Image description

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দেশে নানা ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়ে এগুলেও প্রশাসনে সেভাবে কাজের গতি আসছে না। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনের পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠেছে। এর প্রভাব বইছে বর্তমান প্রশাসনেও। বিষয়টি সহজভাবে মানতে পারছেন না প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ফলে কাজকর্মেও তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ওই সময়ে পদোন্নতিবঞ্চিত অনেক কর্মকর্তা বলেন, এতে মেধাবী, দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা বাদই পড়েননি বরং রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদোন্নতির ভিত্তি হতে হবে মেধা, দক্ষতা ও সততা। পদোন্নতিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

সূত্র জানায়, গত বছরের ২০শে মার্চ সরকার বিসিএস ২৪তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের ১৩৯ জন সহ মোট ১৯৬ জন কর্মকর্তাকে উপ-সচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি প্রদান করে সরকার। নিয়ম অনুযায়ী বঞ্চিত হন দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রশাসন হলো রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ডকে সুদৃঢ় রাখতে হলে পদোন্নতির ভিত্তি হতে হবে মেধা, দক্ষতা ও সততা- কোন সরকারের আমলে কোন পদে ছিলেন তা নয়। বর্তমান সরকার যদি সত্যিকারের মেধাভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসন গড়তে চায়, তাহলে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ ও সংবিধানের নির্দেশনা মেনে প্রতিটি পদোন্নতিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জেলা প্রশাসক এবং মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর একান্ত সচিবের দায়িত্বে থাকা ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশির ভাগকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়নি। এই ব্যাচে প্রশাসন ক্যাডারের ৩৩৬ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৩৯ জন যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। পদোন্নতি পাওয়ার পর যুগ্ম সচিবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজারের কিছু বেশি। সরকারের উপ-সচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী, যুগ্ম-সচিব পদে প্রশাসন ক্যাডারের ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্যাডারের ৩০ শতাংশ কর্মকর্তাদের বিবেচনায় নিতে হয়।

বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসন ক্যাডারের ২৪ এবং ৩০ ব্যাচের পদোন্নতি দেয়া হয়। বর্তমান সরকারের সময়ে ২০তম ব্যাচকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এতে পদোন্নতি পান ১০০ জন। এর আগের ব্যাচের কর্মকর্তাসহ সর্বমোট পদোন্নতি বঞ্চিত সাত শতাধিক।

সূত্র মতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড বিসিএস ২৪তম ব্যাচের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতিবঞ্চিত উপ-সচিব এবং ২৫তম নিয়মিত ব্যাচের উপ-সচিবগণের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির জন্য সভা করছে। কিন্তু একটি উদ্বেগজনক সংবাদ সামনে এসেছে-বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক (ডিসি) অথবা মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের পদোন্নতির বিবেচনা থেকে বাদ দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত যদি কার্যকর হয়, তা হবে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮, বাংলাদেশ সংবিধান এবং মেধাভিত্তিক প্রশাসনের মূলনীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

জানা গেছে, বিসিএস ২৪তম নিয়মিত ব্যাচের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি প্রদান করা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়। বাংলাদেশের প্রশাসনের ইতিহাসে পদোন্নতির ক্ষেত্রে এরকম বৃহৎ বঞ্চনার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি বলে অভিযোগ করেন বঞ্চিত কর্মকর্তারা। পদোন্নতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যারা ডিসি, পিএস এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের সকলকে বাদ দেয়া হয়েছে। যদিও তাদের মধ্যে অনেকে অরাজনৈতিক যারা ছাত্রজীবনে কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। মেধাবী, সৎ ও দক্ষ ছিলেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রশাসনে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন এমন পরিচিত কর্মকর্তাদের ওই সময়ে পদোন্নতি দেয়া হয়নি রাজনৈতিক বিবেচনায়। যারা প্রশাসনে মেধাবী, দক্ষ ও সৎ হিসেবে পরিচিত। তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতেই হয়েছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে যারা রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাদের অনেক কর্মকর্তাকে সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, ’২৪-এর নির্বাচন ছিল একতরফা নির্বাচন যেখানে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ বড় কোনো দল অংশগ্রহণ করেনি। সেই একতরফা নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কোনো দায় নেই। নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের দেয়া দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। এমন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য সকল ডিসিদের পদোন্নতিবঞ্চিত করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকার কর্তৃক গৃহীত সকল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে আইনগতভাবে বাধ্য। অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কেউ দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছেন কিনা তা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, কিন্তু সেকারণে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা সকল কর্মকর্তাকে পদোন্নতিবঞ্চিত করলে সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি বলেন, ২৪তম বিসিএসের নিয়োগপ্রাপ্তরা ২০০৫ সালের ২রা জুলাই এবং ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ২১শে আগস্ট ২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় যোগদান করেন। সকল প্রকার যাচাই বাছাই সম্পন্ন করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, আইন এবং বিধি অনুযায়ী পদোন্নতি প্রদান করা না হলে প্রশাসনে দলীয় লেজুড়বৃত্তি বাড়বে। তিনি যুগ্ম সচিব পদোন্নতিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া মানবজমিনকে বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসনে পদোন্নতি অনেক আগ থেকেই হয়ে আসছে। এভাবে পদোন্নতি প্রশাসনের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। তিনি বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও দেখেছি রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি। কোনো সরকারই বাদ যাচ্ছে না। মেধাবী, নিরপেক্ষ, দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি হতে চান না। যার জন্য তাদের ভালো পদায়ন হয় না। পদোন্নতিও কম হয়। এ জন্য তাদের মধ্যে অসন্তোষ থাকে। রাজনৈতিক দলের অনুসারী কর্মকর্তারা দক্ষ না হয়েও পদ ও পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। ফলে প্রশাসনে কাজের গতি থাকে না। এসব কর্মকর্তারাই সরকারকে একসময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। পদোন্নতির সময় মেধাবী, দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের এগিয়ে রাখলে প্রশাসনে গতি পাবে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

প্রশাসনে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী মানবজমিনকে বলেন, প্রশাসনে সততা, দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি হবে। অন্য কোনো ভাবে নয়। যেটা আমাদের প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন।