Image description
বদরগঞ্জের যমুনেশ্বরী নদী

রংপুরের বদরগঞ্জে যমুনেশ্বরী নদী থেকে প্রতিরাতে মিলেমিশে প্রায় ১০ লাখ টাকার বালু লুট করছে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় একটি সিন্ডিকেট। ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, নদীভাঙনও তীব্র হচ্ছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বালু লুট নিয়ে প্রশাসন অসহায় হয়ে পড়েছে। বারবার মামলা ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়েও অবৈধ বালুমহাল বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সরেজমিন বুধবার বদরগঞ্জের অরুন্নেছা-নাগেরহাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাকা সড়কের পাশেই অবস্থিত কুতুবপুর সোটাপীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একশ মিটার উত্তর দিকেই গড়ে উঠেছে দুটি অবৈধ বালুমহাল। সেখানে অফিস খুলে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত তোলা হচ্ছে বালু। শুধু তাই নয়, যমুনেশ্বরী নদীর তিন কিলোমিটারজুড়ে বড় বড় বালুমহাল রয়েছে তিনটি। আর ১০টি রয়েছে মিনি (ছোট) বালুমহাল। এগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকার বালু লুট করে নিচ্ছে প্রভাবশালীরা।

রাতের আঁধারে কৌশলে বালু লুট : যমুনেশ্বরীর তীরে সন্ধ্যা নামার আগেই ট্রাক্টর ও বড় বড় ডাম্প ট্রাকের আওয়াজ তীব্র হতে থাকে বালুমহাল এলাকায়। বালু উত্তোলনের মেশিন দিয়ে নদীর বুক কেটে তোলা হয় বালু। সকালে আলো ফোটার আগ পর্যন্ত সারা রাত ধরে চলে লুট কার্যক্রম। বালু বিক্রির জন্য ঘর তৈরি করে দলের নেতার পোস্টারও ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে কোথাও।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন বালু বিক্রির মোটা অঙ্কের টাকার ভাগ চলে যায় নেতাদের পকেটে। এ কারণে প্রশাসন চাইলেও শক্ত অবস্থানে যেতে পারছে না। স্থানীয় ইউপি সদস্য ফারুক মিয়া বলেন, বালু লুটকারীরা প্রশাসনকে তোয়াক্কা করে না। ভাঙা জুম্মা গ্রামের বাসিন্দা খন্দকার মোস্তাফিজার জানান, সড়কে বালু পড়ে রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আগে নদী যে পথে প্রবাহিত হতো, সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। নদীভাঙন বেড়ে আবাদি জমি ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মিলেমিশে ভাগবাঁটোয়ারা : স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা এই বালু লুটের সঙ্গে জড়িত। তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় এ নিয়ে কেউ কথা বলার সাহস পায় না।

সরেজমিন দেখা গেছে, শতাধিক শ্রমিকের উপস্থিতিতে সারি সারি ডাম্প ট্রাকে ও ট্রাক্টরে বালু বোঝাই করা হচ্ছে। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে বালুমহালের নিয়ন্ত্রণকারী উত্তরপাড়া এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য ইকরামুল হকের ছেলে এনামুল হক, লাভলু মিয়া ও জাহিদুল ইসলামসহ কয়েকজন এগিয়ে আসেন। তারা খবর প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে এই প্রতিবেদককে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও বিএনপির ওই ইউনিয়ন কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি মাহবুবার রহমান সবুজ, ওহিদুল হক, সহসাধারণ সম্পাদক ইলিয়াছ আলী ও সাধারণ সম্পাদক রশিদুল ইসলাম লেবু ওই সিন্ডিকেটে রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় জামায়াত নেতার পরিচয়ে বদরগঞ্জের মধুপুর ইউনিয়নের সামছুল ইসলাম, কুতুবপুর অরুনেচ্ছার জাহাঙ্গীর আলম, সোনারপাড়ার জাহাঙ্গীর মিয়া সোনা বালু লুট করছে। এছাড়া যুবদল নেতা সোহাগ মিয়া, জাতীয় পার্টির সোনারপাড়ার রুবাইয়েত ইসলাম, কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম আজাদের ছেলে চান্দ মিয়া এই সিন্ডিকেটে সক্রিয়। এমনকি প্রশাসনের তালিকায় নাম থাকলেও তাদের কেউ কিছু করতে পারছে না।

পুলিশ ও অভিযুক্তদের বক্তব্য : অভিযুক্ত কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রশিদুল ইসলাম লেবু বলেন, ‘আমি বা যুবদলের কেউ এই অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত না।’ মধুপুর ইউনিয়নের সামছুল ইসলাম বলেন, ‘আমি জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত নই। বালু কারাবারিদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’ আরেক অভিযুক্ত রুবাইয়েত ইসলাম বলেন, ‘আমি জাতীয় পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বালু বিক্রির সঙ্গে সম্পর্ক নেই।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু উত্তোলনের সঙ্গে পুলিশও জড়িত। তাদের দাবি, প্রতি সপ্তাহে ৫০ হাজার টাকা নেয় পুলিশ। তবে বদরগঞ্জ থানার ওসি হাসান জাহিদ সরকার টাকা খাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, নিয়মিত অভিযান চালালেও কাজ হচ্ছে না। তার দাবি, একটি চক্র পুলিশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনজুমান সুলতানার মুঠোফোনে কল দিলে তিনি বলেন, ‘এই অবৈধ বালু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বদরগঞ্জে বালু লুটে জড়িতদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মামলা হয়েছে।’