Image description
 

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, নতুন সরকার গঠনের পর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো সংশয় দেখছি না। 

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির সরকার গঠনের আগের দিন সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে এনসিপি। দলটির পক্ষে আহ্বায়ক নাহিদ ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন কোনো নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই সনদ স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন নাহিদ।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো সংশয় দেখছেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না বাস্তবায়ন নিয়ে আর কোনো সংশয় আমরা দেখছি না। কারণ, এই নির্বাচনের ভিত্তিটাই হচ্ছে গণভোট এবং গণভোটের ভিত্তি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ। এই আদেশ ছাড়া নির্বাচন সম্ভব হত না এই সময়ে এই সরকারের অধীনে।

তিনি আরো বলেন, ‘ফলে যদি আমরা নেক্সট পার্লামেন্টকে কার্যকর করতে চাই, নেক্সট গভার্নমেন্টকে কার্যকর করতে চাই, তার বৈধতা হচ্ছে এই গণভোট এবং আদেশ। ফলে সেই আদেশকে মানতে হলে অবশ্যই আপনাকে গণভোটের যে গণরায় এসেছে সেই রায়কে বাস্তবায়ন করতে হবে।’

নাহিদ বলেন, নোট অব ডিসেন্টের মীমাংসা গণভোটের মাধ্যমে হয়ে গিয়েছে। গণভোটের আদেশ এবং গণভোটের প্রশ্নগুলো সেখানে কিন্তু স্পষ্টভাবেই আছে কোন সংস্কারগুলো দলগুলো তাদের ইশতেহার অনুযায়ী করবে। কোন সংস্কারগুলো সবাই ঐক্যমত হয়েছে সেটা অটোমেটিক হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, আবার কিছু সংস্কার বাধ্যতামূলক জনগণের রায়ের ওপর এটা নির্ভর করছে, যেমন উচ্চকক্ষ ভোটের অনুপাতে হবে, নির্বাচন কমিশনার সবাই মিলে যে নিয়োগ করবে এই বিষয়গুলো। ফলে গণভোটের যে প্রশ্ন–এর মধ্য দিয়ে আসলে নোট অব ডিসেন্টের পুরো বিষয়টিই মীমাংসিত হয়ে গেছে।

চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা এবং সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি করে দেয়, তা কাজে লাগাতে ২০২৪ সালের শেষে জুলাই সনদ করার দাবি তুলেছিলেন জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা।

দীর্ঘ আলোচনায় সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদ তৈরি হয়। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সেই সনদে সই করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজসহ কমিশনের সদস্যরাও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেন। পরে আরো একটি দল সনদে সই করে।

এনসিপি ঐকমত্যের সংলাপে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত সনদ সইয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি ‘স্পষ্ট’ না হওয়ার যুক্তিতে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বর্জন করে দলটি।

এছাড়া ইতিহাস ‘সঠিকভাবে না আসা’ এবং সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন নিয়ে আপত্তির কারণে বাম ধারার চারটি দল সনদে সই না করার ঘোষণা দিয়েছিল। দলগুলো হল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ।

সোমবার সেই সনদ সইয়ের পর নাহিদ বলেন, ‘জুলাই সনদে সবার শেষে স্বাক্ষর করলেও এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আমরা ছিলাম সর্বোচ্চ তৎপর।’

নিজেদের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘যে সময়টায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেটা শুধু কেবল একটি ডকুমেন্ট ছিল। এটার কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না। আমরা তো পরিষ্কার বলেছি, আমরা একটা আইনি ভিত্তি চাই। ফলে এর পরে যখন আইনি ভিত্তি দেওয়া হল, গণভোট আদেশের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ আদেশের মাধ্যমে, সে আদেশ এটার আইনি ভিত্তি দিয়েছে এবং এর পরবর্তীতে গণভোট হয়েছে গণরায় প্রতিফলিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন আমরা মনে করছি যে, যেহেতু এটা একটা আইনি ভিত্তি পেয়েছে, গণরায়ও চলে এসেছে, আমরা যে উদ্দেশে এই জুলাই জাতীয় সনদ করতে চেয়েছিলাম, সেটা সফল হয়েছে।’

নাহিদ বলেন, ‘এখন এটা আমাদের বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের দ্বিধা না থাকে–যে একটা পার্টি কেন সই করে নাই, সেটা যাতে না হয়। এই বাস্তবায়নের স্বার্থে আমরা স্বাক্ষরটি করছি।’

জুলাই সনদে এখন এনসিপির স্বাক্ষর করাটা ‘অনুষ্ঠানিকতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ।

তিনি বলেন, ‘আমরা তো গণভোটের পক্ষে, ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালিয়েছি, পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। আমরা স্বাক্ষর না করলেও হয়ত কিছু হত না। কিন্তু স্বাক্ষরটা আমরা করলাম যেহেতু একটা আনুষ্ঠানিকতা, এই অন্তর্বর্তী সরকার, ঐক্যমত কমিশন, তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এটা হয়েছে, পুরো বিষয়টাকে একটা পূর্ণতা দেওয়ার লক্ষে আমরা স্বাক্ষর করেছি।’

নতুন সংবিধানের জন্য গণপরিষদ হওয়ার প্রয়োজন থাকলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হচ্ছে–সে বিষয়টি তুলে ধরে নাহিদ বলেন, ‘গণপরিষদের জায়গা থেকে সংস্কার পরিষদে যখন এসেছে, তখন আমরা এটাকে মেনে নিয়েছি। যেহেতু অন্যান্য দল এবং একটা ঐকমত্যের স্বার্থে আমরা মনে করছি যে, সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো নিয়েই আমাদের এই সময়টাতে এগোতে হবে; এই অর্জনটুকু নিয়ে আমাদের সামনের দিকে যেতে হবে।’

জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এনসিপির প্রতিনিধিদলে মনিরা শারমিন, সারওয়ার তুষার, জাভেদ রাসিন ও জহিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।