Image description

রাজধানীর মগবাজারের পেয়ারাবাগ বস্তিতে বসবাস ১০ বছর বয়সি রহিম মিয়ার। হাতে একটি মোবাইল ফোন। কারওয়ান বাজার থেকে মালিবাগ রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি করে সে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন মাদকসেবীরা। কৌশলে কথা বললে রহিম মিয়া জানায়, তার মা বাসাবাড়িতে কাজ করেন। বস্তির কয়েকজন বড় ভাই দুবেলা খাবারের বিনিময়ে তাকে মাদক বহনের দায়িত্ব দিয়েছে। একই চিত্র রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পেও। সেখানে বসবাসকারী আনুমানিক ১৪ বছর বয়সি সাফিউল আলমের কাজ হলো মাদক কিনতে আসা ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট গলিতে পৌঁছে দেওয়া। প্রতিটি লেনদেনে তার আয় হয় ১০ থেকে ৫০ টাকা। অন্যদিকে নতুনবাজার-ভাটারা এলাকায় পথশিশু দুলাল মাদক পরিবহনের কাজে জড়িত। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, ‘আমি যখন না খাইয়া পথে পথে ঘুরি, তখন তো কেউ খোঁজ নেয় না। এখন কাজের সময় বিরক্ত করেন কেন?’ বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন অসংখ্য রহিম, সাফিউল ও দুলালের গল্প। রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি, পরিবহন টার্মিনাল, রেললাইনসংলগ্ন এলাকা ও নিম্ন আয়ের বসতিগুলো ঘুরে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। উদ্বেগজনকভাবে তাদের একটি বড় অংশ মাদক পরিবহন ও চোরাচালানের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশুদের সহজে সন্দেহ করা হয় না বলেই মাদক কারবারিরা তাদের ‘বাহক’ হিসেবে ব্যবহার করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাদক চোরাচালান, পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের প্রায় ২৫ শতাংশই শিশু। এদের অধিকাংশের বয়স ১৬ বছরের নিচে। কম খরচে কাজ করানো যায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়ানো সহজ হওয়ায় মাদক কারবারিদের কাছে শিশুদের চাহিদা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩৬ লাখের বেশি শিশুশ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শিশুশ্রমিকদের মধ্যে মেয়েশিশুর হার ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের পাশাপাশি শিশুদের একটি অংশ মাদক চোরাচালান, বিক্রি ও পরিবহনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। রাজধানীর মিরপুর, মগবাজার, মুগদা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় কথা বলে জানা যায়, অনেক শিশু দিনের বেলায় হোটেল, ওয়ার্কশপ কিংবা দোকানে কাজ করলেও রাতে মাদক পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয়। সামান্য অর্থের বিনিময়ে তারা জীবনের বড় ঝুঁকি নিচ্ছে। 

ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাভাবিক শৈশব থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রীর পক্ষে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানান, শিশু ও জবরদস্তিমূলক শ্রম নিরসনে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিশেষ অভিযান, আইন প্রয়োগ, মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তি এবং উদ্ধারকৃত শিশুদের পুনর্বাসন। তিনি বলেন, ছয়টি ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, শিশুর সুষম খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নির্যাতনমুক্ত জীবনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু শিশুশ্রম তাদের এসব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তিনি জানান, পূর্বের ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকার সঙ্গে নতুন কিছু কাজ যুক্ত করে শিশুশ্রম প্রতিরোধে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। আইএলও বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (অফিসার ইনচার্জ) গুঞ্জন ডালাকোটি শিশুশ্রম নিরসনের অগ্রগতিতে স্থবিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতির পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি, স্থায়ী ও টেকসই উদ্যোগ প্রয়োজন। 

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বর্তমানে শ্রম খাতের উন্নয়ন, শিশুশ্রম নিরসন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আইএলও কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২ বাস্তবায়নে কাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, শিশুশ্রম শিশুদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয় এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। শিশুশ্রম কমাতে দরিদ্র পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যদের কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আয়বর্ধক কার্যক্রম বাড়ানো গেলে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। তিনি বলেন, বাস্তবতা বিবেচনায় শিশুশ্রম এক দিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে শিশুদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা গেলে তারা ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই শিশুশ্রম ও এর সঙ্গে জড়িত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নির্মূল           করা সম্ভব।