Image description

প্রতিটি গণ-আন্দোলনের কতগুলো নিজস্ব ভাষা, স্লোগান ও প্রতীক থাকে। সেগুলো আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের স্লোগানেও ভেসে উঠেছিল জনতার কণ্ঠস্বর। তবে অতীতের সব স্লোগান ছাপিয়ে গেছে চব্বিশের আন্দোলনের স্লোগানগুলো। আন্দোলনের মাঠে ক্ষণে ক্ষণে উচ্চারিত এসব স্লোগান গণ-আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। প্রতিটি স্লোগানেই রয়েছে সৃজনশীলতার ছাপ। জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন রাজপথের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তৈরি করে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। স্লোগানগুলো আসলে একেকটি বারুদে পরিণত হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিকেন্দ্রীভূত চরিত্র। কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের প্রচলিত ভাষা বা স্লোগানের পরিবর্তে আন্দোলনকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ, স্বপ্ন ও প্রতিবাদকে নতুন ভাষায় প্রকাশ করেছেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই অসংখ্য স্লোগান, গান, গ্রাফিতি, মিম ও প্রতীক ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

কোটা আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থান : শুরুতে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল কোটা সংস্কার। তখন রাজপথে বেশি শোনা যেত ‘কোটা না মেধা? মেধা, মেধা’, ‘দফা এক দাবি এক, কোটাপ্রথার বিলুপ্তি’ এবং ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগান। এসব স্লোগানে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই উঠে এসেছে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাও। কিন্তু ১৪ জুলাই রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সেদিন রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে জন্ম নেয় আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত স্লোগান-‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার। কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’-এসব স্লোগান মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ছাত্র-জনতার এই পালটা উচ্চারণ আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

আবু সাঈদ ও মুগ্ধ স্লোগানের নতুন অনুপ্রেরণা : রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি হয়ে ওঠে প্রতিরোধের প্রতীক। তার স্মৃতিকে ঘিরে জন্ম নেওয়া ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’ স্লোগানটি সর্বত্রই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় আন্দোলনকারীদের পানি বিতরণ করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তার মৃত্যুর পর ‘পানি লাগবে, পানি’ বাক্যটি পরিণত হয় আন্দোলনের আবেগঘন এক স্লোগানে। মুগ্ধর ছবি এবং এই স্লোগান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক, পোস্টার, দেওয়াললিখন এবং মিছিলের প্রতিবিম্বে। একই সময়ে রাজপথে ধ্বনিত হতে থাকে ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’ এবং ‘আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকে গুলি করে’।

‘বিকল্প, বিকল্প’ থেকে ‘এক দফা’ : জুলাইয়ের শেষদিকে আন্দোলন কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই-দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এই বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করে রাজপথে উচ্চারিত হতে থাকে ‘তুমি কে? আমি কে? বিকল্প, বিকল্প।’ এরপর আন্দোলনের লক্ষ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে সরকার পরিবর্তনের দিকে। রাজপথে তখন শোনা যায় ‘আপস না সংগ্রাম? সংগ্রাম, সংগ্রাম’, ‘দালালি না রাজপথ? রাজপথ, রাজপথ’, ‘দেশটা কারও বাপের না’ এবং ‘ভয় পেলে তুমি শেষ, রুখে দাঁড়ালে বাংলাদেশ’। আগস্টের শুরুতে আন্দোলন একদফা দাবিতে রূপ নিলে স্লোগানও হয়ে ওঠে আরও স্পষ্ট। ‘এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড়’, ‘দফা এক দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ এবং ‘এক দফা, এক দাবি, স্বৈরাচার তুই কবে যাবি’-এসব স্লোগান আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

নতুন শব্দে নতুন আন্দোলন : প্রথাগত ‘অবরোধ’ বা ‘হরতাল’-এর পরিবর্তে আন্দোলনকারীরা ব্যবহার করেন ‘বাংলা ব্লকেড’ শব্দটি। দেশব্যাপী সড়ক ও রেলপথ অবরুদ্ধ করার এ কর্মসূচি জনপ্রিয়তা পায় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচনায় আসে। আবু সাঈদ হত্যার পর ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দেয়। আবার কঠোর পুলিশি দমন-পীড়নের মধ্যে আন্দোলনকারীরা ‘ফ্ল্যাশ মব’ কর্মসূচির মাধ্যমে হঠাৎ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ ও স্লোগান দিয়ে দ্রুত সরে যেতেন। ‘মার্চ ফর জাস্টিস’, ‘রিমেম্বারিং দ্য হিরোজ’, ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’, ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ বা ‘মার্চ ফর ঢাকা’-এসব নামও আন্দোলনের ভাষাকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। এসব শব্দ শুধু কর্মসূচির নাম ছিল না; বরং আন্দোলনের রাজনৈতিক বার্তা ও লক্ষ্যকেও বহন করেছে।

ডিজিটাল প্রতিরোধের ভাষা : আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার। আন্দোলনকারীদের আহ্বানে লাখো মানুষ নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলের ছবি লাল করে ‘লাল প্রোফাইল’ কর্মসূচিতে অংশ নেন। পরে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও দমন-পীড়নের প্রতিবাদে দেখা যায় ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট’-এর মতো প্রতীকী কর্মসূচি। একই সঙ্গে দেওয়াললিখন, গ্রাফিতি উৎসব, মিম সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল পোস্টারের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের শহর ও ক্যাম্পাসে। রাজপথের পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতেও গড়ে ওঠে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ।

ইতিহাসে আলাদা স্থান : বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মতো ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এর ভাষা, প্রতীক ও সংগঠনের ধরন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব, ফেসবুকে তার ব্যাপক ব্যবহার এবং জেন-জি প্রজন্মের সৃজনশীল শব্দচয়ন আন্দোলনটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। রাজনৈতিক ইতিহাসে স্লোগান সব সময়ই জনগণের আবেগ, ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষার ভাষা হয়ে এসেছে। কিন্তু জুলাই আন্দোলন দেখিয়েছে, শুধু স্লোগান নয়-নতুন শব্দ, নতুন প্রতীক এবং নতুন ভাষাও একটি আন্দোলনকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। সে কারণেই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং তার অভিনব ভাষা ও সৃজনশীল প্রকাশভঙ্গির জন্যও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব লুৎফর রহমান বলেন, নতুন ভাষা জুলাই আন্দোলনের শক্তি ছিল, যা তরুণদের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করেছিল। তার মতে, ‘বাংলা ব্লকেড’, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এবং ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না’-এর মতো স্লোগান তরুণদের ভাবনা ও প্রতিবাদের প্রতিফলন। শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ওই স্লোগানটি লেখা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। পরে তিনি ‘আবু সাঈদ, মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’ স্লোগানটিও লেখেন, যা এখনো আন্দোলনের চেতনা বহন করছে। জুলাই মেমোরিজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সিলমী সাদিয়া বলেন, ‘আমরা প্রায় ১০ হাজার গ্রাফিতি ও দেওয়াললিখনের ছবি সংরক্ষণ করেছি। আন্দোলনের সময় এসব লেখা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে। স্লোগান, গান, কবিতা ও গ্রাফিতির মধ্য দিয়েই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভাষা ও চেতনা প্রকাশ পেয়েছিল। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এসবের একটি সুসংগঠিত আর্কাইভ সংরক্ষণ জরুরি।’