সীতাকুণ্ড উপজেলা সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণিতে পড়ত সিরাজুম মুনিরা (৫)। ১৭ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মুনিরার বাবা নুরুন্নবী বলেন, ‘প্রায় ১০-১২ দিন মেয়ের গায়ে জ্বর ছিল। ডেঙ্গু আমার মেয়ের প্রাণ কেড়ে নিল। দুনিয়াতে শেষে এসে আমাদের সবার আগে চলে গেল।’ স্কুল, কোচিং সেন্টার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে শিশুদের ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে।
তবে শুধু স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ নয়, এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন, নির্মাণসামগ্রী কিংবা আশপাশে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় এসব স্থানে অবস্থান করায় শিক্ষার্থীদের মশার সংস্পর্শে আসতে হচ্ছে। সরকারি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান শিশু পরিচর্যাকেন্দ্র, প্রি-স্কুল ও স্কুলে মশা নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের তথ্য বলছে, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬১ হাজার ৯৭২ জন। তাদের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সি শিশু ১০ হাজার ৪৭ জন। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের প্রায় ১৬ শতাংশই এই বয়সি শিশু। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ১৮৪ জনের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সি ২৩ জনের। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু।
কোন বয়সি শিশু বেশি আক্রান্ত : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বয়সভিত্তিক হিসাবে শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সিরা। এ বয়সে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩ হাজার ৮৮০ জন। ৬ থেকে ১০ বছর বয়সি ৩ হাজার ৭৩ জন এবং ৫ বছর বা তার কম বয়সি ৩ হাজার ৯৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অর্থাৎ ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সি, যাদের বড় একটি অংশ নিয়মিত স্কুলে যায়, তাদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৯৫৩। আর পাঁচ বছর বা তার কম বয়সিদের আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৯৪। মৃত্যুর হিসাবেও শিশুদের ঝুঁকি স্পষ্ট। ৫ বছর বা তার কম বয়সি ৯ শিশু, ৬ থেকে ১০ বছর বয়সি ৭ শিশু এবং ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি আরও ৭ শিশু ডেঙ্গুতে মারা গেছে। সব মিলিয়ে ১৫ বছরের কম বয়সি ২৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্কুল-কোচিংয়ে বাড়ছে ঝুঁকি : এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বিভিন্ন ছোটখাটো জায়গা থেকে। যেমন ছাদে জমে থাকা পানি, ফুলের টব ও টবের নিচের পাত্র, ফেলে রাখা বোতল বা কৌটা, পরিত্যক্ত বালতি, নির্মাণসামগ্রী, ড্রেন, পানির ট্যাংকের আশপাশ এবং প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় থাকা বিভিন্ন পাত্র। সরকারি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনায় শিশু পরিচর্যাকেন্দ্র, প্রি-স্কুল ও স্কুলে মশা নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং বালতি বা অন্য পাত্র ব্যবহার না করলে উল্টে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফলে শুধু শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার রাখলেই হবে না; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুরো প্রাঙ্গণ, ছাদ, ড্রেন, বাগান ও আশপাশের এলাকাও নিয়মিত পরিদর্শন করা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছিলেন, মশার নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়ের অভাব আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মকাণ্ড জোরদার করতে হবে, যাতে স্কুলে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিশুরা যেন আক্রান্ত না হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কারে সরকারি নির্দেশ : ডেঙ্গুর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ২০২৬ সালের ২৫ মার্চ সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য অফিস আদেশ জারি করেছে। এর আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর আঙিনা নিয়মিত পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ স্কুল পর্যায়ে সরকারের উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার রাখা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়া।