গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হলেও ঢাকার কাছের নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, যশোর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম নগরী ও যশোরের পাড়া-মহল্লায় এখন আতঙ্কের নাম কিশোর গ্যাং।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর অভিযান জোরদার : কিশোর অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান আরো জোরদার করা হয়েছে। গত শনিবার কুমিল্লার ১৮টি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরো ২৫৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রতন গ্রুপ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর চারজন সক্রিয় সদস্য রয়েছে।
কুমিল্লায় আটক আট শতাধিক : আমাদের কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লা নগরীতে বিভিন্ন অপরাধে সক্রিয় রয়েছে রতন গ্রুপসহ ১৫টি চক্র। ইমরান হোসেন রতন এই গ্রুপের প্রধান। তার বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর অপরাধীদের বিষয়টি আরো সামনে এসেছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আরেকজনকে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
চট্টগ্রামে পাড়া-মহল্লায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে : চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক কাজী মনজুরুল ইসলাম জানান, মহানগরসহ চট্টগ্রাম জেলায় আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে কিশোর অপরাধীদের বিভিন্ন চক্র। আগের বড় ভাইয়েরা আত্মগোপনে থাকায় নতুন বড় ভাইদের পৃষ্ঠপোষকতায় কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে। মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, এমনকি খুনাখুনিতেও তারা জড়াচ্ছে। নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রকাশ্যে সড়কে বিভিন্ন চক্রের নামে মিছিলও করছে তারা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলায়ই কিশোর অপরাধীদের অর্ধশতাধিক চক্র রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেরানিহাটে পূর্ববিরোধের মীমাংসা চলাকালে ছুরিকাঘাতে মোহাম্মদ হামিম (১৯) খুন হন। ওই ঘটনায় মো. রোহান উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। হত্যায় জড়িত সবাই কিশোর অপরাধ চক্রের সদস্য বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানা এলাকায় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং লিডার ওয়াকিল হোসেনকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হয় পুলিশ।
হামলার সময় কিশোর গ্যাং সদস্যরা অংশ নেয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর আমবাগান, ডেবারপাড়ে মো. আলমগীর, খুলশীতে ওয়াকিল হোসেন, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় সাইফুল ইসলাম নিজ নিজ চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আনোয়ারা উপজেলার বারখাইনে মো. সম্রাট, হালিশহরে আসলাম, চান্দগাঁও থানার খতিবেরহাট, বারইপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় শহিদুল ইসলাম বুইসা ও ইসমাইল হোসেন টেম্পু চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে। চকবাজারে ‘ফোর জিরো সেভেন’, হালিশহরে ‘পাইথন’, ‘বিগু’, মুরাদপুর-পাঁচলাইশ ও হামজারবাগে ‘এমবিএস’, ‘কেবি’, ‘এনএস’, ‘ট্রিপল নাইন’ গ্রুপ নগরবাসীর কাছে আতঙ্কের নাম। পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ ও মোহাম্মদপুরে ‘মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট’ (এমবিএস) গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার (সিএমপি) হাসান মো. শওকত আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মো. রইছ উদ্দিন বলেন, চলতি বছর চট্টগ্রাম নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের ৩০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা করা হছে ১৫টি।
খুলনায় বড় ১০ চক্র : খুলনা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক কৌশিক দে জানান, খুলনাজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কমপক্ষে ১০টি চক্রের কিশোর অপরাধীরা। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) ও জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে খুলনায় ৫৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হত্যায় জড়িতদের বেশির ভাগই উঠতি বয়সের। এর মধ্যে চিংড়ি পলাশ ওরফে শেখ পলাশ, গ্রেনেড বাবু (বি-কম্পানি), নুর আজিম, হুমায়ুন কবীর হুমা, আরমান শেখ ওরফে আরমিন ও নাসিমুল গনি ওরফে নাসিম গ্রুপের সদস্যদের অপরাধ একে একে বের হয়ে আসছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, খুলনায় তিন ধরনের কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে বয়সে একটু বড়রা ‘ডেঞ্জার বয়েজ’ নামে পরিচিত।
বস্তিতে বসবাসকারী এই গ্রুপের কাজ মাদক সেবন বা কারবার, খুন ইত্যাদি। দ্বিতীয় গ্রুপটি স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে গঠিত। এর নাম ‘গোল্ডেন বয়েজ’। তাদের কাজ মাদক সেবন, ছোট ছোট মব সৃষ্টি, নারীদের উত্ত্যক্ত করা ইত্যাদি। সর্বশেষ ‘টিপসি গ্রুপ’ বয়রা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। এদের কাজ এলাকার বিভিন্ন রিকশা গ্যারেজ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়, মাদক সরবরাহ, ছিঁচকে চুরি-ছিনতাই ইত্যাদি। খালিশপুরে রয়েছে ‘আরজে রাফি’ গ্যাং। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘খুলনায় বস্তি এলাকায় অনেক কিশোর অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তবে পুলিশের অভিযানে অনেকেই গ্রেপ্তার হচ্ছে।
বরিশালে ৫০ চক্র : বরিশাল থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক আজিম হোসেন জানান, মহানগরসহ বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় কিশোর অপরাধীদের কমপক্ষে ৫০টি চক্রের প্রায় দুই হাজার সদস্য রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই, সংঘর্ষের মতো অঘটন ক্যামেরাবন্দি করে তারা ছড়িয়ে দেয় ফেসবুক ও টিকটকে। সম্প্রতি বরিশাল নগরীর পলাশপুরে কালাম শিকদারের ছেলে মাছ ব্যবসায়ী বাবু শিকদার কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় নিহত হন। হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে টোকাই গ্যাং লিডার টোকাই মধু, শহীদ ওরফে কালা শহীদ ও মটু সিয়ামকে গ্রেপ্তার করে কাউনিয়া থানার পুলিশ। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে ডেঞ্জার বয়েজ চক্রের নেতা রিদওয়ান। কিছুদিন আগে মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে রিদওয়ানের একটি হাত কেটে ফেলে বেলতলার বাবা গ্যাং নেতা মামুন ওরফে বাবা মামুন। পলাশপুরের ফকির গ্রুপ নামের কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে আছে ফকির রাজু। তার বিরুদ্ধে কাউনিয়া থানায় চারটি মামলা রয়েছে।
কাউনিয়া থানার ওসি সনজিত চন্দ্র নাথ বলেন, ‘আমরা চিহ্নিত কিশোর অপরাধীদের ধরতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।’
যশোরে পাড়ায় পাড়ায় আতঙ্ক : যশোর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক আকরামুজ্জামান জানান, যশোর শহরের রেলগেটের ‘ভাগ্নে ইমন’, খড়কী কলাবাগানের ‘পিচ্চি রাজা’, রায়পাড়ার ‘ভাইপো রাকিব’ বা শংকরপুরের ‘অনি’—স্থানীয়ভাবে এসব নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসের অভিযোগ। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এসব ব্যক্তি গ্রেপ্তারের পর শহরের কিছু এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কমেছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন। তবে বেশির ভাগ শহরবাসী আছে আতঙ্কে। পাড়া-মহল্লায় এখনো তাদের অনুসারীদের একটি অংশ সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যশোর শহর ও আশপাশে ৪০ থেকে ৫০টি চক্র সক্রিয় বলে জানা গেছে। শহর ও শহরতলির পালবাড়ি, ধর্মতলা, শংকরপুর, বেজপাড়া, রায়পাড়া, তুলোতলা, ষষ্টিতলা, খড়কী, রেলগেট, চাঁচড়া, বারান্দিপাড়া, মণিহার, নীলগঞ্জ, বকচর ও উপশহরে এসব চক্রের অপরাধ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যশোরে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই ২০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বড় অংশের সঙ্গে কিশোর সন্ত্রাসীরা জড়িত। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ সেপ্টেম্বর জেলার ৯টি থানা ও জেলা গোয়েন্দা শাখা একযোগে ৪৩টি স্থানে বিশেষ চেকপোস্ট বসায়। অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে আটক করে পুলিশ।
রাজশাহীতে বেড়েছে উৎপাত : রাজশাহী থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক রফিকুল ইসলাম জানান, রাজশাহী নগরীতে মারধর, ছিনতাই, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ইভ টিজিং ও সংঘবদ্ধভাবে হামলা, জমি দখলের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে কিশোরদের বিভিন্ন চক্র। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত ৩ জুলাই শাহ মখদুম থানার ডাবতলা এলাকায়। নগরীর সিটিহাটগামী সড়কের পাশে এক রিকশাচালক কিশোরকে আটকে মারধর এবং তার কাছে থাকা ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। রিকশার মিটারও ভাঙচুর করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শাহ মখদুম থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন শিশু থাকায় তাদের বিরুদ্ধে শিশু আইনের বিধান অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা করা এসব কিশোর-তরুণের মধ্যে কেউ কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে বেপরোয়া চলাচল, পথচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মারামারি এবং ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
নারায়ণগঞ্জে শত বাহিনী : আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, বন্দর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সদর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের কমপক্ষে ১০০ বাহিনী সক্রিয় রয়েছে।
পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, কিশোর অপরাধী চক্রগুলো প্রধানত স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ‘বড় ভাইদের’ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পরিচালিত হচ্ছে। পৃষ্ঠপোষকরা অস্ত্র, মাদক ও অর্থের লোভ দেখিয়ে চাঁদাবাজি, জমি দখল, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অপরাধে কিশোরদের কাজে লাগায়। পুলিশ মাঠ পর্যায়ে কিশোরদের গ্রেপ্তার করলেও মূল পৃষ্ঠপোষকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। গ্রেপ্তারের পর মুক্তি পেলে কিশোর অপরাধীদের বড় ভাইয়েরাই আবার প্রলুব্ধ করে।