নির্দলীয় প্রতীকে ভোট করার আইন পাসের পর স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানে—সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ—নির্বাচনের বিধিমালা সংশোধনের কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে সব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জামানত ও নির্বাচনি ব্যয়ে সামঞ্জস্য আনতে চায় ইসি। সংশোধিত বিধিমালায় উপজেলা ও জেলা পরিষদ বাদে বাকি সব প্রতিষ্ঠানে জামানত ও নির্বাচনি ব্যয় বাড়বে। আর উপজেলায় ব্যয় কিছুটা কমতে পারে। প্রদত্ত ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে—এমন বিধান রাখা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের আগে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়াতে উপজেলা পরিষদে স্বতন্ত্র প্রার্থীর শর্ত সহজ করে জামানত ও নির্বাচনি ব্যয় বাড়িয়েছিল কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন। ২০২৪ সালের মার্চে সংশোধিত ‘উপজেলা নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ২০২৪’ জারি করে কমিশন। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ১ লাখ টাকা এবং ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৭৫ হাজার টাকা জামানত নির্ধারণ করা হয়। আগে উভয় পদে জামানত ছিল ১০ হাজার টাকা।
এ ছাড়া আগে ১ লাখ ভোটারের জন্য প্রার্থী ব্যক্তিগত ও নির্বাচনি ব্যয় করতে পারতেন সাড়ে ৫ লাখ টাকা, ১ লাখ ১ থেকে ২ লাখ ভোটারের জন্য ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং ২ লাখের বেশি ভোটার সংবলিত উপজেলার জন্য ১১ লাখ টাকা। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় অনধিক ২৫ লাখ টাকা এবং মহিলা সদস্যপদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় অনধিক ১ লাখ টাকা করা হয়।
এ ছাড়া আগে ভোটের সাড়ে ১২ শতাংশের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হতো। সংশোধিত বিধিমালায় তা ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে ওই প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।
উপজেলা পরিষদের মতো সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিধিমালা সংশোধনের কাজও শুরু করেছিল হাবিবুল আউয়াল কমিশন। একটি প্রাথমিক খসড়াও প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের কারণে তা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রস্তাবিত খসড়া বিধিমালায় সিটি করপোরেশনের মেয়রদের জামানত ২ লাখ টাকা এবং নির্বাচনি ব্যয় সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ও সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের জামানত ১ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ নির্বাচনি ব্যয় ১৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল।
তবে ইসি কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান সিটি বিধিমালা অনুযায়ী অনধিক ৫ লাখ ভোটার রয়েছে—এমন নির্বাচনি এলাকার মেয়র পদপ্রার্থীর জামানত ২০ হাজার টাকা। ভোটার ৫ লাখ ১ থেকে ১০ লাখ হলে জামানত ৩০ হাজার টাকা, ভোটার ১০ লাখ ১ থেকে ২০ লাখ হলে ৫০ হাজার এবং ভোটার ২০ লাখের বেশি হলে ১ লাখ টাকা জামানত নির্ধারিত রয়েছে।
সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ভোটার অনধিক ১৫ হাজার হলে ১০ হাজার টাকা, ১৫ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার হলে ২০ হাজার টাকা, ৩০ হাজার ১ থেকে ৫০ হাজার ভোটার হলে ৩০ হাজার এবং ৫০ হাজার ১ ও তদূর্ধ্ব ভোটারের ওয়ার্ডের জন্য ৫০ হাজার টাকা জামানত জমা দিতে হয়। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ১০ হাজার টাকা জামানত দিতে হয়।
বিদ্যমান বিধিমালায় মেয়র প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচ অনধিক ৫ লাখ ভোটারের নির্বাচনি এলাকার জন্য সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা। ভোটার ৫ লাখ ১ থেকে ১০ লাখ হলে ১ লাখ টাকা, ১০ লাখ ১ থেকে ২০ লাখ হলে ১ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০ লাখ ১ ও তদূর্ধ্ব ভোটার সংবলিত নির্বাচনি এলাকার জন্য সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। মেয়র প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় অনধিক ৫ লাখ ভোটারের নির্বাচনি এলাকার জন্য ১৫ লাখ টাকা, ভোটার ৫ লাখ ১ থেকে ১০ লাখ হলে ২০ লাখ টাকা, ১০ লাখ ১ থেকে ২০ লাখ হলে ৩০ লাখ টাকা এবং ২০ লাখ ১ ও তদূর্ধ্ব ভোটারসংবলিত নির্বাচনি এলাকার জন্য ৫০ লাখ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
কাউন্সিলর প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচ ভোটার অনধিক ১৫ হাজার হলে ১০ হাজার টাকা, ১৫ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার হলে ২০ হাজার টাকা, ৩০ হাজার ১ থেকে ৫০ হাজার ভোটার হলে ৩০ হাজার টাকা এবং ৫০ হাজার ১ ও তদূর্ধ্ব ভোটারের ওয়ার্ডের জন্য ৫০ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। নির্বাচনি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভোটার অনধিক ১৫ হাজার হলে ১ লাখ টাকা, ১৫ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার হলে ২ লাখ টাকা, ৩০ হাজার ১ থেকে ৫০ হাজার ভোটার হলে ৪ লাখ টাকা এবং ৫০ হাজার ১ ও তদূর্ধ্ব ভোটারের ওয়ার্ডের জন্য সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা ব্যয় করা যাবে।
এবারের স্থানীয় নির্বাচনগুলো দলীয় প্রতীক ছাড়াই হওয়ার কথা রয়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তার রোধ করা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে উপজেলা কমপ্লেক্সে এমপিদের জন্য নির্ধারিত ‘ভিজিটিং রুম’ ব্যবহার করে যাতে নির্বাচনে কোনো প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়ে নতুন বিধান যুক্ত করার চিন্তা করছে কমিশন।
এ ছাড়া মনোনয়ন ফরমেও বেশ কিছু পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের মতো প্রার্থীদের হলফনামায় দেশের পাশাপাশি বিদেশের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। বিধি লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণও বাড়তে পারে।
গতকাল বুধবার প্রথমবারের মতো বিধিমালা সংশোধনে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের নেতৃত্বাধীন আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটি। বৈঠকের বিষয়ে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘এটি প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। নির্দলীয় প্রতীকে ভোট করার জন্য আইন পাস হয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছি। কোন নির্বাচনের জন্য কী কী সংশোধন করা যেতে পারে, তার চিত্র তৈরি করে পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে।’
স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বিধিমালা করা হবে নাকি আলাদা আলাদা করা হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আলাদা আলাদা করব। তবে সবগুলোর মধ্যে যাতে সামঞ্জস্যতা থাকে, আমরা সেই চিন্তা করছি। এতে জামানত ও নির্বাচনি ব্যয় বাড়তে পারে। নারীদের কথাও চিন্তা করতে হবে, যাতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে।’
চলতি বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আশা করি চলতি বছরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা হবে।’
এ ছাড়া সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে মিল রেখে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন, অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থীর ন্যূনতম সমর্থন থাকার শর্ত এবং প্রচারে পোস্টার ব্যবহার বাদ দেওয়া হতে পারে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, ২০২১ সালের শুরুতে ধাপে ধাপে পৌরসভা, ২০২১ সালের এপ্রিলে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ, ২০২২ সালের অক্টোবরে এক দিনে জেলা পরিষদ এবং ২০২৪ সালে ধাপে ধাপে উপজেলা পরিষদের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোনো নির্বাচন হয়নি। তবে এরই মধ্যে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে কমিশন।
সবশেষ বগুড়া যুক্ত হওয়ায় দেশে বর্তমানে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৫০০ উপজেলা পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলার বাইরে ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৩৩০টি পৌরসভা রয়েছে। স্থানীয় সরকারের এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ এখনই নির্বাচন উপযোগী।