তীব্র অর্থ সংকটে ভুগছে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, অফিস পরিচালনা এবং শহীদ পরিবার ও আহতদের সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে নতুন বরাদ্দের আশায় সরকারের সঙ্গে ফের বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বৈঠকের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে সময় চেয়েছে ফাউন্ডেশন। জুলাই ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল আকবর মানবজমিনকে বলেন, এর আগে বৈঠকের উদ্যোগ নেয়া হলেও সংশ্লিষ্টদের ব্যস্ততার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এখন নতুন করে সময় চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতেরও আবেদন করা হয়েছে। তারা ইতিবাচক উত্তর পাওয়ার আশা করছেন বলে জানান সিইও কামাল আকবর।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গঠিত হয়েছিল জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফাউন্ডেশনটি শহীদ পরিবার ও আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে সম্প্রতি বরাদ্দের অভাবে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, বর্তমানে গেজেটভুক্ত শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন। তাদের অধিকাংশকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে গেজেটভুক্ত আহতের সংখ্যা ১৫ হাজার ৪৯১ জন। এর মধ্যে ৬ হাজার ১২৭ জন আর্থিক সহায়তা পেলেও এখনো ৯ হাজার ৩৬৪ জন কোনো সহায়তা পাননি।
ফাউন্ডেশনের ভেরিফিকেশন অফিসার সাইদুর রহমান শাহিদ মানবজমিনকে বলেন, সিইও’র ব্যক্তিগত ফান্ড থেকে ধার করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এপ্রিল মাসের বেতন দেয়া হয়। মে মাসের বেতন বকেয়া পড়ে আছে। ঈদের বোনাসও দেয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ছুটির দিনে ডিউটি করেছি, বইমেলায় নিয়মিত অফিসের পাশাপাশি রাত পর্যন্ত কাজ করেছি। কিন্তু এসবের কোনো পারিশ্রমিক এখনো দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহেই মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ হচ্ছে। কখনো অডিট রিপোর্ট চাওয়া হচ্ছে, কখনো আরও সময় নেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে না।
ফাউন্ডেশনের পিআর অ্যান্ড মিডিয়া এক্সিকিউটিভ মো. জাহিদ হোসাইন জানান, টপ ম্যানেজমেন্ট অনেক বিষয়ে কাজ করছে। মন্ত্রণালয়ের মিটিং হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যতটুকু জানি সেটি শেষ পর্যন্ত হয়নি। এখনো নতুন কোনো আপডেট নেই। বিভিন্নভাবে অর্থের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। সরকারি সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারিভাবে সেভাবে সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তবে শীর্ষ পর্যায় থেকে বিভিন্নভাবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ফাউন্ডেশনে ৩৫ জন কর্মকর্তা, ২ জন কর্মচারী এবং ৫ জন স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রায় ১২ লাখ টাকা এবং অফিস ভাড়া বাবদ ২ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। গত কয়েক মাস ধরে এসব ব্যয় নির্বাহে সংকট তৈরি হয়েছে। অফিস ভাড়াও দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে।
ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল আকবর বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার ও আহতদের সহায়তার জন্য প্রায় ৩৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তহবিলে এসেছে মাত্র ১১৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অপারেশনাল কার্যক্রমের জন্য ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ পেলেও সেখান থেকেও বিভিন্ন সময়ে আহত ও শহীদ পরিবারকে সহায়তা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এক অর্থবছরের বাজেট দিয়ে আমরা দুই অর্থবছর চালিয়েছি। আরও একটা অর্থবছর চলে এসেছে। সরকার থেকে আমাদের বলা হচ্ছে- জুলাই ফাউন্ডেশনটি হচ্ছে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠান। তাই চাহিদা মতো অর্থ বরাদ্দ দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা তো সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। আমাদের কাজগুলো সরকার বিবেচনা করবে বলে আমরা আশাবাদী।
তিনি বলেন, অর্থসংকটের কারণে এপ্রিল মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে নিজের পেনশনের অর্থ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। গত মে মাস ও ঈদ বোনাসসহ কর্মীদের বেতন বকেয়া থাকলেও তা সমাধানের চেষ্টা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ফাউন্ডেশন নিয়ে কোনো নেতিবাচক অবস্থানের কথা জানানো হয়নি। আলোচনায় মূলত জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ, পুনর্বাসন, চিকিৎসাসেবা এবং এসব কার্যক্রম পরিচালনায় একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্প্রতি ফাউন্ডেশনের কর্মীদের স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করার বিষয়ে যে আলোচনা সামনে এসেছে, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফাউন্ডেশনের শুরু থেকেই অনেক কাজ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে। বর্তমান আর্থিক সংকটের মধ্যেও কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। তবে কাউকে বেতন ছেড়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে বলা হয়নি।