Image description

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুর ও দখল, ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট- পরপর দুটি আলোচিত ঘটনায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের নাম আসায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি ও মাঠপর্যায়ে দলীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। এর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, দখল ও ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও যুক্ত হয়েছে।

ফলে একদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা এসব অভিযোগকে ঢালাও ও রাজনৈতিক অপপ্রচার বলছেন, অন্যদিকে দলের ভেতরেই স্বীকার করা হচ্ছে- এভাবে বারবার দলের নাম আসায় ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত এবং দল বিব্রত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রথমে আসে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুর-১ নম্বরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে জমির মালিকানা দাবি করে একটি সমিতির সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পক্ষ থেকে স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করার অভিযোগ তোলা হয়। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, যুবদল নেতা মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেল এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার নাম উঠে আসে। তবে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে তার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।”

 

এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজ বৃহস্পতিবার শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর ও লুটপাট। ছবি:সংগৃহীত
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর ও লুটপাট। ছবি:সংগৃহীত

এদিকে, রাড্ডার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আলোচনায় আসে ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা।

 

হামলার পরপরই সালমান অভিযোগ করেন, চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে তার স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে এবং এতে বিএনপির লোকজন জড়িত।

তার স্টুডিওর এক কর্মকর্তার দাবি, প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল সেখানে ঢুকে হামলা চালায় এবং অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মালামাল নিয়ে যায়।

 

পরে সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য এ ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, “ঘটনাটি চাঁদাবাজির কারণে হয়েছে- এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ ও দখল-বেদখলের জেরেই হামলা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।”

 

দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

 

চরচাকে তিনি বলেন, “ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের একাংশের এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ ও সদিচ্ছাকে ম্লান করে দিচ্ছে।”

 

‘নাম জড়ানো হচ্ছে ঢালাওভাবে, তবুও বিব্রত’

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যে অবশ্য ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স রাড্ডা ও সালমানের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় বিএনপি ‘ক্ষুব্ধ ও বিব্রত’- এ কথা স্বীকার করলেও দুই ঘটনায় দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

 

চরচাকে তিনি বলেন, “জমিসংক্রান্ত বিরোধের ঘটনাকে কোন বাছ-বিচার ছাড়াই ‘বিএনপির চাঁদাবাজি ও দখলবাজি’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। প্রমাণ ছাড়া অপরাধের দায় বিএনপির ওপর চাপানো যাবে না। একই সঙ্গে দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তাকেও ছাড় দেওয়া হবে না।”

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি জানান তিনি।

এসব ঘটনায় বিএনপির নাম সামনে আসায় ‘দল বিব্রত’ উল্লেখ করলেও অভিযোগ অস্বীকার করে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

 

চরচাকে তিনি বলেন, “দলের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপকর্মে জড়ালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

তার ভাষ্য, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এখন বিএনপির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

 

ঘটনা শুধু দুটি নয়

রাড্ডা ও সালমানের ঘটনা আলোচনায় এলেও বিতর্কটি কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, হুমকি ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগের খবর প্রকাশ হয়েছে।

 

রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগ্রিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর। ছবি:সংগৃহীত
রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগ্রিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর। ছবি:সংগৃহীত

এসব অভিযোগের কোনটি মামলায় গড়িয়েছে, কোন ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে, আবার কোন ক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

 

রাড্ডার ঘটনার দুই দিনের মাথায় একই ধরনের আরেক ঘটনা ঘটে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় ৩৫ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যে ১৫০ থেকে ২০০ লোক নিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। হামলাকারীরা একটি কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে মালামাল সরিয়ে নেয় এবং পরে নতুন করে টিনের বেড়া দিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করে। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

ওই ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদপুর থানার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নুরুল ইসলাম ও যুগ্ম সম্পাদক নান্নুর বিরুদ্ধে। তাদের কর্মী নুর নবী দেওয়ান ও জামাল হোসেনের নামও এসেছে। তবে নুরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “হামলা ও ভাঙচুরের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।” স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নামধারী কিছু লোক এতে জড়িত থাকতে পারেন বলে তার দাবি।

 

এসব অভিযোগের সবকটিকে বিএনপি ‘রাজনৈতিক অপপ্রচার’ হিসেবে দেখলেও দলের ভেতরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতার কথায় উঠে এসেছে।

 

দেশব্যাপী চাঁদাবাজি ও দখলবাজির ঘটনায় ঢালাওভাবে বিএনপির নাম জড়ানো হচ্ছে। মিরপুরের দুটি ঘটনায় বিএনপি কতটা জড়িত, তা তদন্তের বিষয়– এমন অবস্থান জানিয়ে ওই নেতারা বলেছেন, এসব ঘটনায় দলের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং দল এতে বিব্রত।

 

সরকারও এখন দুই দিক সামলাচ্ছে

বিষয়টি শুধু বিএনপির দলীয় ভাবমূর্তির প্রশ্নে আটকে নেই; সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ অভিযোগগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিএনপির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, “রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় সরকার দুঃখিত ও বিব্রত।” তদন্তে কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাকে আইনের আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।

 

তার বক্তব্য, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব এবং অপরাধ ঘটলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।

 

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সালমানের স্টুডিওর ঘটনাকে বিএনপির বিরুদ্ধে ‘ঢালাও অভিযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলেছেন। ফলে এই ঘটনায় বিএনপির রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এখনো তদন্তের বিষয় হিসেবেই রয়েছে।

 

সরকারের একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “এসব ঘটনায় সরকার জিরো টলারেন্স নীতিই অনুসরণ করবে। সরকারের ইমেজ নষ্ট হবে– এমন কর্মকাণ্ডে কাউকেই ছাড় নয়, দলীয় হলেও নয়।”

 

প্রশ্ন এখন দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে

বিএনপির নেতারা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিকভাবে দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মনে করলেও ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের ঘটনায় দলীয় পরিচয় সামনে আসায় একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। সেটি হলো, ক্ষমতায় আসার পর মাঠপর্যায়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর?

 

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বক্তব্য স্পষ্ট– দলের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থে কেউ অপরাধ করলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হলে শুধু সাংগঠনিক সতর্কবার্তা যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।

 

আর এই জায়গাতেই বিএনপির জন্য বর্তমান বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। কোন একটি ঘটনার অভিযোগ সত্য কি না, সেটি তদন্তে নির্ধারিত হবে। কিন্তু রাড্ডা, সালমানের স্টুডিও এবং বিভিন্ন এলাকার চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগ মিলিয়ে ‘বিএনপির নাম’ বারবার সামনে আসার বিষয়টি ইতিমধ্যে দলের ভাবমূর্তির ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে– এ কথা দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও স্বীকার করছেন।

 

এখন বিএনপির সামনে তাই দুটি কাজ। একদিকে রাজনৈতিকভাবে দলকে ‘চাঁদাবাজি-দখলবাজির দল’ হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ মোকাবিলা করা। অন্যদিকে, সত্যিই কোনো দলীয় নেতা-কর্মী জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া। এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়বে, ততই মাঠের কোন বিচ্ছিন্ন অপরাধের দায় শেষ পর্যন্ত এসে পড়বে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর।