মায়ের জন্য একটি গাড়ি কিনবেন—এমন নিয়ত করেছিলেন তাওহিদ হৃদয়। সেই ইচ্ছার কথা মনে করেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট করেছেন বাংলাদেশ ব্যাটসম্যান। কারণ কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর হাতে উঠেছে চেরির গাড়ির চাবি।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে ধারাবাহিক ব্যাটিংয়ের স্বীকৃতি হিসেবে চেরি মোস্ট ভ্যালুয়েবল বাংলাদেশি প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ পুরস্কার পেয়েছেন হৃদয়। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন লাল রঙের চেরি টিগো ক্রস গাড়ি। সেই গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ফেসবুকে হৃদয় লিখেছেন, “মা, তোমার জন্য একটা গাড়ি কেনার নিয়ত করেছিলাম, তার কয়েক দিনের মধ্যেই পেয়ে গেলাম!! অদ্ভুত না???”
পোস্টটি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ছবিতে দেখা যায়, বাংলাদেশ দলের জার্সি পরে লাল গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন হৃদয়। তাঁর মুখে হাসি, হাতে গাড়ির দরজা। মাঠের সাফল্য, পুরস্কার আর মাকে ঘিরে ব্যক্তিগত আবেগ—সব মিলিয়েই পোস্টটি ভক্তদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে থেকেই এই পুরস্কার নিয়ে আলোচনা ছিল। বিসিবি ও চেরির চুক্তি অনুযায়ী সিরিজে সবচেয়ে মূল্যবান পারফরম্যান্স দেখানো বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে গাড়ি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল তখন বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়া সিরিজে ‘বেস্ট ভ্যালুয়েবল বাংলাদেশি ক্রিকেটার’কে চেরির গাড়ি দেওয়া হবে।
শেষ পর্যন্ত সেই পুরস্কার উঠেছে হৃদয়ের হাতে। সিরিজজুড়ে ব্যাট হাতে স্থিরতা দেখিয়েছেন তিনি। প্রথম ওয়ানডেতে করেন ৩১ রান। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে রান তাড়ায় অপরাজিত ৪০ রানের ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে সিরিজ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তৃতীয় ওয়ানডেতে দলের বিপদের সময় খেলেন ৮৩ রানের ইনিংস। তিন ম্যাচে তাঁর রান ১৫৪
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই সিরিজ বাংলাদেশের ক্রিকেটে ঐতিহাসিক। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে আগেই সিরিজ নিশ্চিত করেছিল বাংলাদেশ। সেটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ জয়। শেষ ম্যাচে কুপার কনোলির ১৪৯ রানে অস্ট্রেলিয়া ১ উইকেটের সান্ত্বনার জয় পেলেও সিরিজ ২-১ ব্যবধানে বাংলাদেশেরই থাকে।
তৃতীয় ওয়ানডেতেও বাংলাদেশের ইনিংসের বড় ভরসা ছিলেন হৃদয়। শুরুতে সৌম্য সরকার, তানজিদ হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্ত দ্রুত ফিরে গেলে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। সেই অবস্থায় লিটন দাসের সঙ্গে ইনিংস গড়েন হৃদয়। পরে মোসাদ্দেক হোসেনের সঙ্গে জুটি গড়ে বাংলাদেশকে ২৭৪ রানে পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।
হৃদয়ের ৮৩ রানের ইনিংসটি ছিল দায়িত্বশীল। ৮৮ বলে ৮ চার মেরে তিনি দলের ইনিংসের ভিত তৈরি করেন। তাঁর সঙ্গে লিটনের ৫৮ ও মোসাদ্দেকের অপরাজিত ৫৬ রান বাংলাদেশকে লড়াইয়ের পুঁজি এনে দেয়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিততে না পারলেও হৃদয়ের ইনিংস সিরিজে তাঁর ধারাবাহিকতার আরেকটি প্রমাণ হয়ে থাকে।
তবে হৃদয়ের গাড়ি পাওয়ার গল্প শুধু ক্রিকেটীয় পুরস্কারের নয়। তাঁর ফেসবুক পোস্টে মাকে ঘিরে যে আবেগ ফুটে উঠেছে, সেটিই বিষয়টিকে আরও মানবিক করে তুলেছে। একজন ক্রিকেটার মাঠে পারফর্ম করে পুরস্কার পেলেন—এটি সাধারণ খবর। কিন্তু সেই পুরস্কারের সঙ্গে যখন মায়ের জন্য করা স্বপ্নের মিল খুঁজে পান, তখন গল্পটি মাঠের বাইরেরও হয়ে যায়।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে সিরিজভিত্তিক বিশেষ পুরস্কারের চল দেখা যাচ্ছে। আগে মোটরসাইকেল পুরস্কারের আলোচনাও ছিল। এবার অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় দলের বিপক্ষে সিরিজে গাড়ি পুরস্কার যোগ করেছে বাড়তি আকর্ষণ। মিরপুরের মাঠে লাল চেরি টিগো ক্রস গাড়িটি সিরিজজুড়েই নজর কেড়েছিল।
চেরি বাংলাদেশের ওয়েবসাইট অনুযায়ী টিগো ক্রস হলো আধুনিক ক্রসওভার এসইউভি, যার ইঞ্জিন ১.৫ লিটার টার্বোচার্জড এবং শক্তি ১৪৫ বিএইচপি। সিরিজের শুরু থেকেই গাড়িটি কে পাবেন, তা নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের আগ্রহ ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তর হলো—তাওহিদ হৃদয়।
অন্যদিকে সিরিজসেরা পুরস্কার পেয়েছেন মোসাদ্দেক হোসেন। ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত সিরিজ কাটানো মোসাদ্দেক বাংলাদেশের সিরিজ জয়ের অন্যতম নায়ক। আর আলাদা চেরি পুরস্কারে সেরা বাংলাদেশি মূল্যবান পারফরমার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন হৃদয়।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয় বাংলাদেশের জন্য যেমন বড় অর্জন, তেমনি তরুণ ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সও ছিল বড় বার্তা। হৃদয় সেই বার্তার অন্যতম মুখ। চাপের সময়ে ব্যাটিং, রান তাড়ায় স্থিরতা, শেষ ম্যাচে বড় ইনিংস—সব মিলিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের মাঝের সারিতে তাঁর গুরুত্ব কতটা বাড়ছে।
সিরিজ শেষে তাই হৃদয়ের পোস্ট শুধু একটি গাড়ি পাওয়ার আনন্দ নয়। এটি একজন ক্রিকেটারের পারিবারিক স্বপ্ন, মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং মাঠের পারফরম্যান্সের স্বীকৃতির গল্প। মাকে গাড়ি কিনে দেওয়ার নিয়ত করেছিলেন তিনি; কয়েক দিনের মধ্যেই পুরস্কার হিসেবে সেই গাড়ি পেয়েছেন।
হৃদয়ের নিজের ভাষায়, “অদ্ভুত না?”
বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্যও সিরিজটি অনেকটা তেমনই—অবিশ্বাস্য, স্মরণীয় এবং আবেগময়।