Image description

দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার সাত মাস পেরোলেও গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল পদগুলোতে বসানোর মতো নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এ কারণে প্রশাসনের বাড়তি কাজের চাপ রয়েছে। অনেকটা গোঁজামিল দিয়ে চলছে প্রশাসন। মাঠ প্রশাসনেও শৃঙ্খলার ঘাটতি কাটেনি। নিয়মিত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় তাদের নিয়ে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। এ কারণে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

আবার নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের কাঁধে চাপানো হয়েছে একাধিক দায়িত্ব। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এক ব্যক্তির হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকায় কোনো কাজই সময়মতো ও সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না। সচিবালয়ের একাধিক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। জনপ্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব কিংবা সমমর্যাদার পদে নিয়োগের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হলেও তাদের অনেকের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষপর্যায়ের অনুমোদন মিলছে না। আবার যাদের এসিআর 

ইতিবাচক, কিন্তু প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে, তাদেরও চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। অনেকে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তারা নিয়মিত প্রতিমন্ত্রী উপদেষ্টাসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের বিষয় তুলে ধরছেন, সচিব করার বিষয়ে দাবি জানাচ্ছেন। বিগত দিনের বঞ্ছনার কথাও বলছেন। প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, সরকারের নির্দেশনার বাইরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাওয়ার সুযোগ নেই। সে হিসেবে সবাই আস্থাভাজন। কিন্তু প্রশাসনে একটা দুষ্টচক্র থাকে সবসময়ই। এই প্রশাসনিক দুষ্টচক্রের কাছের না হওয়ায় অনেকের কাজ হয় না। 

সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সচিব ও সমমর্যাদার ৯৩ কর্মকর্তার মধ্যে ১২ জনকে জনপ্রশাসনে ন্যস্ত/সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। দুই মন্ত্রণালয়ে সচিব না দিয়ে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে রাখা হয়েছে। সাড়ে ছয় বছর পর প্রশাসনে এই ভারপ্রাপ্ত সচিব পদায়ন শুরু হয় গত জুনে। সরকার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, আস্থার অভাব থেকেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন সচিবকে দুই বছর পর আবারও পুনরায় চুক্তিতে নিয়োগ দেয় সরকার। 

কিন্তু জনপ্রশাসন সচিব এহসানুল হক মন্ত্রণালয় চালাতে হিমশিম খাচ্ছিল বিধায় তাঁকে চলতি মাসে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। নতুন জনপ্রশাসন সচিবের দায়িত্ব পান মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। ভারপ্রাপ্ত সচিব দিয়ে চলা দুটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব নিয়ে বিএনপিপন্থি আমলাদের নানা প্রশ্ন রয়েছে। একাধিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় সব মন্ত্রণালয়ে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। মূলত আস্থার সংকটের কারণে এটি হয়েছে। 

এ কারণে যেকোনো কাজ সুন্দরভাবে শেষ করতেও বেগ পেতে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অতিরিক্ত সচিবের পদ ২১২টি, যুগ্ম সচিবের ৫০২টি, উপসচিবের ১ হাজার ৭৫০টি এবং সিনিয়র সহকারী সচিবের ১ হাজার ১৪৩টি পদ রয়েছে। এর বিপরীতে প্রশাসনে উপসচিব ছাড়া সব পদেই কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি আছে। জনপ্রশাসনের শীর্ষস্তরের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, অনেক দক্ষ ও বিতর্কহীন কর্মকর্তাকে একসঙ্গে দুই থেকে তিনটি পর্যন্ত দপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। 

অন্যদিকে, আস্থাহীনতার কারণে অনেক কর্মকর্তাকে কাজ থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। কাজের এই ভারসাম্যহীনতার কারণে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সূত্র জানায়, বর্তমানে সচিব বা সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক। এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনে নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে কাজ সচল রাখার চেষ্টা চলছে। তবে সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়ে এক ধরনের ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। 

প্রশাসনের এক সচিব নাম প্রকাশ না করে বলেন, অনেকেই সচিব হওয়ার যোগ্য কিন্তু কাজ করার ক্ষেত্র করে না দিলে হবে কীভাবে। দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিল এখনো তারা বঞ্চিত, এতে কষ্ট বাড়ছে। আবার এক সময়ের মায়াবতি গ্রুপের সক্রিয় নেতা বা কর্মী তারা সচিব হয়ে বসে আছে। সরকার দুই জায়গায় ভারপ্রাপ্ত দিয়ে রেখেছে কেন? আমাদের অনেকেই রোজই ঘুরছেন অথচ জনপ্রশাসন থেকে কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না। নিয়মিত ব্যচ থেকে কর্মকর্তা না দিলে সরকারের কাজে গতি আসবে না বলেন ওই কর্মকর্তা। 

সরকারের আরেক সিনিয়র সচিব বলেন, পদায়ন বিষয়টি জনপ্রশাসন খুঁজে খুঁজে সামারি (সংক্ষিপ্ত) প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর কথা। আওয়ামী সরকারের সময় বিশেষ সুবিধা নেওয়া স্বামী-স্ত্রী দুজনকে অন্তর্বর্তী সরকার সচিব করল, এখনো বহাল তবিয়তে আছে। বর্তমান প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বলেন, বর্তমান সরকার চুক্তি কমিয়ে আনতে চায়। আমরা সঠিক লোককে সঠিক জায়গায় পদায়ন করছি। বিগত ১৫ বছরে আমলাতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন রান করছে। 

অকার্যকর ও ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রশাসন ছিল; সেই ব্যবস্থাকে এখন নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বা আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার পুরোনো সংস্কৃতি থেকে প্রশাসন এখনো বের হতে পারেনি। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, প্রশাসন নষ্ট করার পেছনে মূল হলো দলীয়করণ। প্রশাসনকে দলীয়করণ ও আস্থার সংকটের বৃত্ত থেকে বের করতে না পারলে জনসেবা চরমভাবে ব্যাহত হবে।