বাংলাদেশের রাজনীতিতে পেশিশক্তির এক ক্লাসিক উদাহরণ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদ্য-সাবেক সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। শেষ পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংসদ ও দলীয় পদ হারিয়েছেন।
মিষ্টির বড় ভাই নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু ছিলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এবং ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাস ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন। অন্যদিকে মিষ্টির স্বামী সাইদুর রহমান নিউটন ছিলেন ওই এলাকারই এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। সন্ত্রাসী দলের নিজেদের মধ্যকার সংঘর্ষে একপর্যায়ে প্রাণ হারান নিউটন। রাড্ডা কাণ্ডের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে, স্বামীর মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া শূন্য জায়গা মিষ্টি নিজেই পূরণ করেছিলেন।
রাজধানীর অপরাধ জগতের অন্যতম প্রধান এলাকা মিরপুর। সেখানে খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ছিনতাই আর কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর মধ্যেই রাড্ডার এই ঘটনা মিষ্টির পেছনের ইতিহাস নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে সংসদ থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন। এরপরই বিএনপি তাদের ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়, যে কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন মিষ্টি।
বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, মিষ্টির রাজনীতিতে আসা ছাত্রজীবনেই। তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। বড় ভাই পিন্টু যখন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি, তখন মিষ্টি বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ছাত্রী সংসদের জিএস ছিলেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স টাইমসকে বলেন, ‘দুই দিনে কমিটি বাতিল ও বহিষ্কার এবং একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের মাধ্যমে দল এবং দলের বাইরেও কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।’
ছাত্রদলের রাজনীতি করার সময়েই ওয়ার্ড কমিশনার সাইদুর রহমান নিউটনের সঙ্গে তার প্রেম ও পরে বিয়ে হয়।
নিউটন ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার এবং ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। ২০০২ সালের ১০ মে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের অর্কিড প্লাজার সামনে গুলিতে নিউটন মারা যান। তার শরীরে ২২টি গুলি লেগেছিল, যা থেকে বোঝা যায় তিনি কতটা ক্ষোভ ও আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর, শাহাদাত এবং কিলার আব্বাসের দলের সঙ্গে নিউটনের বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সে সময়ে সংবাদমাধ্যমে আসা প্রতিবেদনে লেখা হয়, স্থানীয় বাজার দখল করা নিয়ে বিরোধের জেরেই ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল।
নিউটনের মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে ভোটে জিতে মিষ্টি নিজে কমিশনার হন। সেই নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি নেতা মোশারফ হোসেন মশু। মশু হলেন বিলুপ্ত হওয়া ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব সাজ্জাদুল মিরাজের বড় ভাই। অবশ্য পরবর্তীতে আরও একাধিকবার কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করলেও মিষ্টি আর জয়ী হতে পারেননি।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘তদন্তের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে চার্জশিট দেওয়া হবে। পাশাপাশি দলীয়ভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পুলিশ এবং মিরপুর বিএনপির একাধিক নেতা জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর নিউটনের ঠিকাদারি ব্যবসাসহ অন্যান্য সব ব্যবসা নিজেই দেখাশোনা করা শুরু করেন মিষ্টি। নিউটনের ঘনিষ্ঠ মানুষেরা হয়ে যান মিষ্টির অনুসারী। এই ধারাবাহিকতায় সরকারি বাংলা কলেজে ভবন নির্মাণের কাজ পায় মিষ্টির প্রতিষ্ঠান।
যুবদলের স্থানীয় একাধিক নেতা জানান, বিএনপিতে মিষ্টির অনুগত নেতাকর্মীর সংখ্যা কম নয়। ঢাকা উত্তর যুবদলের বিলুপ্ত কমিটির সদস্য সচিব মোস্তফা জললুল পাশা পাপেল, আবুল কালাম আজাদ লেলিন, জিন্নাহ, পিয়াস, হাফিজুর রহমান শুভ্র, শাহীন, পারভেজ সহ শাহ আলী, দারুস সালাম ও মিরপুর এলাকার যুবদল, শ্রমিক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদলের একটি বড় অংশ তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই লোকগুলোই মূলত মিষ্টির নির্দেশে রাড্ডা সেন্টার দখলে সামনে ও পেছনে থেকে কাজ করেছে।
রাড্ডা হাসপাতাল পুরোপুরি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সঙ্গেও মিষ্টির সরাসরি যুক্ত থাকার তথ্য এসেছে। মিষ্টি টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ২০০৪ সালে তিনি তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে এই সমিতির নামে জমি বরাদ্দের আবেদন করেছিলেন। এরপর ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি নিজে এই সমিতির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
রাড্ডা দখলের মূল নায়ক হিসেবে যার নাম আলোচনায় এসেছে, সেই হানিফ মিয়া সম্পর্কে মিষ্টির দেবর।
শাহ আলী থানা ছাত্রদলের একাধিক নেতা জানান, প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের ১০ কাঠা জমি দখলের জন্য হানিফ ও শাহ আলমসহ কয়েকজন মিলে পাপেলের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন। সব দিক সামাল দেওয়ার জন্য ১০ কোটি টাকায় লেনদেনের চুক্তি হয়। সেই অনুযায়ী ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে হামলা চালানো হয়। যার প্রতিটি বিষয় মিষ্টির জানা ছিল।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মিষ্টি অনেকটাই চুপচাপ ও নিষ্ক্রিয় ছিলেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও স্থানীয়ভাবে দলের কোনো কর্মসূচিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন না। তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেকে তখনও তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলত।
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মিষ্টি নতুন করে মিরপুর-১ নম্বরের মুক্তবাংলা মার্কেট সমবায় সমিতির সভাপতি হন, অথচ তিনি ওই মার্কেটের কোনো নিয়মিত ব্যবসায়ী নন। সম্প্রতি মুক্তবাংলা মার্কেটের ব্যবসায়ী শাহীন খানের কাছে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ পাপেল ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার একটি কল রেকর্ড প্রকাশ পায়। কিন্তু ভয়ের কারণে ওই ব্যবসায়ী থানায় অভিযোগ করার সাহস পাননি।
শুধু মুক্তবাংলা মার্কেটই নয়, ওই এলাকার আরও কয়েকটি মার্কেটে মিষ্টি ও তার লোকজনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সনি সিনেমা হলের বিপরীত পাশে থাকা মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের আসল নিয়ন্ত্রক মিষ্টির ঘনিষ্ঠরাই।
মিরপুর-১ থেকে ১০ নম্বর পর্যন্ত প্রায় সব মার্কেট ও বহুতল ভবনের সার্ভিস চার্জ, ময়লা অপসারণ, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা–সবকিছুই মিষ্টির ছায়ায় থাকা লোকজন নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা ও ফুটপাতের হকারদের ওপরও রয়েছে তাদের খবরদারি।
গাবতলী বাস টার্মিনালের টিকিট কাউন্টার, বালুঘাট এবং কাউন্দিয়ার খেয়াঘাটের চাঁদাবাজিও তাদের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি মিরপুর চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের সামনের গাড়ি পার্কিংয়ের টাকা তোলার কাজও তারাই নিয়ন্ত্রণ করে।
বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার সন্ধ্যায় টাইমসকে বলেন, রাড্ডার ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং আরও আটকের চেষ্টা চলছে। জড়িত বা সম্পৃক্তদের ব্যাপারে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। তদন্তে যে পর্যায়ের নেতা বা ব্যক্তির নাম আসবে তাকেই আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে হেডকোয়ার্টার্সের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে বলে জানান তিনি।