জামায়াতে ইসলামীর আমির ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা জাতীয় সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে জনগণের সঙ্গেই থাকব ইনশাআল্লাহ। জনগণ ও দেশের স্বার্থ সংরক্ষণই হবে আমাদের মূল দায়িত্ব। এদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেই জাতির পাশে থেকে আমরা দায়িত্ব পালন করবো।
সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে জাময়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। শপথ অনুষ্ঠানের আগে সংসদে ভূমিকা পালন সহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত নিতেই এই মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়।
জামায়াত আমির বলেন, একটি কার্যকর ও গঠনমূলক বিরোধীদল হিসেবে দুনিয়ার সভ্য দেশগুলো যেভাবে দায়িত্ব পালন করে, আমরা সেই সংস্কৃতিটা সংসদে দেখতে চাই। সংসদের দুটি অঙ্গ-একটি সরকারি দল ও আরেকটি বিরোধীদল থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বিরোধীদল যেন তার ন্যায্য কথা বলার অধিকার পায়, সেটা আমরা আশা করবো।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোটে কিছু জায়গায় কেন্দ্র দখল, এজেন্ট বের করে দেওয়া এবং কিছু বিশৃংখল আচরণ ছাড়া বাহ্যত শান্তিপূর্ণই হয়েছে। জনগণ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় ভোট দিয়েছে। সেখানে বেশ কিছু অনিয়ম হয়েছে, যা আমরা তুলে ধরছি। আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে আমরা গণতানুগতিক ধারা নয়, সুস্থধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে দায়িত্বশীল বিরোধীদলের ভূমিকা রাখতে চাই। সরকারের সব ভাল কাজে আমাদের সহযোগিতা থাকবে। তবে দেশ ও জাতির ক্ষতি হলে অবশ্যই বিরোধিতা করবো। পবিত্র কোরআনের মূলনীতি-ন্যায় কাজের সহযোগিতা ও অন্যায় কাজে বাধা প্রদানই হবে আমাদের মূলনীতি।
তিনি বলেন, আমরা সরকারি দল না বিরোধীদল সেটা বড় বিষয় নয়, জাতির স্বার্থ সংরক্ষণে কতটা আত্মনিয়োগ করতে পারবো সেটাই বড়া বিষয়।
জামায়াত আমির বলেন, দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সব স্ট্রাকচারই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হলে অবশ্যই দায়িত্ব বেশি সরকারি দলের। তাদেরকেই মূল ভূমিকা রাখতে হবে। তারা মূল ভূমিকা রাখলে রাষ্ট্রের বিকল অঙ্গগুলো সচল করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সর্বত্র ভয়াবহ বিশৃংখল হয়ে গেছে, এই জায়গাগুলোকে অবশ্যই পরিচ্ছন্ন করতে হবে।
তিনি বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব যারাই নিবেন, আমরা আমাদের দিক থেকে নৈতিক দায়িত্ব পালন করবো ইনশাআল্লাহ। আমরা তাদেরকে আশ্বস্ত করবো-দেশ ও জাতির স্বার্থে আমরা আপনাদের পাশে আছি। আমরা হাতে হাত রেখে কাজ করবো। স্বার্থ বিঘ্নিত হলে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করবো। এই পাহারাদারির মধ্য দিয়ে একটা জাতিকে আমরা কাঙ্খিত গণতন্ত্রের রাস্তায় ওঠাতে পারবো বলে আশাবাদী।
তিনি বলেন, আমরা আশাবাদীই থাকতে চাই এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে চাই। দেশে আইনশৃংখলা রক্ষা, সামাজিক বিধার রক্ষা, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করা, জনজীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণ যে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে অতীষ্ঠ, জনগণের সরকার হলে সেগুলো থেকে আমরা বের করে আনতে পারবো। যদি সরকারি দল আন্তরিকতার সঙ্গে উদ্যোগ গ্রহণ করেন, আমরা সেইক্ষেত্রে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছি।
সংসদে বিরোধীদলীয় সম্ভাব্য নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সার্বিক বিশৃংখলা থেকে জাতিকে বের করে আনা এবং জুলাইয়ের আকাঙ্খা অনুযায়ী আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করবো। জুলাইযোদ্ধাদের স্মরণ রেখে যদি সংসদ পরিচালিত হয়, আমরা আশাকরি-এই সংসদ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ। জুলাইযোদ্ধাদের ভুলে গেলে এজাতির ভাগ্যে বারবার জুলাই ফিরে আসতে পারে-আমরা এটা চাই না। আমরা চাই, জুলাই যে কারণে ফিরে এসেছে, তা যেন আর দ্বিতীয়বার তৈরি না হয়।
জামায়াত আমির বলেন, আমাদের স্বাধীন এই দেশ একসময় পাকিস্তানের অংশ ছিল। সাতচল্লিশে যারা যুদ্ধ করেছিলেন, তারাও অনেক ভাল কথা বলেছিলেন, কিন্তা তার প্রতিফলন জাতি দেখেনি। তারপরও পূর্বপাকিস্তানের সীমানা নিয়েই আমরা চলছি। কাজেই এটার ভিত রচনা হয়েছে, সাতচল্লিশে। আবার সাতচল্লিশে যারা রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তারা সেই দায়িত্ব ঠিকমত পালন করতে না পারায় যে বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ফূসে উঠেছিল, সত্তরের নির্বাচনে তার প্রতিফলন হয়েছিল। এই নির্বাচন অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল, সেটি না হওয়ার কারণে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। সেই মুক্তিযুদ্ধেও শহীদ, আহত এবং যারা লড়াই করেছিলেন, তাদের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
জামায়াত আমির বলেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ছাব্বিশের নির্বাচন হয়েছে। অতীতে এদেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার কোন পরিবেশ তৈরি হয়নি। আমরা আশাকরি, আমাদের সমবেত প্রচেষ্টায় সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলে যদি দায়িত্বশীল আচরণ করি, জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করি, তাহলে গণতন্ত্র তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে ইনশাআল্লাহ। এর কোন বিকল্প আপাতত নেই। আমাদেরকে সেদিকেই ফিরে যেতে হবে।
তবে এই পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সহজ নয়, অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। চ্যালেঞ্জ যাই থাকুক, আমরা মনে করি এটা অর্জনযোগ্য। আমাদের উভয়ের আন্তরিকতা থাকলে আমরা পারবো ইনশাআল্লাহ।
তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বিশেষ করে নির্বাচনে যারা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, এবং ভোট দিয়ে কৃতজ্ঞ করেছেন, আমরা তাদের সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, আন্তরিক শুকরিয়া এবং অভিনন্দন ও মোবারকবাদ জানাচ্ছি। দেশবাসী যে প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, নির্বাচনের ফলাফলে তার পূর্ণ প্রতিফলন হোক বা নাহোক, আমরা কথা দিচ্ছি-নির্বাচনের আগে যত কথা দিয়েছি, বিরোধীদলের অবস্থান থেকে যতটুকু পালন সম্ভব-তা বাস্তবায়নে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা তা করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবো। সেক্ষেত্রে দেশবাসীর সহযোগিতা চাই। সুদিনে-দুর্দিনে যাই আসুক, আমরা আপনাদেরও ছেড়ে যাব না, আমরা দেশবাসীর পাশেই থাকবো।
মতবিনিময় সভায় জামায়াতের নায়েবে আমির ও নবনির্বাচিত এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও এটিএম আহজারুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সহ দলের শীর্ষ নেতা এবং নির্বাচিত এমপিরা উপস্থিত ছিলেন।