৪৫তম বিসিএসে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারে মেধাক্রম ১১ এবং ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে মেধাক্রম ৬৭ তম হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সুমি আক্তার। তবে ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে স্থান পাননি তিনি। সুমির দাবি, ‘সারা দেশে আমিই একমাত্র মেয়ে যে গেজেট থেকে বাদ পড়েছি।’ কেন গেজেটে তার নাম আসেনি, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রমের পর এমন পরিস্থিতিতে পড়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বাদ পড়ার কারণ জানতে চাওয়া ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন এই প্রার্থী।
অনার্সে সিজিপিএ ৩.৮৮, মাস্টার্সে ৩.৯৯ ফলাফল নিয়ে একাডেমিক জীবনেও সফল তিনি। তাঁর ফলাফল, বিসিএস যাত্রা, গেজেট থেকে বাদ পড়ার কারণ এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সাথে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক আব্দুল্লাহ আল নাঈম।
১. দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে আপনার নাম বাদ পড়ার বিষয়টি কখন ও কীভাবে জানতে পেরেছেন? আপনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
সুমি আক্তার: ১৪ অক্টোবর রাতে ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর থেকেই বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কা নিয়ে বারবার বিসিএস অডিট ক্যাডারের তালিকায় নিজের নাম ও রোল নম্বর খুঁজছিলাম। কিন্তু ১১তম স্থান অর্জন করা গেজেটে নিজের নামটি খুঁজে পেলাম না, তখন মনে হচ্ছিল, মুহূর্তের মধ্যেই আমার চারপাশের সবকিছু থমকে গেছে।
আমি বারবার তালিকাটি দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে, হয়তো আরেকবার দেখলে নামটি খুঁজে পাব। কিন্তু প্রতিবারই সেই একই শূন্যতা! কখন কান্না করে ফেলেছি, নিজেই বুঝতে পারিনি। আমার বাবাকে বলার সাহসই হয়নি আমার, আম্মু শোনার পর থেকেই কান্না করছিল। জীবনে অনেক কঠিন সময় পার করেছি, অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়েছি, কিন্তু সেদিনের মতো অসহায় আর কখনো নিজেকে মনে হয়নি।
২. দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনাকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়ার পেছনে কী কারণ দেখানো হয়েছে? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো লিখিত ব্যাখ্যা পেয়েছেন কি?
সুমি আক্তার: দুঃখজনকভাবে, চূড়ান্ত গেজেট থেকে আমাকে বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো আমার কাছে স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো লিখিত ব্যাখ্যা পাইনি। দীর্ঘ সাত বছরের কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ ও অপেক্ষার পর সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও কেন গেজেটে আমার নাম স্থান পেল না, সেই প্রশ্নের উত্তর আমার অজানা।
৩. দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: গেজেটে নাম না আসার আগে আপনার কাছে কি কোনো ধরনের সতর্কবার্তা, নোটিশ, ফোনকল বা মৌখিকভাবে কোনো তথ্য দেওয়া হয়েছিল? নাকি গেজেট প্রকাশের পরই বিষয়টি জানতে পারেন?
সুমি আক্তার: গেজেট প্রকাশের পূর্ববর্তী সময়ে ও গেজেট প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত, আমাকে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা, নোটিশ, ফোনকল কিংবা মৌখিকভাবে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। গেজেট প্রকাশের দিনেই বিষয়টি প্রথম জানতে পারি। এর আগে এ বিষয়ে আমাকে কোনো কিছু অবহিত করা হয়নি।
৪. দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার রাজনৈতিক পরিচয় বা সম্পৃক্ততা নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কী তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে আপনি জানতে পেরেছেন?
সুমি আক্তার: এ বিষয়ে কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদন বা সুনির্দিষ্ট তথ্য আমার জানা নেই। তবে আমার আশঙ্কা, ভিন্ন মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ধারণার কারণে আমার বিষয়ে নেতিবাচক মূল্যায়ন করা হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো লিখিত ব্যাখ্যা না পাওয়ায় নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছিনা।
৫. দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর চূড়ান্ত গেজেটে নাম না আসার ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আপনার কি মনে হয়, যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা অসংগতি হয়েছে?
সুমি আক্তার: প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও চূড়ান্ত গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়াটা আমার জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক ও বেদনাদায়ক। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রম, আমার বাবা-মায়ের ত্যাগ এবং পরিবারকে ঘিরে দেখা অসংখ্য স্বপ্ন। তাই স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাই, ঠিক কী কারণে আমাকে চূড়ান্ত গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হলো না।
আমার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা আমাকে জানানো হোক এবং আমাকে বাদ দেওয়ার পেছনে সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করা হোক। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমার প্রত্যাশা, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা অসংগতি হয়ে থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে।
আমি ভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী হতে পারি, কিন্তু ভিন্ন মতাদর্শ ধারণ করা নিজে কোনো অপরাধ নয়। আমি কখনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলাম না, কোনো মামলা বা হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও কখনো বহিষ্কৃত হইনি। শিক্ষাজীবনে ভালো ফলাফল অর্জনের লক্ষ্যে পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম; অপরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, সিনিয়র ও জুনিয়রদের কাছে আমার যে পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তা আমার দীর্ঘদিনের আচরণ ও পথচলার সাক্ষ্য বহন করে।
আমি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে চাই না, কাউকে দোষারোপও করতে চাই না। আমি শুধু আমার অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ এবং ন্যায়সংগত আচরণ প্রত্যাশা করি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও প্রতিটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করার পরও চূড়ান্ত গেজেটে নাম না থাকার কারণ না জানা আমার জন্য গভীর কষ্টের। তাই আমার বিনীত আবেদন, বিষয়টি স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়সংগত বিবেচনার মাধ্যমে পর্যালোচনা করে আমাকে বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হোক।
৬. দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপনি কি আইনি পদক্ষেপ নেবেন, নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করবেন?
সুমি আক্তার: আমি প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা এবং গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত না করার কারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়ার উদ্যোগ নেব। প্রয়োজন হলে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব। আমার উদ্দেশ্য কোনো বিরোধ সৃষ্টি করা নয় বরং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমার অধিকার ও ন্যায্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
৭. দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার মতো চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও যাঁদের নাম গেজেটে আসেনি, তাঁদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপনি কী জানেন? আপনার ঘটনাটির সঙ্গে অন্যদের ঘটনার কোনো মিল রয়েছে কি?
সুমি আক্তার: আমার জানা মতে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়া একাধিক প্রার্থীর ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁদের কারও কারও ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমার ঘটনার সঙ্গেও এসব ঘটনার কিছুটা মিল রয়েছে বলে মনে করি। যতটুকু খবর জেনেছি সারা দেশে আমিই একমাত্র মেয়ে যে গেজেট থেকে বাদ পড়েছি। চট্টগ্রাম থেকেও মনে হয় আমি একজনই বাদ পড়েছি।
৮. দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার মতে, বিসিএসের চূড়ান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?
সুমি আক্তার: আমার মতে, বিসিএসের চূড়ান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট, যৌক্তিক ও লিখিত ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। প্রার্থীদের বিষয়ে যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিক তথ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি, গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও অন্যান্য যাচাই প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এতে যোগ্য প্রার্থীদের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে। মেধাবীদের মূল্যায়ন হোক যথাযথ।এটাই রাষ্ট্রের কাছে আমার চাওয়া।