Image description
বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের প্রথম সাবমেরিন কেবল প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক দুই পরাশক্তির লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বেসরকারি এই কেবল প্রকল্পে চীনা কোম্পানির সংশ্লিষ্টতা থাকায় আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ‘আনট্রাস্টেড’ উল্লেখ করে তারা বলছে, এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি গুপ্তচরবৃত্তি ও ডেটা চুরির আশঙ্কাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন ঘোষণার মাঝেই প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে চাপ দিচ্ছে চীন। এমন প্রেক্ষাপটে কোন ঘাটে তরী ভেড়াবে তা নিয়ে দোটানায় পড়েছে বিএনপি সরকার। কেবল স্থাপন প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া এখন নবীন এ সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রের নিচ দিয়ে নিয়ে যাওয়া অপটিক্যাল ফাইবার তারগুলো এখন আর শুধু ইন্টারনেট ডেটা আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়।

এগুলো এখন বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ, ভূরাজনীতির নিয়ামক ও জাতীয় নিরাপত্তার বড় হাতিয়ার। আর এ কারণেই প্রতিটি দেশ বিষয়টি নিয়ে খুব সতর্কতা অবলম্বন করে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবে পাওয়া লাইসেন্সের মাধ্যমে গঠিত বেসরকারি খাতের সাবমেরিন কেবল প্রকল্প ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ ঘিরে তৈরি হয়েছে এমন জটিল পরিস্থিতি। একদিকে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেবল স্থাপনের কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করতে চাইছে দেশীয় তিনটি প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রকল্পটি বন্ধের জন্য বাংলাদেশকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বারবার সতর্ক করছে। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে আটকে রয়েছে অনুমোদন। এই টানাপোড়েনের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক তৎপরতা। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কাজটির দ্রুত অনুমোদনের জন্য চিঠি দিয়েছে চীনা দূতাবাস।

চীন দাবি করছে, কিছু ‘বাহ্যিক কারণ’ এবং ‘অ-ব্যবসায়িক বিবেচনা’ এই প্রকল্পের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত বাহ্যিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানিয়েছে চীন। পক্ষান্তরে চীনের এই তৎপরতা কিছুতেই মেনে নিতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) সাবমেরিন কেবলে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার রুখতে নতুন ও কড়া নিয়ম আনতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রকল্পটিকে আরও বড় অনিশ্চয়তায় ফেলেছে এই পদক্ষেপ।

কালবেলার অনুসন্ধানে পাওয়া চিঠিপত্র, সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের তথ্য এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সমুদ্রের নিচের এই তার স্থাপন এখন আর সাধারণ কোনো ব্যবসা নয়, বরং ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রযুক্তি যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টলাইন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যান্ডউইথ আমদানির জন্য ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার বেসরকারি খাতের তিন প্রতিষ্ঠান সামিট কমিউনিকেশন, মেটাকোর এবং সিডিনেটকে আলাদা সাবমেরিন কেবল লাইসেন্স দেয়। পরে ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য তারা যৌথভাবে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ নামে কনসোর্টিয়াম গঠন করে। এই কনসোর্টিয়ামের চলমান সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার হিসেবে মূল কেবল ‘সিগমার (সিঙ্গাপুর-মিয়ানমার)’ নির্মাণ করছে চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হুয়াওয়ে মেরিন নেটওয়ার্ক’ (এইচএমএন)।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া সিগমার সাবমেরিন কেবলটি প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ফাইবার-অপটিক কেবল। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্যাম্পানা গ্রুপের মালিকানাধীন এই কেবলের দুটি ল্যান্ডিং পয়েন্ট—সিঙ্গাপুরের টুয়াস এবং মিয়ানমারের থানলিন। সামিট, সিডিনেট ও মেটাকোর প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ব্রাঞ্চ কেবল তৈরি করতে চায়, যা সিগমার কেবলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। বর্তমানে এই কেবল ‘ইউএমওও’ নামে পরিচিত।

সাবমেরিন কেবলে চীনা সম্পৃক্ততায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল আপত্তি। এই সাবমেরিন কেবলের প্রযুক্তিগত কার্যক্রমে চীনা প্রতিষ্ঠানকে ‘আনট্রাস্টেড’ উল্লেখ করে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একাধিকবার অনানুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল বিভিন্ন সময় কয়েক দফা ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না করার অনুরোধ জানায়।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা থেকে চীনের প্রভাব দূর করতে এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র চালু করে ‘ক্লিন নেটওয়ার্ক প্রোগ্রাম’, যার লক্ষ্য ছিল চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান—বিশেষ করে হুয়াওয়েকে বৈশ্বিক যোগাযোগ অবকাঠামোয় প্রভাব বিস্তার থেকে বিরত রাখা। ‘ক্লিন কেবল ইনিশিয়েটিভ’ অনুযায়ী, চীন বা হুয়াওয়ে-সংশ্লিষ্ট কোনো সাবমেরিন কেবলকে মার্কিন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে দেওয়া হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাষ্ট্রগুলোকেও এ সংক্রান্ত নীতি গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়। এরই মধ্যে ৫৫টি দেশ এই নীতির আওতায় যুক্ত হয়েছে। অনেক দেশ অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে হুয়াওয়ের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলেও সাবমেরিন কেবল বা কোর নেটওয়ার্কে চীনা প্রযুক্তি বাদ দিয়েছে।

সাবমেরিন কেবল কৌশলগত সম্পদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে বৈশ্বিক ডেটা ও আর্থিক লেনদেন হয়। এটি ক্রটিপূর্ণভাবে স্থাপন হলে বা প্রকল্পে অনিয়ম হলে তৈরি হয় নিরাপত্তা ঝুঁকি। জাতীয় সাইবার প্রতিরক্ষায় প্রভাব পড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সম্প্রতি রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন (এফসিসি) সমুদ্রের নিচের কেবলে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার আরও কঠোরভাবে বন্ধ করতে নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোনো চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে, সেই কেবল মার্কিন ডাটা ট্রাফিকের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না। বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ ইন্টারনেট ডাটা সমুদ্রের নিচের তার দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এই খাতকে মার্কিন প্রশাসন তাদের নিরাপত্তার বড় ঢাল বলে মনে করছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্প এলাকাসহ সমুদ্রপথের পরিদর্শন, জরিপ এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রস্তুতি শেষ হলেও সাবমেরিন কেবল স্থাপন কার্যক্রমের অনুমোদন দেওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। কেবল স্থাপনের কাজ শুরু করতে বারবার চিঠি চালাচালি করা হলেও সাড়া দেয়নি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের গুরুত্ব উল্লেখ করে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বারবার অনুমোদন চাওয়া হলেও মন্ত্রণালয়গুলো সায় দেয়নি। এমনকি ইতিবাচক সাড়া মেলেনি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) কাছে থেকেও।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যবও বিষয়টি স্বীকার করে কালবেলাকে বলেছিলেন, বেসরকারি সাবমেরিন কেবল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক আপত্তির বিষয়টি সত্য। তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, আনট্রাস্টেড এবং বিতর্কিত কোনো কেবলে যেন বাংলাদেশ না যায়। বিষয়টি নিয়ে আমরাও বিব্রত।’ তিনি সেসময় আরও বলেছিলেন, ‘আমরা এমন কিছু করব না, যেটাতে ভূরাজনৈতিক টেনশন তৈরি হয়। একটি লাইসেন্সের কারণে পুরো দেশ বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলা যায় না।

বেইজিংয়ের পাল্টা চিঠি ও কূটনৈতিক তোড়জোড়: যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার মুখে চীনও বসে নেই। সাবমেরিন কেবল স্থাপনের অনুমোদনের তোড়জোড় শুরু করেছে তারা। গত ১৪ জুন ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস থেকে বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে চীন দাবি করেছে, এইচএমএন টেকনোলজিস একটি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এইচএমএন টেক বৈশ্বিক সাবমেরিন কেবল নির্মাণ খাতে একটি অভিজ্ঞ ও সুনামসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাহ্যিক কারণে।

চিঠিতে চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পটির নির্মাণ কাজের চুক্তি অনুযায়ী, ঠিকাদার হিসেবে এইচএমএন টেক এরই মধ্যে প্রকল্পস্থল পরিদর্শন, সমুদ্রপথের জরিপ, স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগের স্থাপনার উৎপাদন এবং পরীক্ষাসহ সব প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করেছে। সমুদ্রে কেবল স্থাপনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কেবল স্থাপনের অনুমতির আবেদন করা হলেও বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না মেলায় প্রকল্পের কাজ শুরু করা ব্যাহত হয়েছে।

চীনা দূতাবাসের চিঠিতে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রাক-প্রাথমিক কাজে এইচএমএন টেক বাংলাদেশের আইন, বিধি-বিধান এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তাগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করেছে। প্রকল্পে ব্যবহৃত সব ধরনের যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও সেবা স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। চিঠিতে আরও বলা হয়, সমুদ্রে কেবল স্থাপনের কাজ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও কিছু 'বহিরাগত কারণ' এবং 'অ-বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ' প্রকল্পটির স্বাভাবিক পর্যালোচনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছে।

 চীনের দাবি, বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের মাধ্যমে দ্রুত প্রকল্পটির অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবং অযৌক্তিক বাহ্যিক প্রভাব এড়িয়ে চলবে। অন্যথায় এতে শুধু চীনা ঠিকাদারের বৈধ স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বাংলাদেশের প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোরও আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। চিঠিতে চীনা দূতাবাস বাংলাদেশ সরকারকে প্রকল্পটির প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে সমুদ্রে কেবল স্থাপনের অনুমতিসংক্রান্ত আইনগত ও প্রশাসনিক পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষিত হবে। প্রকল্পটিকে চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

চীন বলছে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে ডাটা সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শুধু দুই দেশের টেলিযোগাযোগ সহযোগিতাই নয়, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও গভীর হবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক স্বার্থে এই প্রকল্প দ্রুত অনুমোদন দেওয়া উচিত। এবারই প্রথম নয়, এর আগেও চীনা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি ছিল। জানা গেছে, সরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্প ‘সিমিউই-৬’-এ শুরুর দিকে চীনাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি আগ্রহ দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে তারা সরে যায়। কম খরচের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তিনির্ভরতা ও হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ১৬ দেশের আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামও হুয়াওয়েকে বাদ দেয়।

বেসরকারি কেবলের লাইন টার্মিনাল ইকুইপমেন্টগুলো নোকিয়া থেকে ক্রয় করার চুক্তি হলেও হুয়াওয়ের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত শাখা কেবলের নকশা, উন্নয়ন, উৎপাদন, স্থাপন ও পরীক্ষার সম্পূর্ণ কারিগরি দায়িত্ব চীনা প্রতিষ্ঠানের। এতে শুধু সাইবার সিকিউরিটিই নয় ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণের অজুহাতে ক্যাবলের পুরো রুটজুড়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রপথে চায়নার একধরনের নজরদারি তৈরি হওয়ার শঙ্কাও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি নয়, মিয়ানমারের অংশ নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ বর্তমানে সরকারিভাবে দুটি সাবমেরিন কেবল ব্যবহার করছে এবং আরেকটি নির্মাণের শেষ পর্যায়ে। বিদ্যমান সব কেবলের ব্রাঞ্চ বাংলাদেশের উপকূলবর্তী সমুদ্রসীমা তথা ইকোনমিক জোনের ভেতরে অবস্থিত, যেখানে সরকারের পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে; কিন্তু বেসরকারি সাবমেরিন কেবলের প্রায় ৯০ শতাংশ অংশ মিয়ানমারের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে অবস্থিত। এতে কার্যত নিয়ন্ত্রণ থাকবে মিয়ানমারের হাতে।

‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ নামের কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ক্যাম্পানা গ্রুপের চুক্তি অনুযায়ী, কেবলের মিয়ানমার অংশের ইনস্টলেশন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অনুমতি সংগ্রহের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ক্যাম্পানার ওপর ন্যস্ত। ফলে ভবিষ্যতে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে মিয়ানমারের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হবে। ক্যাম্পানার সঙ্গে চুক্তির ধারা ১১.২-এ বলা হয়েছে, যদি কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ লিখিত নির্দেশ দেয়, তবে ক্যাম্পানা নির্দিষ্ট ট্রান্সমিশন পথ বা ডার্ক ফাইবার সাময়িকভাবে বন্ধ করতে পারবে।

সূত্র জানায়, সিগমার এই কেবলে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব ২০১৯ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসসিপিএলসিকেও দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু মিয়ানমারের টেরিটরিতে ব্রাঞ্চ স্থাপনে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটি সাড়া দেয়নি। তৎকালীন বিএসসিপিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান পরে সিডিনেটের সিইও পদে যোগ দিয়ে সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন, যা আগে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করেছিলেন।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান— ফেসবুক, গুগল, অ্যামাজনের ডেটা সেন্টার দেশে স্থাপনের চেষ্টা করছে; কিন্তু হুয়াওয়ে মেরিনের নির্মিত সিগমা কেবলে যুক্ত হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান উপেক্ষা করলে সিঙ্গাপুর প্রান্তে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সংযুক্তিতেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশগুলো হুয়াওয়ে যুক্ত প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ালে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গত ১৫ এপ্রিলে বিটিআরসি থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বরাবর এক চিঠিতে বলা হয়, লাইসেন্স প্রদানের তারিখ থেকে চার বছরের মধ্যে সাবমেরিন কেবল সিস্টেমস পরিষেবাগুলোকে কার্যকর করে গ্রাহক সেবার জন্য প্রস্তুত করার বিধান রয়েছে, যার মেয়াদ রয়েছে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। 

চিঠিতে বলা হয়, কনসোর্টিয়াম কর্তৃক কেবল স্থাপন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ছাড়পত্রের বিষয়ে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে অনাপত্তি ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই থেকে অনুমতি পাওনা যায়নি। জানা গেছে, লাইসেন্স অনুমোদনের জন্য সাতটি মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র অবশ্য বলছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রাথমিক সায় দিয়েছে। বিটিআরসির আবেদনের ভিত্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এনওসি দিয়েছে বলে জানা গেছে। কনসোর্টিয়ামের চাপে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে না জানিয়েই এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুমতির বিষয়ে চিঠি দিয়েছিল বিটিআরসি। সংশ্লিষ্ট ডাক ও টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করে এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে সরাসরি চিঠি দেওয়া নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। 

যদিও বেসরকারি সাবমেরিন কেবলের কনসোর্টিয়াম দাবি করেছে, চীনা কোম্পানি সমুদ্রের নিচে শুধু কেবল বিছানোর কাজ করবে এবং মূল ডাটা ট্রান্সমিশনের যন্ত্রপাতি কেনা হবে ইউরোপীয় কোম্পানি থেকে। এতে আপত্তির কারণ দেখা যাচ্ছে না। তবে চুক্তি বলছে ভিন্ন কথা। মূল আর্কিটেকচার চীনা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় মার্কিন প্রশাসনের সন্দেহ দূর হচ্ছে না। বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কনসোর্টিয়াম বলছে, তাদের কাজ অনেকটা এগিয়েছে। জরিপ শেষ হয়েছে। কেবল স্থাপনের জন্য এখন কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন। কম খরচে ও কম সময়ে বাস্তবায়নের জন্য সিগমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তারা । কেবলের বেশিরভাগ অংশ মিয়ানমারের ইকোনমিক জোনে হলেও এখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইকোনমিক জোনে কেউ সমস্যা করতে পারে না।

সরকারের একটি পক্ষ চাচ্ছে বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পটির দ্রুত অনুমোদন। এজন্য বেশ দৌড়ঝাপও করছে তারা। সরকার ঘনিষ্ঠ অনেকে এই বেসরকারি সাবমেরিন কেবল কোম্পানির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তারাই মূলত প্রকল্প অনুমোদনের জন্য তাড়াহুড়ো করছে। অন্য গ্রুপটি সরকারি সাবমেরিন কেবল কোম্পানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আওয়ামী লীগ সরকারের দেওয়া বিতর্কিত বেসরকারি সাবমেরিন কেবল আনার পক্ষে না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়টিও তারা বেশ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে।

সার্বিক বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের সঙ্গে। গত কয়েকদিন তাদের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বারবার কল দিলেও তারা রিসিভ করেননি। এমনকি দুজনের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পরিচয় দিয়ে প্রশ্ন লিখে পাঠালেও সাড়া মেলেনি।

পরে যোগযোগ করা হয় ডাক, টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমির সঙ্গে। বেসরকারি সাবমেরিন কেবলের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে ভূমিকা কী হবে জানতে চেয়ে প্রশ্ন লিখে পাঠালে তিনি কালবেলাকে জানান, বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সব বিষয় যাচাই-বাছাই চলছে। দেশের জন্য যেটা ভালো হবে সেই সিদ্ধান্তই নেওয়া হবে। কূটনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, সাবমেরিন কেবল ইস্যুতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই প্রভাবশালী দেশের বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য একমাত্র সমাধান হলো জাতীয় স্বার্থকে মূল ভিত্তি ধরে পেশাদার কূটনৈতিক দরকষাকষি করা। এই সংকট নিরসনে সরকারের কৌশলী হওয়া উচিত। সরকারকে পুরোপুরি স্বচ্ছ হতে হবে এবং দুই প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সুন্দরভাবে নেগোশিয়েট করতে হবে। কূটনীতির ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বার্থকে বড় করে দেখে পেশাদারিত্বের সঙ্গে এগোলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পরাশক্তিকেই হ্যান্ডেল করা সম্ভব, কিন্তু নীতিনির্ধারকদের দ্বিধা থাকলে তা অসম্ভব হয়ে পড়বে।