Image description

সাজ্জাদ সাব্বির

 

ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে আবারও নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরেছে। অসংখ্য মানুষের জীবন, রক্ত, নির্যাতন আর ত্যাগের বিনিময়ে মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পেয়েছে। সেই ভোটের মাধ্যমে বিএনপি সরকারের হাতে দেশের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে জনগণ। মানুষের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার দখলদারিত্ব শেষ হবে, সন্ত্রাসের রাজনীতি কমবে, রাষ্ট্র মানুষের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে।

 

কিন্তু মানুষ কি সত্যিই সেই দখল, সন্ত্রাস আর নৈরাজ্যের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে?

একদিকে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর স্টুডিওটিতে হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার রাতের আঁধারে ভাঙচুর করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই শতাধিক মুখোশধারী ব্যক্তি সেখানে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও যন্ত্রপাতি লুট করে এবং ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে পুরো স্থাপনা ধ্বংস করে দিয়েছে।

 

এই দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে পুরো রাষ্ট্রের চেহারা বুঝতে পারা যায়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জমি দখলের জন্য অর্ধশতাব্দী ধরে দরিদ্র মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠান মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে চাঁদা আদায়ের জন্য সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হয়েছে।

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওকে দেশের অন্যতম নান্দনিক ক্রিয়েটিভ স্টুডিও হিসেবে দেখা হয়। এমন একটি জায়গা যেখানে কনটেন্ট, ভিজ্যুয়াল আর্ট, ভিডিও এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির কাজ হয়। বাংলাদেশের নতুন সৃজনশীল অর্থনীতির যে অংশটি ইউটিউব, ফিল্ম, বিজ্ঞাপন, ফটোগ্রাফি, মিউজিক, ডিজিটাল কনটেন্ট ও ডিজাইনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে, সেই অর্থনীতির জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ দরকার। এমন একটি স্টুডিওতে চাঁদার দাবিতে হামলায় সেই নিরাপত্তার জায়গাটিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

 

অপরদিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার মিরপুরে ১৯৭৪ সাল থেকে দরিদ্র মানুষকে মাতৃ ও শিশুসেবা, টিকাদান, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছিল। ২৫ সেপ্টেম্বরের হামলায় একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবন ধ্বংস করা হয়। লুট হয়েছে ওষুধ, ভ্যাকসিন, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রী। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক একে পরিকল্পিত হামলা বলেছেন। মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার নাম এসেছে এবং পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষের দীর্ঘদিনের জমি দখলের চেষ্টার কথাও এসেছে। প্রতিবেদনে ধ্বংস হওয়া জায়গায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙানোর তথ্য রয়েছে।

 

এ সকল ঘটনায় রাজনীতির একটি পুরোনো রোগ নতুন করে দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতার সঙ্গে সম্পদের সম্পর্ক। সমাজবিজ্ঞানীরা একে ক্লায়েন্টেলিজম, প্যাট্রনেজ এবং রেন্ট সিকিংয়ের কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। রাজনৈতিক সংগঠন যখন জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান থেকে স্থানীয় সম্পদ নিয়ন্ত্রণের নেটওয়ার্কে পরিণত হয়, তখন বাজার, জমি, পরিবহন, ঘাট, টেন্ডার, ব্যবসা এমনকি সামাজিক প্রতিষ্ঠানও রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

 

 

 

 

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বহুবার বলেছে। মে মাসে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করেছিলেন। জুনে চাঁদা সংগ্রহের বিরোধকে কেন্দ্র করে বিলাল তালুকদার হত্যার ঘটনায় জড়িত অভিযোগে যুবদলের স্থানীয় কমিটি বিলুপ্ত ও একজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

 

 

 

 

আইনশৃঙ্খলার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও স্বস্তির জায়গা দিচ্ছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ ও চুরির সাত ধরনের অপরাধে ২১,৭৫৬টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ২১,২২৮টি। অর্থাৎ মামলা বেড়েছে ৫২৮টি বা প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ। হত্যার মামলা ১,৭৮০ থেকে বেড়ে ১,৭৮৯ হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে ১০,০৯০ থেকে ১১,১৬৫। পুলিশের ওপর হামলার মামলাও বেড়েছে।

 

অবশ্য সরকারের বক্তব্যও আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং পুলিশ সদর দপ্তরও অপরাধের পরিসংখ্যান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট বিবেচনার কথা বলেছে।

 

কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আর মানুষের বাস্তবিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন। চাঁদাবাজি এবং দখলদারিত্বের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হচ্ছে, এগুলো অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত নাগরিক স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলে। কোনো ব্যবসায়ী ভাবতে পারেন তাকে কত টাকা দিতে হবে। একজন শিল্পী তাঁর স্টুডিও নিরাপদ কি না এই প্রশ্নে দ্বিধান্বিত থাকেন। একইভাবে এনজিওকর্মী, জমির মালিক এমনকি একজন সাধারণ মানুষও ভাবতে পারেন রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া নিজের সম্পত্তি রক্ষা করতে পারবেন না।

 

রাষ্ট্রের কাজ হলো এই ভয়কে সরিয়ে দেওয়া। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বহুবার বলেছে। মে মাসে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করেছিলেন। জুনে চাঁদা সংগ্রহের বিরোধকে কেন্দ্র করে বিলাল তালুকদার হত্যার ঘটনায় জড়িত অভিযোগে যুবদলের স্থানীয় কমিটি বিলুপ্ত ও একজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

 

অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারের প্রায় ৫৫০ দিনের সময়ে বিএনপি নিজেই স্বীকার করেছে, চাঁদাবাজি, দখল, হামলা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে দলের ৪ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ৪ হাজারের হিসাব ধরলেও ৫৫০ দিনে প্রতিদিন গড়ে সাতজনের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন পড়েছে। একটি দলের ভেতরে যদি প্রতিদিন গড়ে সাতজনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল কিংবা অনিয়মের অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে হয়, তাহলে প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলো মোট সমস্যার কতটুকু প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর অজানা। বিএনপি তখন ক্ষমতায় ছিল না। তবু তাদের বিরুদ্ধে এত বিপুলসংখ্যক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। বর্তমানে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায়। অবস্থা তাহলে এখন কত ভয়াবহ সেটা অনুমান করাই যায়।

 

কিন্তু সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলের জন্য স্থানীয় পর্যায়ের বিচ্ছিন্ন কয়েকজনকে বহিষ্কার করাটাই সমাধান নয়। মূল প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে অপরাধী নেটওয়ার্কের যে সম্ভাব্য সংযোগ তৈরি হয়, সেটি ভাঙার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে।

 

রাড্ডার ধ্বংসস্তূপ তাই জনসেবার ওপর দখলদারিত্বের সম্ভাব্য আগ্রাসনের ছবি। সালমানের স্টুডিওর ভাঙা ক্যামেরা, আসবাব আর সৃজনশীল কর্মপরিবেশও বাংলাদেশের নতুন ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য একটি ভয়াবহ বার্তা।

 

যে দেশে একজন শিল্পী নিরাপদ নন, একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিরাপদ নন, একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিরাপদ নয়, একটি জমি নিরাপদ নয়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে জীবনও নিরাপদ নয়, সেখানে বিনিয়োগের নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং নাগরিক আস্থার কথা বলা কঠিন।

 

ক্ষমতায় আসার অর্থ রাষ্ট্রের নাগরিক, সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের সম্পদ, জীবন, প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীনতাকে নিরাপদ করা।

 

মনে রাখা জরুরি মানুষ সরকার বদলানোর জন্য ভোট দেয়নি। মানুষ চেয়েছে রাষ্ট্র বদলাক।

 

• সাজ্জাদ সাব্বির: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

*মতামত লেখকের নিজস্ব