Image description

ভারতের আসাম ও উত্তর প্রদেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক প্যানেল গঠন করে যুক্তরাষ্ট্র। তিন সদস্যের ওই প্যানেলে যুক্তরাষ্ট্র, সার্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে একজন করে মোট তিনজন সদস্য নিয়োগ দেয় ওয়াশিংটন। তিন আইনজীবীর প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সদস্য ছিলেন স্টিফেন জে. র‍্যাপ। তারা ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ পর্যালোচনা করেন। চলতি বছরের ৩১ মার্চ প্যানেল এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পরিকল্পিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নিপীড়ন, নির্যাতন, নির্বাসনসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। আসাম ও উত্তর প্রদেশ রাজ্যে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন, বর্ণবৈষম্য, জাতিগত নির্মূলের প্রস্তুতি মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল হতে পারে। এই দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা জাতিগত নির্মূলের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন বলে মনে করা হচ্ছে।’

 

 

যুক্তরাষ্ট্রের গঠন করা প্যানেলের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ১৩ এপ্রিল স্টিফেন জে. র‍্যাপের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে ওয়াশিংটনভিত্তিক দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণ। সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনের ভূমিকায় দ্য ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, ‘ভারতে মুসলিমবিরোধী সহিংসতা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। তবে ২০১৪ সাল থেকে, যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন থেকে ভারতের বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর পরিকল্পিত ও ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করে হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রা ধারণ করেছে। মুসলিমরা মারধরসহ গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের জীবিকা ধ্বংস করা হচ্ছে। তাদের জীবনযাত্রা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও মুসলিমদের নিয়মিত অমানবিক নির্যাতনের পথে ঠেলে দিতে সহায়তা করছেন। তারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেন। মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, মুসলিমদের ওপর এই সহিংস, ব্যাপক এবং পরিকল্পিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় সমর্থনে পরিচালিত হচ্ছে।’

 

৭ মে ২০২৬ তারিখে ‘ইউএস কমিশন ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম হিয়ারিং অন রিলিজিয়াস ফ্রিডম কন্ডিশনস ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই শুনানিতে স্টিফেন জে. র‍্যাপ প্যানেলের একজন সদস্য হিসেবে ভারত বিষয়ে তার লিখিত বক্তব্য জমা দেন।

স্টিফেন জে. র‍্যাপ তার প্রতিবেদনের শুরুতে লিখেছেন, ‘ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভিত্তিক অত্যাচারের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টান ও শিখরাও এর বাইরে নন।’

 

এরপর তিনি লিখেছেন, ‘ভারতে গত এক দশক ধরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অত্যাচার স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনায় বেসরকারি গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের যোগসাজশ রয়েছে। এর সবকিছুই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবিরাম অমানবিকীকরণ এবং উসকানির এক বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে ঘটছে।’

 

র‍্যাপ লিখেছেন, “আমরা যে তথ্য পর্যালোচনা করেছি, তা থেকে দেখা যায়, আসাম ও উত্তর প্রদেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষের দ্বারা সবচেয়ে গুরুতর নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক এবং মুসলমানদের ওপর নির্যাতন। এই রাজ্যগুলোজুড়ে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অজুহাতে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শাস্তি হিসেবে নানা ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এই রাজ্যগুলো সংখ্যালঘুবিরোধী উসকানি ও সহিংসতারও কেন্দ্রস্থল। এখানে ভারতের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন হিন্দু জঙ্গি গোষ্ঠী ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), এর সহযোগী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল (হনুমানের সেনাবাহিনী) এবং বিভিন্ন ‘ভিজিল্যান্ট’ গ্যাং। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও এসব জঙ্গি দল মুসলমান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। উভয় রাজ্যেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত ভিত্তি আমরা পেয়েছি। আমাদের ২০২২ সালের প্রতিবেদনের মতোই, এখানেও আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেয়েছি, বিশেষত এমন সব কর্মকাণ্ডের, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।”

 

আসামে সহিংসতার পাশাপাশি অন্তত ১৭ হাজার মুসলমানকে তাদের বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং ২ হাজার ৪৫০ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তরের সমতুল্য হতে পারে।

 

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা একাধিক প্রকাশ্য বিবৃতিতে বাংলাভাষী মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যা কার্যকরভাবে সহিংস সংঘাতকে উৎসাহিত করেছে। সাম্প্রতিক একটি বিশেষ উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। আসাম বিজেপির সরকারি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। এই ভিডিওতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী সহিংসতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ‘পয়েন্ট ব্ল্যাংক শট’ শিরোনামের ভিডিওটিতে শর্মার রাইফেল তাক করার আসল ফুটেজ বলে মনে হওয়া একটি দৃশ্য দেখানো হয়, যেখানে স্প্লিট স্ক্রিনে বন্দুকের নিশানায় থাকা মুসলিম পুরুষদের দেখা যাচ্ছিল। পর্দাজুড়ে অসমিয়া ভাষায় ঘৃণাসূচক স্লোগান ভেসে উঠছিল, যার মধ্যে ছিল, ‘কোনো দয়া নেই’ এবং ‘বাংলাদেশিদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই’। এটি আমাকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মিডিয়া ট্রায়ালের অভিযুক্ত করার অভিজ্ঞতা এবং হুতুদের দশটি আদেশের কথা ভীষণভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। বিশেষ করে, ‘তুতসিদের জন্য কোনো করুণা নেই’—এই আদেশটির কথা, যা আট লাখ তুতসি পুরুষ, নারী ও শিশুকে হত্যার তিন বছর আগে কাঙ্গুরা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

 

স্টিফেন জে. র‍্যাপ আরো লিখেছেন, “আসাম ও উত্তর প্রদেশ উভয় রাজ্যেই পুলিশের দ্বারা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ‘এনকাউন্টার কিলিং’ ঘটেছে। এ ধরনের ‘এনকাউন্টার কিলিং’-এর শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যাই অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি। এ জন্য কোনো জবাবদিহি নেই এবং প্রায়ই হত্যাকারীদের প্রশংসা করা হয় ও পদোন্নতিও দেওয়া হয়। আসামে শর্মার সরকারের প্রথম তিন বছরে এ ধরনের ঘটনায় ৮৩ জনকে হত্যা করা হয়েছিল এবং উত্তর প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের সরকারের প্রথম ৭ বছরে ২৬৬ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।”

 

উত্তর প্রদেশের পুলিশও ‘অপারেশন ল্যাংলা’ নামে পরিচিত একটি নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এই কৌশলে কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীকে হত্যা না করে বরং পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ করে দেয়, যা ‘হাফ-এনকাউন্টার’ ঘটনা নামে পরিচিত। আমরা শুধু ২০২৪ সালেই এমন ৫৬ জন ভুক্তভোগীর সন্ধান পেয়েছি।

স্টিফেন জে. র‍্যাপ তার প্রতিবেদনে আসামে পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার অধীনে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে গণহারে মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা খুবই উদ্বেগের বিষয়।

 

র‍্যাপ উল্লেখ করেছেন, ‘আসাম ও উত্তর প্রদেশ শুধু দেশব্যাপী সেই প্রবণতারই প্রতীক, যা বিহার, হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা এবং উত্তরাখণ্ডের মতো অন্যান্য বিজেপিশাসিত রাজ্যে সরকারি কার্যকলাপ, আইন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে সংঘবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহারের এ ধরনের ঘটনার জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

র‍্যাপ পরামর্শ দিয়ে লিখেছেন, “সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। ইতিহাস

আমাদের শেখায়, গণসহিংসতার দিকে যাত্রা যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় বিভিন্ন বয়ান থেকে এবং ধীরে ধীরে এই ধারণার স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে যে সহাবস্থান আর সম্ভব নয়। এর পরে আসে আইনি ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ, যা জনগোষ্ঠীকে শ্রেণিবদ্ধ করে, অধিকারের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে জনসংখ্যাগত বা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু পরবর্তী সময়েই এই প্রক্রিয়াগুলো জাতিগত নির্মূল এবং শেষ পর্যন্ত গণহত্যায় রূপ নেয়, যেমনটি আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রুয়ান্ডা, যুগোস্লাভিয়া ও মিয়ানমারে দেখেছি। এসব ঘটনাতেই অনেক ইঙ্গিত ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার পরই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।

‘জেনোসাইড ওয়াচ’ তাদের ১০ ধাপের প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারতের আসাম রাজ্যের মুসলিমদের পরিস্থিতিকে ‘পর্যায় ৭ : প্রস্তুতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা আশঙ্কা করছে, এই অঞ্চলগুলোতে ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু মুসলিমদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ের সমান্তরাল।”

 

সরাসরি আক্রমণ পর্যায়

ভারতে, বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে, মুসলমানদের জন্য বর্তমানে দমবন্ধ করা পরিবেশ বিরাজ করছে। বছরের পর বছর ধরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, নিপীড়ন ও ঘৃণা প্রচারের পর বর্তমানে সরাসরি হামলা, হত্যা ও তাদের স্থাপনা ধ্বংসের পর্যায় শুরু হয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গত সেপ্টেম্বর মাসে বিহার রাজ্যের দরভাঙ্গা জেলার মেকনা গ্রামে হিন্দুদের জমির ওপর দিয়ে একজন মুসলমানের লাশ নিয়ে যেতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এতে ওই জমি অপবিত্র হবে এবং ভবিষ্যতে সেখানে আর কোনো দিন মন্দির নির্মাণ করা যাবে না।

 

সেপ্টেম্বরে কলকাতায় আরো দুটি ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, বিজেপি সরকার মুসলিমবিদ্বেষ ও বর্ণবাদকে কোন মাত্রায় নিয়ে যেতে চায়। সালাম দেওয়া ও ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার কারণে খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, নারী আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানুকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের মুসলিম উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদী তরন্নুমকে ২৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে পদত্যাগে বাধ্য করেছে হিন্দুত্ববাদী ছাত্রসংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ।

 

কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে মুসলিম কর্মকর্তাদের মেনে নিতে পারছে না বর্ণবাদী উগ্র হিন্দুরা। আদালতে বিচারকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মুসলিম কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের অনেককে পদ ছাড়ার জন্য সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শিলিগুড়ির একটি আদালতে একজন মুসলিম বিচারকের সামনে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মুসলিমকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সেই নিয়োগের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে উগ্রবাদী হিন্দুরা। লোকসভায়ও অনেক উগ্রবাদী হিন্দু সাংসদ মুসলিম সাংসদদের উপস্থিতি সহজে মেনে নিতে পারছেন না।

 

গরু পালন, গরু পরিবহন ও গরু জবাইকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের পিটিয়ে এবং পুড়িয়ে মারার বর্বরতা এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ ৩ অক্টোবর রাতে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির বাগডোগরার কাছে গরু পাচারের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দুই মুসলিম যুবককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করে বিজেপির উগ্র গো-রক্ষক বাহিনী। এর আগে জুলাই মাসে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে একজন, জুন মাসে মহারাষ্ট্রের নাসিক এলাকায় একজন, মে মাসে আসামের বালিকুং জেলার শানিতপুরে দুজন এবং জানুয়ারিতে ওড়িশার বালাসোর জেলায় একজন মুসলিমকে গরুসংক্রান্ত ঘটনায় পিটিয়ে হত্যা করে উগ্র হিন্দুরা।

 

২০২৩ সালে রাজস্থানের জুনাইদ ও নাসির নামের দুই মুসলিম যুবককে হরিয়ানায় গাড়ির ভেতরে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে গো-রক্ষা গোষ্ঠীর হিন্দুরা। গরুসংক্রান্ত ঘটনায় তাদের হত্যা করা হয়।

 

২০২২ সালে নাজির আহমদ নামের এক মুসলিম ব্যক্তিকে গরু পরিবহনের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গত ১২ জুন মধ্যপ্রদেশের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান ১৪ জন হিন্দুত্ববাদী আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এর জের ধরে রাষ্ট্রীয় বজরং দল ও গো-রক্ষা পরিষদ ওই মুসলিম নারী বিচারককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দিয়েছে।

 

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান থেকে মুসলিম নির্যাতনের বিষয়ে সম্প্রতি কিছু তথ্য সামনে এসেছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। দেশটির গণমাধ্যম এসব বিষয় সচেতনভাবে এড়িয়ে যায়।

 

মানবাধিকার সংস্থা ও মুসলিম সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ভারতে প্রায় ২ হাজার ১০০টিরও বেশি মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ধারা বর্তমানে তীব্র আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে অবস্থিত প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক শাহি মসজিদের একটি বড় অংশ এবং এর মিনার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক মসজিদ ও মাদরাসা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

 

ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও বস্তুত দেশটি বিজেপির নেতৃত্বে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারতে উগ্র হিন্দুদের যেসব সংগঠন রয়েছে এবং তারা মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যেসব বর্বরতা চালাচ্ছে, তা যদি বাংলাদেশসহ কোনো মুসলিম দেশে ঘটত, তাহলে ভারত বিশ্বে সেই দেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার করত। চলমান মোদিবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ নেহা বোরা বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি, গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে একজন স্বৈরাচারী লুকিয়ে রয়েছেন।’

 

গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে মোদি একজন স্বৈরশাসক—এ কথা যেমন বিশ্ব জেনেছে, তেমনি বিশ্ব শিগগিরই জানতে পারবে, ক্ষমতাসীন বিজেপি আসলে হিন্দুদের একটি জঙ্গি ও ফ্যাসিবাদী দল, যাদের অধীনে মুসলমানরা বর্তমানে গণহত্যার পরিস্থিতির মুখোমুখি।

 

লেখক: সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ