Image description

স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খবর পড়া, বিনোদন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বিষয়ে মতামত তৈরি, সবকিছুতেই ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাব রয়েছে। তবে একজন তরুণ প্রতিদিন কত সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটাচ্ছেন, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছেন এবং এসব কনটেন্ট তার চিন্তা ও আচরণে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনও বাড়ছে।

এই জায়গা থেকেই তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং ও মিডিয়া সাইকোলজি নিয়ে কাজের সুযোগ। মানুষের প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম ব্যবহারের অভ্যাস, মানসিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক আচরণের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করাই এই ক্ষেত্রের মূল উদ্দেশ্য।

ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং বা মিডিয়া সাইকোলজি কী

সহজভাবে বললে, মানুষ ডিজিটাল মাধ্যম কীভাবে ব্যবহার করছে এবং সেই ব্যবহারের সঙ্গে তাদের চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক জীবনের সম্পর্ক কী, সেটি বোঝার চেষ্টা করা হয় এই ক্ষেত্রে।

ধরা যাক, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ করা হলো। তারা দিনে কত ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন, কোন ধরনের কনটেন্ট বেশি দেখেন, খবরের উৎস কী, রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে তাদের আগ্রহ কতটা এবং অনলাইনে পাওয়া তথ্য তাদের মতামতকে প্রভাবিত করে কি না, এসব তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। পরে সেই তথ্য পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা হয়।

 

এ ধরনের গবেষণায় শুধু মতামত সংগ্রহ করাই শেষ কথা নয়। তথ্যের মধ্যে থাকা প্রবণতা, পার্থক্য ও সম্পর্ক খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ।

কাজ করবেন কীভাবে

এই পেশায় কাজের বড় একটি অংশ হলো গবেষণা ও জরিপ পরিচালনা। প্রথমে নির্ধারণ করতে হয় কোন বিষয়ে তথ্য প্রয়োজন এবং কার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর প্রশ্নমালা তৈরি, নমুনা নির্বাচন, তথ্য সংগ্রহ এবং সংগৃহীত তথ্য যাচাইয়ের কাজ করতে হয়।

এরপর আসে ডেটা বিশ্লেষণ। কত শতাংশ মানুষ নির্দিষ্ট একটি উত্তর দিয়েছেন, কোন বয়সের মানুষের মধ্যে কোন প্রবণতা বেশি, নারী ও পুরুষের মধ্যে ব্যবহারের পার্থক্য আছে কি না কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট আচরণের সম্পর্ক রয়েছে কি না, এসব বিষয় পরিসংখ্যানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।

গবেষণার ফলাফলকে সহজে বোঝানোর জন্য প্রতিবেদন, চার্ট, গ্রাফ ও ইনফোগ্রাফিকও তৈরি করতে হয়। ফলে এই পেশায় গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং যোগাযোগ দক্ষতার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতি ও সামাজিক সচেতনতা বিশ্লেষণেও সুযোগ

ডিজিটাল মাধ্যম শুধু বিনোদনের জায়গা নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাকে ঘিরে মানুষের মতামত গঠনে অনলাইন কনটেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে তরুণরা কোন উৎস থেকে সংবাদ পাচ্ছেন, কোন ধরনের রাজনৈতিক কনটেন্ট তাঁদের কাছে বেশি পৌঁছাচ্ছে এবং সামাজিক ইস্যুতে তাঁদের আগ্রহ কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, এসব বিষয় নিয়েও গবেষণা করা সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, উন্নয়ন সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে এ ধরনের গবেষণার প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের আচরণ ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করলে নীতিনির্ধারণ ও যোগাযোগ কৌশল তৈরিতে তা সহায়ক হতে পারে।

কারা আসতে পারেন এই পেশায়

এই ক্ষেত্রে আসার জন্য নির্দিষ্ট একটি বিষয়েই পড়তে হবে এমন নয়। মনোবিজ্ঞান, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ, সমাজবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, ডেটা বিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান কিংবা উন্নয়ন অধ্যয়নের শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী এই ক্ষেত্রে কাজ করতে পারেন।

তবে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণা পদ্ধতি, জরিপ পরিচালনা, প্রশ্নমালা তৈরি এবং পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের জ্ঞান থাকা জরুরি। এসপিএসএস, এক্সেল বা অন্যান্য ডেটা বিশ্লেষণ সফটওয়্যার ব্যবহারের দক্ষতা থাকলে কাজের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়।

যে দক্ষতাগুলো গড়ে তুলতে হবে

এই পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে প্রথমেই দরকার গবেষণার মানসিকতা। কোনো তথ্য দেখেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে সেটির উৎস, নমুনা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করতে জানতে হবে। এর পাশাপাশি প্রয়োজন ডেটা বিশ্লেষণের দক্ষতা। বড় একটি তথ্যভান্ডার থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করে সেটিকে অর্থবহ ফলাফলে পরিণত করতে পারা গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো ডেটা স্টোরিটেলিং। গবেষণার ফলাফল শুধু সংখ্যার মধ্যে আটকে থাকলে তা সবার কাছে সহজবোধ্য নাও হতে পারে। তাই জটিল তথ্যকে সহজ ভাষায় প্রতিবেদন, গ্রাফ বা ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে উপস্থাপন করার সক্ষমতা থাকতে হবে।

এ ছাড়া মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নিরপেক্ষভাবে প্রশ্ন করা, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং গবেষণার নৈতিক বিষয়গুলো সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে।

ভবিষ্যতের ক্যারিয়ার হিসেবে সম্ভাবনা

ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার যত বিস্তৃত হচ্ছে, মানুষের এই ব্যবহারের ধরন বোঝার প্রয়োজনও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে যারা মানুষের আচরণ, গণমাধ্যম এবং ডেটা বিশ্লেষণ, এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে কাজে লাগাতে চান, তাঁদের জন্য ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং ও মিডিয়া সাইকোলজি হতে পারে ভিন্নধর্মী ক্যারিয়ারের একটি ক্ষেত্র।

বিশেষ করে সাংবাদিকতা বা গণযোগাযোগের শিক্ষার্থীরা যদি গবেষণা ও ডেটা বিশ্লেষণের দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে তারা প্রচলিত গণমাধ্যমের কাজের পাশাপাশি গবেষণা, দর্শক বিশ্লেষণ, সামাজিক গবেষণা ও ডিজিটাল আচরণ বিশ্লেষণের মতো ক্ষেত্রেও নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারেন।

শেষ কথা

প্রযুক্তি মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আনছে, সেটি বোঝার জন্য শুধু প্রযুক্তি সম্পর্কে জানাই যথেষ্ট নয়, জানতে হয় প্রযুক্তি ব্যবহার করা মানুষের আচরণও। সেই আচরণকে জরিপ, গবেষণা ও ডেটার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে বাস্তব চিত্র তুলে ধরার কাজই এই ক্ষেত্রকে আলাদা করে তুলেছে। মানুষের চিন্তা, গণমাধ্যম ব্যবহার ও ডিজিটাল জীবনের পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে আগ্রহীদের জন্য তাই এটি হতে পারে ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাময় গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ার।