Image description
বরিশালের ওয়াকফ সম্পত্তি

বরিশালে ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে দান করা ওয়াকফ সম্পত্তির প্রকৃত আয় গোপন করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব চলছে। অনুসন্ধানে জেলার অধিকাংশ নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তিতে মিলেছে এই চিত্র। প্রশাসনিক দুর্বলতা, বছরের পর বছর ভাড়া পুনর্নিধারণ না করা এবং কার্যকর তদারকির অভাবে কোটি টাকার সম্পত্তি থেকে আদায় হচ্ছে নামমাত্র রাজস্ব। একই সঙ্গে নজরদারির অভাবে বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখল হলেও সেগুলো রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

ওয়াকফ কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. জহুরুল হক শাহিন মনে করেন, সংকটের বড় কারণ জনবলের অভাব। তার ভাষ্য-বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর এই চার জেলার সব ওয়াকফ সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বে তিনি একাই রয়েছেন। অডিট ও তদারকি করা তার একার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

ওয়াকফ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বরিশালে বর্তমানে ৪৫১টি ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ১২০টি নিবন্ধিত সম্পত্তি। চলতি অর্থবছরে এসব সম্পত্তি থেকে রাজস্ব পাওয়া গেছে ৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা। এখনো প্রায় ৩১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে।

নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নগরীর শেরেবাংলা শামসুনন্নেছা খাতুন ওয়াকফ সম্পত্তির বকেয়া প্রায় ১৩ লাখ ২৭ হাজার টাকা এবং ফলপট্টি ও রূপাতলী এলাকার নাছিরউদ্দিন হাওলাদার ওয়াকফ সম্পত্তির বকেয়া ৫ লাখ টাকারও বেশি।

সদর রোডের আব্দুর রাজ্জাক ওয়াকফ সম্পত্তিটি মানুষ চেনে হোটেল গুলবাগ নামে। প্রায় ১৫ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত চারতলা ভবনটিতে একটি আবাসিক হোটেল, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং নিচতলায় আটটি বাণিজ্যিক দোকান রয়েছে। অথচ সরকারকে বছরে রাজস্ব দেওয়া হয় মাত্র ৩৮ হাজার টাকা।

ওয়াকফ বিধিমালা অনুযায়ী, মোট বার্ষিক আয়ের ৫ শতাংশ সরকারকে রাজস্ব হিসাবে জমা দিতে হয়। সেই হিসাবে সরকারি নথিতে এই সম্পত্তির বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে মাত্র সাড়ে ৭ লাখ টাকা। কিন্তু ভবনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকার বেশি আয় হয়। সে হিসাবে বছরে আয় প্রায় অর্ধকোটি টাকা। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি যেন ‘আল্লাহর রাস্তায় দান করা সম্পত্তি থেকে সাগর চুরি’।

জানা গেছে, এই ওয়াকফ সম্পত্তির মোতাওয়াল্লি বরিশাল জেলা প্রশাসক। বিধি অনুযায়ী তিনিই সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ, আয়-ব্যয়ের হিসাব ও নির্ধারিত খাতে অর্থ ব্যয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। জানা গেল, এই সম্পত্তির আয়ের বড় একটি অংশ ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হচ্ছে।

তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। এখন জানলাম, খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ আব্দুর রাজ্জাক ওয়াকফ সম্পত্তির ওয়ারিশ আব্দুল জব্বার জানান, ‘জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আমাদের যে ভাড়ার টাকা জমা হয় সেটা থেকেও আমরা বঞ্চিত।’

একই চিত্র দেখা গেছে সুজন খা ওয়াকফ সম্পত্তিতেও। নগরীর আমিরকুটির, কালুশাহ সড়কসহ মোট ৬ একর ২৫ শতাংশ জমি ওয়াকফ করা হয়েছে। পাঁচতলা ভবন রয়েছে। এই সম্পত্তি থেকে সরকারকে বছরে ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা রাজস্ব দেওয়া হয়। অথচ পুরো সম্পত্তি থেকে বছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকার বেশি আয় হওয়ার তথ্য মিলেছে। মোতাওয়াল্লি এনায়েত হোসেন খান নামমাত্র রাজস্ব পরিশোধ করছেন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন কর্ণকাঠী এলাকার সাধু মোল্লা ওয়াকফ সম্পত্তির ৯০ একর জমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়া। মাত্র ১৭ হাজার টাকা রাজস্ব দেওয়া হয়। মোতাওয়াল্লি মোল্লা হারুন অর রশীদ বলেন, তিনি নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছেন।

নগরীর নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকার মেহেরুল্লা ওয়াকফ স্টেটের মোতাওয়াল্লি মতিয়ার রহমান সরকারকে বছরে মাত্র তিন হাজার টাকা রাজস্ব পরিশোধ করছেন।