জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি হলো দেশে বড় ধরনের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। এর মধ্যে রয়েছে-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করা, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ, আইনের শাসন এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অন্যতম। কিন্তু গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হলে সেই রূপান্তর আর হবে না। বড় ধরনের সংকটে পড়বে দেশ। যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমন মতামতই ব্যক্ত করেন। তাদের মতে, ‘না’ জয়ী হলে জুলাই বিপ্লব এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। নির্বাচিত সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার যুক্তি খুঁজে পাবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘না’ জয়যুক্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ সরকার ইতোমধ্যে প্রচারণা শুরু করেছে। আগামী চার সপ্তাহ আরও ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালানো হবে। রাজনৈতিক দলগুলোও ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে মানুষকে উৎসাহিত করছে।
প্রসঙ্গত, দেশে প্রথমবারের মতো একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি দিতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এই ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে ইতোমধ্যে নানা চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কায় রয়েছে গণভোট। এর মধ্যে রয়েছে-গণভোটের প্রশ্নে সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয় এমন জটিল বাক্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে চারটি প্রশ্ন থাকলেও উত্তর দেওয়ার সুযোগ থাকছে একটি; অর্থাৎ হ্যাঁ বা না বলতে হবে। তবে গণভোটের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা এবং অভ্যুত্থানের বিপক্ষে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এছাড়াও একজন ভোটার ভোট দেওয়ার জন্য খুব কম সময় পাবেন। এই সময়ের মধ্যে ব্যালটের প্রশ্নগুলো পড়াও কঠিন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সরকার নিজেই প্রচারণা শুরু করেছে।
জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘গণভোটে না জয়যুক্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা আমি দেখছি না। কারণ দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে। তারা ফ্যাসিবাদী শাসনে আর ফিরে যেতে চায় না। তিনি বলেন, ‘গণভোট নিয়ে সরকার সারা দেশে প্রচারণা শুরু করেছে। আমি নিজেই রাজশাহী এবং বরিশালে গিয়েছি। সেখানে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি।’ তার মতে, এই সরকারের মূল কাজ হলো রাষ্ট্র সংস্কার। এ লক্ষ্যেই ১১টি কমিশন করা হয়েছিল। সেই কমিশনের রিপোর্টের আলোকে তৈরি হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। ফলে গণভোটকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোও কথা বলছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন এবং এবি পার্টিসহ সব রাজনৈতিক দল পক্ষে কথা বলছে। এখন পর্যন্ত কারও বিরোধিতার কথা আমি শুনিনি। তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে আসন সমঝোতা এবং অন্যান্য ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত। আগামী ২২ জানুয়ারির পর রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে। তবে তিনি বলেন, পালিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। তারা সব কিছুতেই বাধা দেয়। যেহেতু তাদের রাজনৈতিক দল হিসাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না, তাই তাদের প্রচারণাকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সরকার আশঙ্কা করছে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারণা না চালালে মানুষ গণভোটের ব্যাপারে আগ্রহী হবে না। দলীয় সমর্থকদের কেউ কেউ হয়তো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিলেও গণভোট দেবে না। যে কারণে সরকার প্রচারণা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোরও এই প্রচারণা চালানো উচিত। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এমন যদি হয় জাতীয় নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬৫ শতাংশ, কিন্তু গণভোট পড়েছে ৪০ শতাংশ বা তার কাছাকাছি। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন, গণভোট মূলত জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট। অর্থাৎ জুলাই বিপ্লবের ফলে দেশে যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চিন্তা করা হচ্ছে, ‘না ভোট’ জয়যুক্ত হলে সেই রূপান্তর হবে না। জুলাই বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি হলো-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিমূলক করা, জনগণের অংশগ্রহণকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া, আইনের শাসন এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অন্যতম। কিন্তু হ্যাঁ জয়যুক্ত না হলে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, গণভোটের নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ বাংলাদেশে এর আগে কখনো গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একইদিনে হয়নি। ফলে এবারের গণভোটের বিষয়টি কঠিন ও জটিল একটি কাজ। ৪টি প্রশ্ন, কিন্তু একটি উত্তর দিতে হবে। বিষয়গুলো টেকনিক্যাল। কেউ যদি তিনটির সঙ্গে একমত কিন্তু একটির সঙ্গে দ্বিমত আছে; তাহলে তিনি কী করবেন? আবার কেউ দুটির সঙ্গে একমত। অর্থাৎ ভোটাররা এখানে দ্বিধান্বিত বা বিভ্রান্ত হবে। তার মতে, দেশের সাধারণ ভোটারদের জ্ঞান এখনো ওই পর্যায়ে পৌঁছেনি। ফলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যতই প্রচারণা চালানো হোক, মানুষকে বিষয়গুলো বোঝানো কঠিন হবে। তিনি বলেন, অন্তত তিন ধরনের ভোটার আছে। শহরের এবং শিক্ষিত কিছু ভোটার বুঝে ভোট দেবে। কিছু আছে, দল যা বলবে, সেটাই করবে। আবার কিছু ভোটার আছে, না বুঝে ভোট দেবে, অথবা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। তিনি বলেন, গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি রয়েছে। যেহেতু এই ভোটের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের সম্পর্ক রয়েছে, তাই প্রকাশ্যে অভ্যুত্থানের বিপক্ষে কেউ কথা বলছেন না। কিন্তু চুপে চুপে সমর্থকদের বলছেন, আমরা এসবের খুব বেশি পক্ষে না। অপরদিকে আরেকটি দল প্রকাশ্যেই বলছে, আগামীতে জুলাই সনদ অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। সেক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। অধ্যাপক আইনুল ইসলাম মনে করেন, গণভোটে না জয়যুক্ত হলে জুলাই অভ্যুত্থানসহ পুরো বিষয়টি চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, ভোটের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গণভোট একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন। এখানে জাতীয় নির্বাচনের মতোই সময় লাগে। প্রতিবার জাতীয় নির্বাচনের সময় লাগে ৮ ঘণ্টা। সেখানে গণভোটে আরও ৪ ঘণ্টা সময় দিলেও ভোটে ১২ ঘণ্টা সময় দরকার। সেখানে আরও ২ ঘণ্টা কমানো হলেও ১০ ঘণ্টার কমে একেবারেই হয় না। কিন্তু সময় বাড়ানো হয়েছে মাত্র ১ ঘণ্টা। শুরুতে আধা ঘণ্টা এবং শেষে আধাঘণ্টা। এক্ষেত্রে শুরুর আধাঘণ্টা একেবারেই মূল্যহীন। সকাল সাড়ে ৭টায় খুব কম মানুষই ভোট দিতে আসে।
রাজনৈতিক দলের অবস্থান : জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ ১১ দলীয় জোট গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। বিএনপি জোরালো প্রচারণা না চালালেও সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠানে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণভোটে ‘না’ দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘একই দিনে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন আমরা চেয়েছিলাম। সেভাবেই হয়েছে। সংস্কার বিষয়ে যে গণভোট হচ্ছে- সেগুলো আমরাই বহু আগে ২০১৬ এবং ২০২৩ সালে ৩১ দফার মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরেছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেখানে ‘না’ বলার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেকজন অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, গণভোট নিয়ে যে ধরনের প্রচারণা চালানো উচিত ছিল, এতদিন তা করা হয়নি। এখন প্রচারণা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, গণভোটে ‘না’ জয় হলে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে না। কারণ নির্বাচনের পর যে সরকার আসবে, সংস্কার বাস্তবায়ন না করার জন্য তার পক্ষে ‘না ভোট’ একটি যুক্তি হয়ে দাঁড়াবে। সরকারের বৈধতা, সংস্কার এবং জুলাই বিপ্লব সেক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তার মতে, গণভোটে খুব কমসংখ্যক ভোট পড়বে। এই আশঙ্কার কারণ হলো, গণভোট নিয়ে নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নেতিবাচক প্রচারণা চলছে। তবে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় যেভাবেই হোক, এটাকে ‘হ্যাঁ’ করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ হ্যাঁ ভোট পাশ করবে। তিনি বলেন, কিছু ভোট তো অবশ্যই পড়বে। সেটি ৩০ শতাংশ না হলেও এর কাছাকাছি হবে। এরপর সরকার যদি বলে দেয়, হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে, তাহলে কে এটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করবে?। তিনি আরও বলেন, এখনো সবাই মিলে যদি প্রচারণা চালায়, তাহলে হয়তো এর ইতিবাচক ফলাফল আসবে। অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ১৯৯১ সালের গণভোটে ৩১ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিল। এবার হয়তো তারচেয়ে কম হতে পারে।
জানা গেছে, রাষ্ট্র সংস্কারে জুলাই সনদে মোট ৮৪টি প্রস্তাব করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গত ১৭ অক্টোবর ২৫টি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করে। তবে ৬১টি প্রস্তাবেই কোনো না কোনো দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (আপত্তি) রয়েছে। মৌলিক ২০টি সংস্কারের মধ্যে ৯টিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে বিএনপি। তবে সনদে স্বাক্ষর করেনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সনদ বাস্তবায়নে ২৮ অক্টোবর সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেয় কমিশন। সেখানে রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রাখা হয়নি। পরবর্তীতে ১৩ নভেম্বর জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি।