত্ব । কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না , সে যে দলেরই হোক না কেন । ব্যক্তি , ভোটার ও প্রার্থীর শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে পুলিশকেই । পুলিশ তার দায়িত্ব পালন করবে ।

”ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড . তৌহিদুল হক বলেন , নির্বাচনে পুলিশকে মাঠে নামিয়ে কাজের স্বাধীনতা না দিলে কোনো ফল আসবে না । যে - ই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করুক না কেন , তাকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে । পুলিশকে পুলিশের মতো কাজ করতে দেওয়া উচিত । রাজনৈতিক মহলেও উদ্বেগ : চোরাগোপ্তা হামলা , গুলি , হত্যা , বিস্ফোরণ , মব সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে ।

নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই গুলি করে চারটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে । এসব কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে । নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে । গোপালগঞ্জ -৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী এস এম জিলানীর বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিহিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে । বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল ঠাকুরগাঁওয়ে এক আয়োজনে সহিংসতা ও অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন । যদিও তিনি আশা প্রকাশ করেন , নির্বাচনের সময় পরিস্থিতির উন্নতি হবে ।