Image description

জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীরা। গত ২১ মে থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত প্রায় দুই মাসে দলটির অন্তত সাতজন নেতা খুন হয়েছেন। কোথাও প্রকাশ্যে গুলি, কোথাও কুপিয়ে বা ছুরিকাঘাতে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বেশিরভাগ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক, জমি কিংবা স্থানীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বের তথ্য পাওয়া গেছে।

ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড সেই অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীদের হামলা, ভাড়াটে খুনির ব্যবহার এবং স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রাণঘাতী হয়ে ওঠায় জননিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বিএনপি বলছে, স্থানীয় পর্যায়ের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে দলীয় সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগ পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে, পুলিশ এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক কোন্দলসহ বিভিন্ন স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবে দেখছে। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে।

মিঠামইনে ভাড়াটে খুনি

সর্বশেষ, গত ১৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে বিএনপি নেতা জাহিদুল আলম ওরফে জাহাঙ্গীরকে (৫২) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার ব্যক্তিরা পেশাদার খুনি এবং হত্যাকাণ্ড ঘটাতে তিন দিন আগে ঢাকা থেকে মিঠামইনে গিয়েছিল।

ঘটনার দিন মিঠামইন সদর বাজার থেকে বিএনপি কর্মী হাদিস মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন জাহিদুল। বেড়িবাঁধ এলাকায় তার বাগানবাড়ির সামনে পৌঁছালে তিন ব্যক্তি চাপাতি নিয়ে হামলা করেন। তাকে বাঁচাতে গেলে হাদিস মিয়াও আহত হন। তিনি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

হামলার পর স্থানীয়দের সহযোগিতায় একজনকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয়। পরে জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে আরও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। কার নির্দেশে এবং কী উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।

একই দিন রাতে নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় মাদকসেবনের প্রতিবাদ করায় মো. ফারুক ওরফে শহীদ (৫০) নামে এক বিএনপি নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। তিনি সুন্দলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক এবং স্থানীয় তেঁতুলতলা বাজারের ব্যবসায়ী ছিলেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুই যুবককে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন স্থানীয়রা।

বেপরোয়া হত্যাকারীরা

গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার একটি বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫) হত্যা করা হয়। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, দুপুরে একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাসুদুল। তখন সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা পাঁচ থেকে সাতজন অস্ত্রধারী তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এর আগের দিন, ১২ জুন খুলনার লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামকে (৩৫)। ‘ঢাকাইয়া রফিক’ নামে পরিচিত রফিকুল বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

৯ জুন রাতে বাগেরহাটের ফকিরহাটে কৃষক দলের নেতা বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় স্থানীয় বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ মোড়ল আহত হন। বাদল বারুইপাড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি এবং আবদুল্লাহ একই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি।

একই রাতে রাজধানীর রমনার মৌচাক এলাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের রমনা থানার সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন তালুকদার (৪৫)।

এর আগে ২১ মে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জমির মাটি কাটা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে বিএনপি নেতা ওসমান গণিকে (৪০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিএনপি একটি বড় দল। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ইস্যুতে নেতাকর্মীরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে পারেন। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর প্রকাশ পেলেও এগুলো দলীয় সিদ্ধান্ত বা নীতির কারণে ঘটছে না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।”

পুলিশ বলছে ‘টার্গেট কিলিং’ শনাক্ত করা কঠিন

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাজনৈতিক বিরোধসহ নানা কারণে কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।”

তিনি বলেন, “টার্গেট কিলিং আগে থেকে বোঝা কঠিন। তবে সরকারের কঠোর নির্দেশনায় পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে।”

রাজনৈতিক কোন্দলকে পুরোনো সমস্যা উল্লেখ করে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও দলের কিছু নেতাকর্মী নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়াচ্ছেন। সহনশীলতা থাকলে অনেক ঘটনা এড়ানো যেত। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান চলছে। কয়েক হাজার অপরাধীকে গ্রেফতার এবং বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এরপরও কিছু অবৈধ অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে রয়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “দেশের সব থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন দলের, তা বিবেচনা না করে মামলা নিতে ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পুলিশের নিরপেক্ষতা যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয় এবং কারও সঙ্গে পক্ষপাতমূলক আচরণ না করা হয়, সে বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের দীর্ঘদিনের প্রবণতা রয়েছে। কোনও দল ক্ষমতায় এলে পদ-পদবি, প্রভাব, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং অপরাধ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ঘিরে দলের ভেতরে ও বাইরে সংঘাত তৈরি হয়।

তার মতে, রাজনৈতিক কর্মীদের একাংশের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে, দল ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগতভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই ধারণা পরিবর্তন করতে হবে।

ড. তৌহিদুল হক বলেন, “রাষ্ট্র কোনও একক দলের সম্পত্তি নয়। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যারা হামলা, হত্যা বা সন্ত্রাসে জড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতি এখনও অনেকটাই পেশিশক্তিনির্ভর। ক্ষমতাসীন দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজ নিজ এলাকা ও প্রভাববলয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তুতি নেয়। চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ও আর্থিক স্বার্থ রক্ষায় কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা হুমকি মনে হলে হামলা, এমনকি হত্যাকাণ্ডও ঘটে। এখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্বই বড় হয়ে ওঠে।”

তিনি বলেন, “ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবের কারণে অপরাধীরা বিচারের বাইরে থাকলে তারা আরও আগ্রাসী ও সহিংস হয়ে ওঠে। বারবার বিচার এড়িয়ে যাওয়ায় অপরাধ তাদের কাছে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়।”

অধ্যাপক রেজাউল করিমের মতে, কোন গোষ্ঠী রাজনৈতিক সহিংসতায় উৎসাহ দিচ্ছে, কারা অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে এবং কোন এলাকায় কী ধরনের অপরাধী নেটওয়ার্ক সক্রিয়—এসব তথ্যভিত্তিকভাবে চিহ্নিত ও ম্যাপিং করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।