‘সকাল ৮টার আগেই মোবাইল ফোন হাতে বসে ছিলাম। এক সেকেন্ড দেরি করলেই টিকিট পাওয়া যাবে না জানতাম।তবু তিনবার পেমেন্টে গিয়ে আটকে গেছে। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য ভালো, টিকিট পেয়েছি।’এভাবে ঈদের ট্রেনের আগাম টিকিট কাটার অনুভূতি জানান বেসরকারি চাকরিজীবী রেজাউল ইসলাম। ঈদে সপরিবারে বাড়ি যেতে তিনি অনলাইনে রংপুর এক্সপ্রেসের টিকিট কাটার চেষ্টা করে সফল হয়েছেন।গতকাল বুধবার সকাল ৮টায় পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়। এ সময় টিকিট কাটেন রেজাউল।পশ্চিমাঞ্চলের জন্য গতকাল ১৫ হাজার ৪৩টি টিকিট একযোগে অনলাইন ও রেলস্টেশনের টিকিট কাউন্টারে ছাড়া হয়। ২৩ মে এই ট্রেন ছাড়বে।
দুপুর ২টায় ছাড়া হয় পূর্বাঞ্চলের ১৫ হাজার ৯৭৪টি টিকিট। যাত্রীরা ২৩ মে ভ্রমণের জন্য এসব টিকিট সংগ্রহ করেন।
একই অভিজ্ঞতা পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নুসরাত জাহানের। তিনি বলেন, ‘আমরা তিন বন্ধু মিলে একসঙ্গে চেষ্টা করেছি। একজনও কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের টিকিট পাইনি।ওয়েব সাইট বারবার হ্যাং করছিল। মনে হচ্ছিল যুদ্ধ করছি।’
ঈদুল আজহা সামনে রেখে ট্রেনের টিকিটের জন্য এবারও শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। রেলওয়ের তথ্য বলছে, টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে গেছে পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের আন্ত নগর ট্রেনের টিকিট। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনগুলোতে যাত্রীর চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। ঈদে সড়কপথে উত্তরবঙ্গে দীর্ঘ যাত্রায় বিশাল যানজটের আশঙ্কা থাকে বলে বলে দুর্ভোগ এড়াতে রেলপথে চাপ থাকে বেশি।
ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, টিকিট বিক্রি শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। চাহিদা বেশি থাকায় দ্রুত টিকিট বিক্রি শেষ হচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, এবার ২৩ মে ঢাকা থেকে ৪৩টি আন্ত নগর ট্রেন ছেড়ে যাবে। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে চলবে ২০টি ট্রেন। এসব ট্রেনের জন্য আসন ছিল ১৫ হাজার ২৬৬টি। সকাল ৮টায় বিক্রি শুরু হওয়ার পর প্রথম ১৫ মিনিটেই সাড়ে ১২ হাজারের বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। সকাল ৯টার মধ্যে বিক্রি হয় ১৫ হাজার ৪৩টি টিকিট। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টিকিট বিক্রির শুরুতে ওয়েব সাইটে বিপুল চাপ পড়ে। প্রথম আধাঘণ্টায় প্রায় ৬০ লাখ হিট হয়। অর্থাৎ একই সময়ে লাখো মানুষ টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করছিল।
সবচেয়ে বেশি চাপ ছিল উত্তরবঙ্গের ট্রেনগুলোতে। রংপুর এক্সপ্রেস, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, নীলসাগর এক্সপ্রেস, লালমনি এক্সপ্রেস ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের টিকিট কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। প্রতিবছরই এসব ট্রেনের টিকিটের চাহিদা বেশি থাকে। কারণ সড়কপথে যানজট ও দীর্ঘ ভ্রমণের ভোগান্তি এড়াতে অনেকে ট্রেন বেছে নেন।
উত্তরবঙ্গে ট্রেনের চাহিদা থাকলেও গত তিন বছরে এ এলাকার চারটি রুটে বাড়েনি একটি ট্রেনও। এমনকি বিশেষ ট্রেনের সংখ্যাও বাড়েনি উত্তরবঙ্গে।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার মো. কবির উদ্দিন মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২৩ মের পশ্চিমাঞ্চলের টিকিট সকাল ৯টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। দুপুর ২টায় পূর্বাঞ্চলের টিকিট বিক্রি শুরু হলে সেগুলোও এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়।’ ঈদ ঘিরে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিতে প্রতিবছর বিশেষ ট্রেন চালু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে এবার গত বছরের মতো পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেন রাখা হয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, বাড়তি চাপের তুলনায় এই সংখ্যা খুবই কম। মিরপুরের বাসিন্দা সফটওয়্যার প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, ‘টিকিট পাওয়া এখন ভাগ্যের বিষয়। চেষ্টা করেও পাইনি, কাল আবার চেষ্টা করব। স্পেশাল ট্রেন বাড়ানো দরকার ছিল। শেষ সময়ে মানুষ ছাদে উঠে যাবে, ভিড় বাড়বে।’
রেল কর্মকর্তারা বলছেন, লোকোমোটিভ ও কোচ সংকটের কারণে বাড়তি ট্রেন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে ঈদ উপলক্ষে ১০টি বিশেষ যাত্রীবাহী ট্রেন চালানো হবে। এর মধ্যে থাকবে তিস্তা স্পেশাল, চাঁদপুর স্পেশাল ও পার্বতীপুর স্পেশাল। পাশাপাশি কোরবানির পশু পরিবহনের জন্য চলবে দুটি ‘ক্যাটল স্পেশাল’ ট্রেনও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দু-তিন বছর আগেও ঈদে ৮ থেকে ১০ জোড়া স্পেশাল ট্রেন থাকত, কক্সবাজার রুটে পর্যটকদের জন্য দুটি ট্রেন দেওয়ার পর অন্য রুটে ঈদযাত্রার সময়ও ট্রেন পাওয়া যাচ্ছে না। এখন একটি নতুন রুট তৈরির সময় একই অনুপাতে তো লোকোমোটিভ ও কোচ বাড়াতে হবে, কিন্তু সেটা করা হয়নি। ঢাকা শহরে মানুষ বাড়ছে, ঈদে সবাই বাড়ি ফিরতে চায়, এ জন্য ট্রেনের চাহিদাও অনেক বেশি থাকে। কিন্তু চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যে ফারাক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা বাড়ছে।’