ফিফা বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরই নয়, রবং এই মঞ্চেই অসংখ্য অবিশ্বাস্য রেকর্ড ও ঘটনার জন্ম হয়ে থাকে। যদিও ভাঙার জন্যই রেকর্ড গড়া হয়, তবে কিছু রেকর্ড এতটাই অসাধারণ যে ভবিষ্যতে সেগুলো ভাঙা প্রায় অসম্ভব বলেই ধারণা করা হয়। এমনই ১০টি বিশ্বকাপ রেকর্ড ও কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা দেখে নেওয়া যাক।
জুস্ত ফন্তেইন: এক আসরে ১৩ গোল
১৯৫৮ ফিফা বিশ্বকাপে একাই ১৩ গোল করেছিলেন ফ্রান্সের জুস্ত ফন্তেইন। আজ পর্যন্ত অটুট এই রেকর্ডটি, এর ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি কেউই। বর্তমান সময়ের তারকারা সাধারণত ৫ বা ৬ গোল করেই গোল্ডেন বুট জয় নিশ্চিত করেন। মূলত আধুনিক ফুটবলে সংগঠিত রক্ষণভাগ এবং অতিমাত্রায় কৌশলনির্ভরতায় একই আসরে এমন কীর্তি গড়া প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এজন্যই ফরাসি তারকার এই কীর্তিকে সর্বকালের সেরা ও অনন্য রেকর্ডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আর্নস্ট উইলিমভস্কি: হারানো ম্যাচে ৪ গোল
১৯৩৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য ৪টি গোল করেছিলেন পোল্যান্ডের আর্নস্ট উইলিমভস্কি। কিন্তু এরপরও সেই ম্যাচটি ৬–৫ গোলে হেরে যায় পোলিশরা। বিশ্বমঞ্চে এক ম্যাচে ৪ গোল করাটাই অসাধারণ কীর্তি, সেখানে ম্যাচ হেরেও এমন অর্জন একে আরও অনন্য রেকর্ডে পরিণত করেছে। রক্ষণাত্মক কৌশলের আধুনিক ফুটবলে এমন ঘটনা আবার দেখা প্রায় অকল্পনীয়।
পাওলো মালদিনি: ২,২১৬ মিনিটের লড়াই
অবিশ্বাস্যভাবেই এক মিনিটও মিস না করে ৪টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিলেন ইতালিয়ান কিংবদন্তি ডিফেন্ডার পাওলো মালদিনি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের মাঠে মোট ২ হাজার ২১৬ মিনিট ছিলেন তিনি, যা একটি অসাধারণ রেকর্ড। কিন্তু বর্তমানে খেলোয়াড়দের রোটেশন পলিসি, চোটের ঝুঁকি এবং তুলনামূলক ছোট ক্যারিয়ারের কারণে মালদিনির মতো এমন ধারাবাহিকতা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব।
রজার মিলা: বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা
১৯৯৪ বিশ্বকাপে ৪২ বছর ৩৯ দিন বয়সে গোল করেন ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিল্লা। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা তিনি। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৯০ বিশ্বকাপেও ৩৮ বছর বয়সে গোল করে তিনিই এই রেকর্ড গড়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে বিশ্বমঞ্চে ৪২ বছর বয়সে গোল করার মতো ঘটনা পুনরায় ঘটা প্রায় অসম্ভবই।
এসাম এল-হাদারি: সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার
২০১৮ বিশ্বকাপে ৪৫ বছর ১৬১ দিন বয়সে খেলেছিলেন মিশরের এসাম এল-হাদারি। বিশ্বমঞ্চের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে খেলার এই রেকর্ডটি অনন্য। শুধু অংশগ্রহণই নয়, একটি পেনাল্টিও সেভ করেছিলেন তিনি; যা তার কীর্তিকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছিল। আধুনিক ফুটবলে বিশ্বকাপের মতো কঠিন টুর্নামেন্টে এত বয়সে খেলা এখনো অত্যন্ত বিরল।
রাফায়েল মার্কুয়েজ: ৫ বিশ্বকাপে অধিনায়কত্ব
২০০২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচটি বিশ্বকাপে খেলেছেন মেক্সিকোর রক্ষণভাগের কিংবদন্তি রাফায়েল মার্কুয়েজ এবং দলকে নেতৃত্বও দেন। ২৩ বছর বয়সে অধিনায়কত্ব শুরু করেন এবং ৩৯ বছর বয়সেও দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। প্রায় দুই দশক ধরে দলে নিজের জায়গা ধরে রাখা এবং ছন্দ বজায় রাখা বর্তমান সময়ে অবিশ্বাস্য। আর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, ফিটনেসের চাপ এবং স্কোয়াড রোটেশনের মারপ্যাঁচে এই রেকর্ডের আশেপাশে পৌঁছানোও যেকোনো ফুটবলারের জন্য এখন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
কার্লোস আলবার্তো পেরেইরা: ৬টি বিশ্বকাপে কোচ
বিভিন্ন দেশের হয়ে মোট ৬টি ফিফা বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করেছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি কোচ কার্লোস আলবার্তো প্যারেইরা। কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল, সৌদি আরব এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের সঙ্গে কাজ করে অনন্য এক কোচিং ক্যারিয়ার গড়েন তিনি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে শিরোপা জিতিয়ে সবচেয়ে বড় সাফল্য পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে ম্যানেজার হিসেবে এই রেকর্ড বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব। এ ছাড়া এমন দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার প্রায় অদ্বিতীয় হিসেবে ধরা হয়।
পেলে: সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার মুকুট
১৯৫৮ বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে প্রথম গোল করেন ফুটবল সম্রাট পেলে। সেই আসরেই সর্বকালের অন্যতম সেরা হ্যাটট্রিক করেন। ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে শিরোপাও জেতেন ব্রাজিলিয়ান এই মহাতারকা। এত অল্প বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো চাপপূর্ণ ম্যাচে গোল করা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য কীর্তি।
ওলেগ সালেঙ্কো: এক ম্যাচেই ৫ গোল ম্যাজিক
এক ম্যাচেই পাঁচ পাঁচটি গোল, ভাবা যায়! তবে অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে অতিমানবীয় এই রেকর্ডটি গড়েন রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কো। বিশ্বকাপ ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল কীর্তি এটি এবং এখনো কেউ তা পুনরাবৃত্তি করতে পারেনি। অবাক করার বিষয় হলো- সেই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ঘণ্টা বেজেছিল রাশিয়ানদের। তবে এক ম্যাচে ৫ গোলের সুবাদে যৌথভাবে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন সালেঙ্কো। আধুনিক ফুটবলে এক ম্যাচে পাঁচ গোল করা প্রায় অসম্ভব বলে ধরা হয়।
জসিপ শিমুনিচ: এক ম্যাচেই তিন হলুদ কার্ড!
২০০৬ বিশ্বকাপে রেফারি গ্রাহাম পোলের মারাত্মক ভুলে একই ম্যাচে তিনটি হলুদ কার্ড পান ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার জসিপ শিমুনিচ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে একেবারেই বিরল এবং অস্বাভাবিক ঘটনা এটি। মূলত শিমুনিচ অস্ট্রেলিয়ান টানে ইংরেজি বলায় বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন রেফারি এবং লাল কার্ড দেখাতে ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে ভিএআর এবং প্রযুক্তির জয়জয়কারে এই ধরণের ভুল হওয়া এখন একেবারেই অসম্ভব। তাই এই ঘটনাটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত ও প্রায় অদ্বিতীয় রেকর্ড হিসেবেই থাকবে।